একাত্তরে যুদ্ধাপরাধে জড়িত দল জামায়াতে ইসলামী, তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরসহ সব অঙ্গসংগঠনকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে পাঁচ ছাত্র সংগঠন।
বৃহস্পতিবারে যৌথ সভা করে এক বিবৃতির মাধ্যমে সরকারের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানায় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পাঁচ সংগঠন। ছাত্র সংগঠনগুলো হলো- বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (জাসদ), বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী, বাংলাদেশ ছাত্র আন্দোলন, জাতীয় ছাত্র ঐক্য।
এর আগে বিকেলে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পাঁচ সংগঠনের নেতারা যৌথ সভা করেন।
যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যুদ্ধাপরাধী ও গণহত্যাকারীদের দল, সন্ত্রাসবাদী জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি করায় স্বাগত জানিয়েছেন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতারা।
তারা বলেন, জামায়াত ও ছাত্রশিবির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই ধর্মীয় উগ্রবাদী, সন্ত্রাসবাদী, স্বাধীনতাবিরোধী, গণতন্ত্রবিরোধী, হত্যা-খুন-ধ্বংসের কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে।
‘১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অধীনস্থ রাজাকার বাহিনী, আলবদর বাহিনীর সদস্য হিসেবে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের (তৎকালীন ইসলামী ছাত্র সংঘ) সদস্যরা গণহত্যা, গণধর্ষণ ও যুদ্ধাপরাধ সংঘটনে পৈশাচিক ভূমিকা পালন করেছিলো,’ বলা হয় বিবৃতিতে।

যৌথ বিবৃতিতে আরও বলা হয়, স্বাধীনতার পর সংবিধানের (৩৮) ধারা অনুযায়ী জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্র সংঘকে (পরে ইসলামী ছাত্রশিবির) নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিলো। ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যাকাণ্ডের পর সামরিক স্বৈরশাসক, অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী জিয়াউর রহমান ১৯৭৬ সালে সংবিধানের (৩৮) ধারার উল্লিখিত অনুচ্ছেদগুলো বাতিল করে ধর্ম ভিত্তিক রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়।
‘এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার পর পুনরায় বৈধভাবে রাজনীতি করার সুযোগ পায় জামায়াত ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবির। সামরিক শাসক জিয়ার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবির আবারও প্রকাশ্যে রাজনীতিতে আর্বিভুত হয়।’
ছাত্র নেতারা বলেন, সামরিক শাসক জিয়া ও এরশাদের ছায়ায় ৮০’র দশকে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবির আবারও তাদের সন্ত্রাসবাদী রাজনীতি চালু করে। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, ইনস্টিটিউট, মাদ্রাসাসহ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দখলের রাজনীতি, গলাকাটা, রগকাটা, হত্যা ও ভীতির জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদী রাজনীতি শুরু করে। গণতান্ত্রিক—প্রগতিশীল সংগঠনের হাজারো নেতাকর্মীকে হত্যা এবং হাত ও পায়ের রগ কেটে চিরদিনের জন্য পঙ্গু বানিয়ে দেয়। যুদ্ধে ব্যবহৃত গান পাউডার ব্যবহার করে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের হল-হোস্টেল, অ্যাকাডেমিক ভবন, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আগুন জ্বালিয়ে ভস্মীভূত করে দেয়।
আশির দশক থেকে প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনসমূহ ও মুক্তিযোদ্ধারা জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধের দাবি করে আসছে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, ১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ শহিদ জননী জাহানারা ইমাম এর নেতৃত্বে গঠিত ঐতিহাসিক গণআদালত থেকেও জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবির নিষিদ্ধের দাবি উত্থাপন করা হয়েছিলো। গণজাগরণের আন্দোলনের উত্তাল সময়ে গোটা বাংলাদেশ সমস্বরে উচ্চারণ করে, 'জামাত-শিবির নিষিদ্ধ চাই।' ২০১৩ সালের ১ আগস্ট হাইকোর্ট এক রায়ের মাধ্যমে সংবিধানের সাথে গঠনতন্ত্র সাংঘর্ষিক এবং সাম্প্রদায়িক, নারী বিরোধী, জনগণের সার্বভৌমত্বের ধারণার বিরোধী হওয়ায় জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন অবৈধ বলে রায় দেয়। ২০১৮ সালের ৮ ডিসেম্বর দলটির নিবন্ধন বাতিল করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
২০১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক বিশ্বখ্যাত নিরাপত্তা বিষয়ক থিংক ট্যাংক আই এইচ এস জেনস বিশ্বের তৃতীয় শীর্ষ সন্ত্রাসী সংগঠন হিসাবে ইসলামী ছাত্র শিবিরের নাম তালিকাভুক্ত করে।
গত ৩০ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ১৪ দলের সভায় সন্ত্রাসবাদী ও যুদ্ধাপরাধী সংগঠন জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত হয়।
ছাত্রনেতারা যৌথ বিবৃতিতে বলেন, জামায়াত ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসাবে চিহ্নিত করে সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি করে নিষিদ্ধ করায় বাংলাদেশের ছাত্রসমাজ স্বাগত জানাচ্ছে। একইসাথে, জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের সকল সাংগঠনিক পর্যায়ে যুক্ত ব্যক্তিদেরও সন্ত্রাসবাদী হিসেবে তালিকা প্রকাশ এবং জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবির নিয়ন্ত্রিত সকল ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, কোচিং সেন্টারসহ মৌলবাদী-সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ডে অর্থায়নের সাথে সম্পৃক্ত সকল প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে আনার জোর দাবি জানাচ্ছে।
যৌথ বিবৃতিতে সই করেন- সাদ্দাম হোসেন (সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ), শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান (সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ), রাশিদুল হক ননী (সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ-জাসদ), মাসুদ আহাম্মেদ (সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ-জাসদ), অতুলন দাস আলো (সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী), অদিতি আদ্রিতা সৃষ্টি (সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী), রবিন হোসেন জয় (আহ্বায়ক, বাংলাদেশ ছাত্র আন্দোলন) এবং শাহিনুর রহমান (আহ্বায়ক, জাতীয় ছাত্র ঐক্য)।
‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ
জঙ্গি সংগঠন হিসেবেই জামায়াত-শিবিরকে মোকাবিলা: প্রধানমন্ত্রী
নাশকতা মোকাবিলার সক্ষমতা রয়েছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী