স্বাস্থ্যখাতে আস্থা না ফিরলে বিদেশমুখিতা কমবে না

আপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:০৭ পিএম

চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা কমাতে হলে শুধু মানুষকে দেশে চিকিৎসা নিতে বললেই হবে না। আমার দৃষ্টিতে, প্রথমে বুঝতে হবে—একজন রোগী কেন দেশের বাইরে যেতে চান। অনেক সময় এর পেছনে শুধু উন্নত প্রযুক্তি বা বিশেষায়িত চিকিৎসার প্রয়োজন থাকে না; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আস্থা। রোগী কি মনে করছেন তার রোগটি সঠিকভাবে নির্ণয় হয়েছে? চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা কি তাকে পরিষ্কারভাবে বোঝানো হয়েছে? খরচ সম্পর্কে তিনি কতটা নিশ্চিত? চিকিৎসার মান নিয়ে তার কতটা আস্থা আছে? কোনো সমস্যা হলে তিনি কার কাছে উত্তর পাবেন? এসব প্রশ্নের উত্তর যত পরিষ্কার হবে, দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর আস্থাও তত শক্তিশালী হতে পারে।

চিকিৎসার ক্ষেত্রে আস্থার প্রথম জায়গা হলো রোগ নির্ণয়ের স্বচ্ছতা। একজন রোগীকে শুধু বলা হলো—“আপনার এই রোগ হয়েছে”—এতে সবসময় যথেষ্ট হয় না। রোগটি কীভাবে শনাক্ত হলো, কোন পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, আরও কোনো পরীক্ষা প্রয়োজন কি না এবং সম্ভাব্য চিকিৎসার বিকল্প কী—এসব বিষয় রোগী ও পরিবারের কাছে সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করা গুরুত্বপূর্ণ। একই রোগের ক্ষেত্রেও রোগীর অবস্থা ভিন্ন হতে পারে। তাই চিকিৎসার সিদ্ধান্তের কারণ রোগী যত ভালোভাবে বুঝবেন, তাঁর আস্থাও তত বাড়ার সুযোগ থাকবে।

এর সঙ্গে যুক্ত আছে দ্বিতীয় মতামতের সুযোগ। দ্বিতীয় মতামত নেওয়া প্রথম চিকিৎসককে অবিশ্বাস করা নয়। বরং বড় বা জটিল চিকিৎসা সিদ্ধান্তের আগে রোগী যেন প্রয়োজন হলে আরেকজন যোগ্য বিশেষজ্ঞের মতামত নিতে পারেন, সেটিও একটি আস্থার পরিবেশ তৈরি করে। একটি ভালো স্বাস্থ্যব্যবস্থা রোগীকে প্রশ্ন করতে ভয় দেখায় না; বরং প্রশ্ন করার সুযোগ দেয়। রোগী যদি জানতে পারেন যে তার চিকিৎসার বিকল্প সম্পর্কে আলোচনা করা যাবে, প্রয়োজনে অন্য বিশেষজ্ঞের মতামত নেওয়া যাবে, তাহলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তার আত্মবিশ্বাসও বাড়ে।

আস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হলো খরচের স্বচ্ছতা। চিকিৎসার আগে একজন রোগী যদি জানতে না পারেন সম্ভাব্য খরচ কত, কোন সেবার জন্য কত টাকা লাগতে পারে এবং চিকিৎসার মাঝপথে অতিরিক্ত খরচের সম্ভাবনা কোথায়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। সব চিকিৎসার চূড়ান্ত খরচ আগে থেকে নির্দিষ্ট করা সম্ভব নয়। রোগীর অবস্থা, চিকিৎসার জটিলতা বা অতিরিক্ত প্রয়োজনের কারণে খরচ পরিবর্তিত হতে পারে। কিন্তু কোন খরচটি অনুমানভিত্তিক, কোনটি নির্দিষ্ট এবং কোন পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে—এসব যত পরিষ্কারভাবে জানানো যায়, রোগীর আস্থাও তত বাড়ে।

আমি মনে করি, চিকিৎসার খরচ নিয়ে পরিষ্কার যোগাযোগ শুধু হিসাবের বিষয় নয়; এটি রোগীর প্রতি সম্মানের বিষয়। একজন পরিবার যখন চিকিৎসার জন্য বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করছেন, তখন তারা শুধু চিকিৎসা কিনছেন না; তারা একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য তাদের পাওয়ার অধিকার রয়েছে।

এরপর আসে সেবার মান। একটি হাসপাতালের আধুনিক ভবন, প্রযুক্তি বা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু রোগীর কাছে চিকিৎসার মানের অভিজ্ঞতা তৈরি হয় আরও অনেক জায়গায়—সঠিক সময়ে সেবা পাওয়া, প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া, চিকিৎসকদের মধ্যে সমন্বয়, নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা, নার্সিং সেবা, রিপোর্ট পাওয়ার সময় এবং চিকিৎসার পরবর্তী পরিচর্যা—সবকিছুর সমন্বয়ে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে নিরাপদ, কার্যকর, মানুষকেন্দ্রিক, সময়োপযোগী এবং সমন্বিত সেবাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করে।

এখানে যোগাযোগের মানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন চিকিৎসক অত্যন্ত দক্ষ হতে পারেন, কিন্তু রোগী যদি তার রোগ বা চিকিৎসার পরিকল্পনা বুঝতে না পারেন, তাহলে আস্থার জায়গাটি দুর্বল হতে পারে। আবার হাসপাতাল অনেক ভালো সেবা দিতে পারে, কিন্তু রোগীর প্রশ্নের উত্তর সময়মতো না পেলে তার মনে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। তাই স্বাস্থ্যসেবায় যোগাযোগ কোনো অতিরিক্ত সুবিধা নয়; এটি রোগীর অভিজ্ঞতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

একজন রোগী জানতে চাইতে পারেন—“আমার রিপোর্টে কী এসেছে?”, “এই চিকিৎসা কেন দরকার?”, “আর কোনো বিকল্প আছে কি?”, “কতদিন লাগবে?”, “চিকিৎসার পর কী করতে হবে?” এসব প্রশ্নের উত্তর সহজ ভাষায় দেওয়া প্রয়োজন। সব প্রশ্নের উত্তর সঙ্গে সঙ্গে দেওয়া সম্ভব নাও হতে পারে, কিন্তু রোগী যেন জানেন তার প্রশ্নটি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে—এটিও আস্থার অংশ।

এর সঙ্গে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো জবাবদিহি। কোনো সমস্যা হলে প্রতিষ্ঠান কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে? কোনো ভুল বোঝাবুঝি হলে কে বিষয়টি দেখবে? রোগীর অভিযোগ কোথায় জানাতে হবে? অভিযোগের উত্তর কীভাবে দেওয়া হবে? একটি প্রতিষ্ঠানের মান শুধু তখন বোঝা যায় না যখন সবকিছু ভালোভাবে চলছে; সমস্যা দেখা দিলে প্রতিষ্ঠান কীভাবে দায়িত্ব নেয়, সেটিও তার সংস্কৃতির পরিচয়।

আমার কাছে জবাবদিহি মানে সবসময় ভুল স্বীকার করা নয়। বরং কোনো বিষয় সম্পর্কে পরিষ্কারভাবে তথ্য যাচাই করা, প্রয়োজন হলে ব্যাখ্যা দেওয়া, রোগী বা পরিবারের কথা শোনা এবং সমস্যার সমাধানের জন্য দায়িত্ব নেওয়া। একটি প্রতিষ্ঠান যখন মানুষের প্রশ্ন থেকে পালিয়ে না গিয়ে তার উত্তর দেওয়ার সংস্কৃতি তৈরি করে, তখন দীর্ঘমেয়াদে আস্থাও তৈরি হয়।

তবে আস্থা তৈরি শুধু হাসপাতালের কাজ নয়। চিকিৎসক, নার্স, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা, রোগী ও পরিবার—সব পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান ও যোগাযোগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজেদের সক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সৎ থাকা গুরুত্বপূর্ণ। সব চিকিৎসা সব জায়গায় সম্ভব—এমন দাবি করার প্রয়োজন নেই। বরং কোনো চিকিৎসার জন্য অন্য কোথাও যাওয়া প্রয়োজন হলে সেটিও রোগীকে পরিষ্কারভাবে জানানো আস্থারই অংশ।

