বিশ্বের সবচেয়ে বড় ব-দ্বীপ বাংলাদেশ। নদীমাতৃক এই অঞ্চলের বাসিন্দাদের জন্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ কোন নতুন ঘটনা নয়। ঝড়-বন্যা আর জলোচ্ছ্বাসকে সাথে নিয়ে বেঁচে থাকতে শিখেছে উপকূলের মানুষেরা। সামুদ্রিক ঝড়ের আনাগোনায় বাংলাদেশ প্রান্তে কম নয়। বঙ্গোপসাগরে বছরে দুই সময় প্রবল আশঙ্কা থাকে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হবার, এপ্রিল-মে আর আগস্ট থেকে নভেম্বর। ঘূর্ণিঝড় অশনিও তেমনি এক ঝড়।
এমনিতেই গ্রীষ্মকালে কিউমুলাস মেঘের কারণে বাংলাদেশ ঝড়ো হাওয়া আর বৃষ্টিপাত নিয়মিত ঘটনা। তবে এপ্রিল- মে মাসে সমুদ্রে যে লঘুচাপগুলো সৃষ্টি হয়, তার মধ্য দু’একটি মূলত ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়। এর কারণ হিসেবে আবহাওয়াবিদের বলছেন, এপ্রিল-মে মাসে যে লঘুচাপগুলো তৈরি হয় সেগুলো মূলত স্থলভাগ থেকে অনেক দূরে তৈরি হয় ফলে বেশ খানিকটা সময় এই লঘুচাপগুলো সাগরে থাকা অবস্থায় শক্তিসঞ্চার করে নিম্নচাপ কিংবা ঘূর্ণিঝড়ে রুপান্তরিত হয়।
তবে মে মাসের শেষভাগে কিংবা জুনে যেসব লঘুচাপ সমুদ্রে তৈরি হয় সেগুলো স্থলের কাছাকাছি থাকে বলে শক্তি সঞ্চার করার সুযোগ পায় না তবে উপকূলে বৃষ্টিপাত ঝরিয়ে র্দুবল হয়ে পড়ে। এছাড়াও আগস্ট থেকে নভেম্বরেও সমুদ্র উত্তাল থাকে। সে সময়টাতেও ঘূর্ণিঝড় তৈরি হবার আশঙ্কা থাকে, তবে বাংলাদেশে আসার সম্ভাবনা কম থাকে ,তবে বছরের শেষভাগের ঘূর্ণিঝড়গুলো অনেক বেশী শক্তিশালী আর বিধ্বংসী হয়ে থাকে।

ছবি: ভোলা সাইক্লোন
১৯৭০ সালের ‘ভোলা সাইক্লোন’ তেমনি এক নভেম্বর মাসের ঘূর্ণিঝড়। ভোলা সাইক্লোনকে বলা হয় উপমহাদেশের সবচেয়ে বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জন্য ভয়ঙ্কর বিভীষিকাময় ছিলো ১৯৭০ এর সাতই নভেম্বর। ১৮৫ থেকে ২৪০ কিলোমিটার প্রতি ঘন্টা গতিবেগ নিয়ে বাংলাদেশ আছড়ে পড়ে অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড়। অন্তত তিনলাখ মানুষের প্রাণহানি হয় সেই ঘটনায়। ভোলাসহ বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন জেলার লাখো বাড়ি-ঘর বিধ্বস্ত হয়, নষ্ট হয় ফসলী জমি।
এরপরও বহুবার বাংলাদেশের মানুষ ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়লেও ভোলা সাইক্লোনের মত প্রাণহানির ঘটনা কখনো ঘটেনি। তবে ১৯৮৮ সালের নভেম্বরের ঘূর্ণিঝড়ও ছিলো বেশ বিধ্বংসী। এই ঝড় বয়ে যায়, যশোর, কুষ্টিয়া আর ফরিদপুরসহ বাংলাদেশে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বেশকিছু জেলার ওপর দিয়ে। সেসময় বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১৬২ কিলোমিটার৷ এই ঘূর্ণিঝড়ে মারা যায় প্রায় ছয় হাজার মানুষ।

ছবি: ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়
১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়েও প্রায় দেড় লাখ মানুষ মারা যায় বাংলাদেশে। তখন মে মাসের একেবার শেষভাগে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম আর কক্সবাজারে আঘাত হানে এই ঘূর্ণিঝড়। সেসময় বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ রেকর্ড করা হয় ২৪০ কিলোমিটার প্রতি ঘন্টা। ঘূর্ণিঝড়ের সেই সময়টাতে প্রানহানি যেমনটা ছিলো তেমনি ভয়াবহ আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয় বাংলাদেশ। এই ঘূর্ণিঝড়ে আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হয় ছয় হাজার কোটি টাকা।

ছবি: সাইক্লোন 04B
২০০০ সালের আগ পর্যন্ত ঘূর্নিঝড়ের নাম দেয়ার প্রচলন ছিলো না। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসে ভারত এবং আরব সাগরের প্বার্শবতী দেশগুলোর দেয়া নামের তালিকা অনুযায়ী সামুদ্রিক ঝড়ের নামকরণ করা হয়ে থাকে। নতুন শতাব্দীতে বাংলাদেশের অন্যতম ঘূর্ণিঝড়ের নাম ‘সিডর’। নভেম্বরের মাঝামাঝি এই অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে বাংলাদেশের দক্ষিণ উপকূলে। বেসরকারি তথ্য অনুযায়ী ঝড়ের সময় মারা যায় প্রায় দশ হাজার মানুষ।

২০০৮ সালে ঘূর্ণিঝড় নার্গিস বাংলাদেশে আসলেও সেটি অনেকটাই দুর্বল হয়ে আসে। ঝড়ের মূল আঘাতটা পড়েছিলো মিয়ানমার সীমান্তে , সেই দেশে এই ঝড়ের কারণে এক লাখেরও বেশী মানুষ মারা যায় বলে জানা যায়।


ছবি: ঘূর্ণিঝড় মহাসেন
এরপর বড় ঘূর্ণিঝড় আসে ২০১৩ সালে। সে বছর মে’র মাঝামাঝি সময়ে ঘূর্ণিঝড় ‘মহাসেন’ বাংলাদেশের নোয়াখালী ও চট্টগ্রাম উপকূলে আঘাত হানে। সে সময় বাতাসের গতিবেগ ছিলো প্রতি ঘন্টায় ৮০ থেকে ১০০ কিলোমিটার। ঝড়ের কারণে মারা যায় প্রায় ২০ জন মানুষ।
২০১৫ সালে ঘূর্ণিঝড় কোমেন ছিলো অসময়ের ঝড়। জুলাই মাসে চট্টগ্রাম আর কক্সবাজারের ওপর দিয়ে বয়ে যায় এই ঝড়। এ সময় ঝড়ের প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে ব্যাপক পরিমাণে বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়।
২০১৬ সালের মে মাসে ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু আঘাত হানে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ আর বাংলাদেশের সুন্দরবন অংশে। সেই ঝড়ের কারণেও মারা যায় প্রায় ত্রিশ জন মানুষ।

২০১৮ তে বড় ঝড় না আসলেও ২০১৯ সালের মে মাসে ফনা তুলে এগিয়ে আসে ঘূর্ণিঝড় ‘ফণী’। এই ঘূর্ণিঝড়টি আকারে যেমন বড় ছিলো তেমনি ঝড়ের কেন্দ্রে বাতাসের গতিবেগ ঘন্টা প্রতি ৩০০ কিলোমিটারেরও বেশী। যার কারণে ফণীকে বলা হচ্ছিলো অতি প্রবল ঘূণিঝড়। তবে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছিলো না এর গতিপথ।
কখনো উড়িষ্যা আর কখনো বাংলাদেশের দিকে এর গতিপথ থাকলেও শেষ পর্যন্ত উড়িষ্যা উপকূলের উপর দিয়েই বয়ে যায় এই ঝড়। এই ঘূর্নিঝড় মোকাবেলায় বাংলাদেশ সরকারের প্রস্তুতিও ছিলো ব্যাপক। তারপরও ঝড়ের সময় দেয়াল চাপা পড়ে আর গাছের ডাল পড়ে নিহত হন প্রায় দশজন। পাঁচশ কোটির বেশী আর্থিক ক্ষতি সম্মুখীন হয় বাংলাদেশ।
সেই বছরই আরেকটি অতিপ্রবল ঘূর্ণিঝড় তৈরি হয় উপমহাদেশীয় সমুদ্রাঞ্চলে। ২০১৯ এর নভেম্বরে বহুবার দিক বদলে করে অবশেষে ভারতে পশ্চিমবঙ্গ আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’। সুন্দরবন বুক আগলে রক্ষা করে বাংলাদেশকে।
২০২০ সালেও মে মাসে বাংলাদেশে আঘাত হানে আরেকটি প্রবল ঘূর্ণিঝড়। যার নাম দেয়া হয়েছিলো ‘আম্পান’। বরাবরের মতই দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষেরাই সবচেয়ে বেশী ক্ষতির সম্মুখীন হয় এই ঝড়ে। লাখো মানুষ গৃহহীন হয় ঝড়ে প্লাবনে বাঁধ ভেঙে। এছাড়া প্রচুর ফসল নষ্ট হয় উপকূলীয় অঞ্চলে।
গেলো বছর ঠিক এই মে মাসেই বাংলাদেশে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় ‘ইয়াস’। বঙ্গোপসাগরে উৎপত্তি হওয়া এই ঝড় ছিলো প্রবল ঘূর্ণিঝড়। তবে এর মূল আঘাতটা ছিলো ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ফলে প্রাণহানি একেবারেই কম ছিলো সেই ঝড়ের সময়টাতে।
সবশেষ চলতি বছরের মে মাসে বঙ্গোপসাগরে তোলপাড় করে এগিয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড় ‘অশনি’। ইতিমধ্যেই এটি প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে রূপান্ত হয়েছে। এখন পর্যন্ত ঝড়টির গতিপথ ভারতের উড়িষ্যার দিকে। যদিও এটি স্থলভাগের কাছাকাছি গিয়ে বাঁক নিয়ে বাংলাদেশের দিকে আসবার আশঙ্কা এখনো রয়ে গেছে বলে জানিয়েছে আবহাওয়াবিদেরা।
একাত্তর/এআর