আমার দৃষ্টিতে, দেশের চিকিৎসার প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনার সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো বড় বড় দাবি নয়; প্রতিদিনের অভিজ্ঞতায় সেই আস্থার প্রমাণ দেওয়া। একজন রোগী সঠিক রোগ নির্ণয়ের ব্যাখ্যা পেলেন, চিকিৎসার প্রয়োজন বুঝলেন, সম্ভাব্য খরচ জানলেন, সময়মতো সেবা পেলেন, তাঁর প্রশ্নের উত্তর পেলেন এবং কোনো সমস্যা হলে একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি পাশে দাঁড়ালেন—এই অভিজ্ঞতাগুলোই ধীরে ধীরে আস্থা তৈরি করে।

এখানে চট্টগ্রামের মতো শহরের জন্যও বড় সুযোগ রয়েছে। চট্টগ্রামে বিশেষায়িত চিকিৎসার সক্ষমতা যত বাড়ছে, তত বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে রোগীকে শুধু চিকিৎসা দেওয়া নয়, পুরো চিকিৎসাযাত্রায় আস্থা দেওয়া। একজন রোগী যেন জানেন কোথায় যাবেন, কার কাছে যাবেন, কী চিকিৎসা প্রয়োজন, কতটা খরচ হতে পারে এবং চিকিৎসার পর কী হবে—এই তথ্যগুলো সহজে পাওয়া গেলে তাঁর সিদ্ধান্ত নেওয়াও সহজ হবে।

বিদেশে চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন হতে পারে। কিছু বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যাওয়া স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয়। তাই বিদেশমুখিতা কমানোর লক্ষ্য হওয়া উচিত নয় যে কোনো মূল্যে মানুষকে দেশে রাখা। বরং লক্ষ্য হওয়া উচিত—রোগী যেন প্রয়োজনের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেন, শুধু অনিশ্চয়তা বা আস্থার অভাবের কারণে নয়।

একজন রোগী যদি মনে করেন দেশে তার রোগটি সঠিকভাবে নির্ণয় হবে, চিকিৎসার প্রয়োজন তাকে বোঝানো হবে, খরচ সম্পর্কে পরিষ্কার তথ্য পাবেন, মানসম্মত সেবা পাবেন, প্রশ্ন করলে উত্তর পাবেন এবং কোনো সমস্যা হলে প্রতিষ্ঠান দায়িত্ব নেবে—তাহলে দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার প্রতি তাঁর আস্থা স্বাভাবিকভাবেই বাড়বে।

শেষ পর্যন্ত বিদেশমুখিতা কমানোর সবচেয়ে শক্তিশালী পথ হয়তো আরও বেশি বিজ্ঞাপন নয়।আরও বেশি আস্থা। আর সেই আস্থা তৈরি হবে স্বচ্ছ রোগ নির্ণয়, পরিষ্কার খরচ, মানসম্মত সেবা, মানবিক যোগাযোগ এবং জবাবদিহির মাধ্যমে। কারণ মানুষকে দেশে চিকিৎসা নিতে বলার চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর হলো এমন একটি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে মানুষ নিজের সিদ্ধান্তে বলতে পারেন—
“আমি জানি কী চিকিৎসা প্রয়োজন, কেন প্রয়োজন, কতটা খরচ হতে পারে এবং চিকিৎসার পুরো পথটিতে আমি একা নই।”
সেই আস্থাই একদিন দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠতে পারে।

লেখক: হেড অব ডিজিটাল, ব্র্যান্ড অ্যান্ড পিআর, এভারকেয়ার হাসপাতাল চট্টগ্রাম।

একাত্তর/এসি
সাভারে আশুলিয়ায় বিএনপির ধামসোনা ইউনিয়ন শাখার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মো. জাকির হোসাইন মুন্সির বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাটি মিথ্যা এবং এ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য...
উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে বলে অকপটে স্বীকার করেছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, বর্তমানে তলানিতে থাকা বিনিয়োগে বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সর্বোচ্চ...
গাড়ির মালিক ও ড্রাইভিং লাইসেন্সধারীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তিনটি নতুন নির্দেশনা ও আল্টিমেটাম জারি করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে...
ইসরাইলগামী ফ্লাইদুবাইয়ের বিমানে ককপিটে কুঠার দিয়ে হামলার চেষ্টা চালানো ওমানি পাইলট হামাম আল-হামামির ভয়াবহ ও বিতর্কিত অতীত নিয়ে বেরিয়ে আসছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। সিএনএন’র এক্সক্লুসিভ অনুসন্ধানে জানা...
লোডিং...
সর্বশেষপঠিত

এলাকার খবর