দীর্ঘ ছয় বছর পর অনুষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের ফলাফল অনেকটাই আঁতকে দিয়েছে বিএনপিরসহ সকল রাজনৈতিক দলগুলোকে। ইতিহাসে কখনো এমন ফলাফল হয়নি। একদিকে যেমন ফলাফলটি অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে অন্যদিকে নির্বাচনে অনিয়মের প্রশ্ন না তুলে আত্ম উপলব্ধিতে মগ্ন বিএনপি’র ত্যাগী কর্মীরা।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্টের মাধ্যমে আসন্ন নির্বাচনকে নিয়ে তাদের ভাবনা ও ডাকসুতে পরাজয় মেনে নিয়ে সংশোধনের কথা বলছেন।
সম্প্রতি এমন একটি ফেসবুক পোস্ট সামনে এসেছে। পোস্টটি করেছেন আশুলিয়া থানা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান মঈনউদ্দিন বিপ্লব। সেখানে তিনি ডাকসুদের ছাত্রদলের পরাজয়ের কারণগুলো তুলে ধরেছেন সেই সাথে আসন্ন নির্বাচনে বিএনপির তৃণমূল কীভাবে দলের পক্ষে কাজ করতে পারে সেটিও সামনে এনেছেন। পাঠকদের জন্য তার ফেসবুক পোস্টটি তুলে ধরা হলো।
‘ডাকসু নির্বাচনের ফল প্রকাশে আমাদের দল বিএনপির অনেকে ভেঙে পড়েছেন। এটা সত্য যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের ঘাঁটি ছিল। নির্বাচনে আমাদের প্রার্থীও শক্তিশালী ছিল। তবু দেখতে হলো এমন পরাজয়। এ নিয়ে বিশ্লেষণ ও আত্মশুদ্ধির জায়গা আছে বলেই আজ এ প্রসঙ্গে আমার লিখতে বসা।’
তিনি লেখেন, নির্বাচনের ফলাফলে দেখতে পাচ্ছি ছাত্রী হলগুলোয় আমাদের ভরাডুবি হয়েছে। শিবির নারীদের হিজাব পরাতে চায়। অন্যদিকে বিএনপি নারী স্বাধীনতায় বিশ্বাসী একটি উদারনৈতিক দল। আমি মনে করি, বাংলাদেশের সমাজের ভেতর গত কয়েক বছরে বিশাল একটি পরিবর্তন ঘটে গেছে। নারীরাও এ পরিবর্তনের বাইরে নন। হিজাবকে তারা আপন মনে করেছেন। এজন্য অভ্যস্ত হয়েছেন এমন পোশাকে। তাই পর্দা প্রথাকে টিটকারি মেরে আমাদের রাজনীতি করা একদমই ঠিক হবে না। বরং পরিস্থিতি মেনে নিয়ে কার্যকর পরিকল্পনায় নিজেদের রাজনীতি বিন্যস্ত করতে হবে।
দেওয়ান মঈনউদ্দিন বিপ্লব বলেন, গত ১৭ বছরে আমাদের ছেলেরা ছিলো ক্যাম্পাস ছাড়া। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের হামলা, মামলা, নির্যাতন আমাদের সহ্য করতে হয়েছে। অন্যদিকে শিবির কাজ করেছে ছাত্রলীগের ভেতরে ঢুকে। তারা কখনো ক্যাম্পাস ছাড়েনি। মার খেলেও মরিয়া হয়ে পড়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। তাই তারা ক্যাম্পাসের পরিচিত মুখ। সেখানে আমাদের প্যানেলের অনেক প্রার্থীকে ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীদের অচেনা মনে হয়েছে। তাই সেভাবে তারা ভোটের বাক্সে প্রভাব রাখতে পারেনি।
তিনি বলেন, ৫ আগস্টের পর বিএনপির বিরুদ্ধে অপপ্রচার চলেছে তুমুলভাবে। তৃণমূল পর্যায়ে যারাই চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের সঙ্গে যুক্ত তাদের বলা হয়েছে বিএনপির লোক। কিছু ক্ষেত্রে বিএনপির ছেলেরা খারাপ কাজে জড়িয়েছে। কিন্তু সবক্ষেত্রে বিএনপি দায়ী এটা বলা যাবে না। কিন্তু প্রতিপক্ষের এই নেগেটিভ ব্র্যান্ডিংয়ের শিকার হয়েছে আমাদের দল। এজন্য অনেক ভোট হারিয়েছে ছাত্রদল।
‘এটা মানতে হবে দুঃসময়ে কাউকে কাছে পাওয়া যায় না। কিন্তু সুসময়ে লোকজনে ভরে যায় চারপাশ। বিএনপির এখন হয়েছে সে অবস্থা। অনেক তোষামোদকারী এখন দলের উচ্চপদে আসীন হয়েছেন। যাদের আমরা বিগত ১৭ বছর চোখে দেখিনি। তারা হাইকমান্ডকে প্রভাবিত করছেন নানাভাবে। দলের ভরাডুবির জন্য এরাও কম দায়ী নয়। ’
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান একজন যোগ্য নেতা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তারেক রহমান জানেন বাস্তবতা আসলে কী? তাই এখনই সময় দলকে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত করা। এর জন্য যেটা প্রয়োজন তাহলে যোগ্য, ত্যাগী ও নির্যাতনের শিকার নেতৃবৃন্দকে দলে মূল্যায়ন করতে হবে।
‘ছাত্র সংসদের নির্বাচন ও জাতীয় নির্বাচনের মধ্যে অনেক তফাত আছে। ডাকসু প্রভাব তাই ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে খুব বেশি পড়বে না। তখন অনেক নতুন ইস্যু সামনে আসবে। তাই আমি আমাদের দলের নেতাকর্মীদের বলব, আপনারা ভেঙে পড়বেন না। ডাকসুতে যেটা ঘটেছে সেটা আমাদের আত্মশুদ্ধি ও নতুন কর্মপরিকল্পনার জন্য ভালো হয়েছে। আমাদের হাতে এখনও অনেক সময় আছে। আমাদের নেতা তারেক রহমান একজন বিচক্ষণ নেতা। তিনি সময় বুঝে দলকে নেতৃত্ব দেবেন বিজয়ের পথে। এর আগ পর্যন্ত আমাদের সংঘবদ্ধ থাকতে হবে।
দেওয়ান মঈনউদ্দিন বিপ্লব বলেন, বিএনপি বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া দল। আমরা গত ১৭ বছরে ভয়াবহ দুঃশাসনের মধ্যে বিলীন হয়ে যাইনি। তাই নিজেদের হীনমন্য ভাববেন না। লড়াইয়ের শক্তিতে উজ্জীবিত হন প্রত্যেকে। যে লড়াই আমাদের মুক্তির পথ খুলে দেবে।
‘এখন নতুন জেন-জি প্রজন্মের যুগ। এরা মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি। মুক্তিযুদ্ধের গল্পের চেয়ে এদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বর্তমান। তাই এদের সামনে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি করুন। এরা দেখবে আমাদের সমসময়ের কর্মকৌশল। সেই কর্মকৌশল দিয়ে এদের মুগ্ধ করতে হবে। যেটা শিবির করে দেখিয়েছে।’
‘তাই নিজেদের নতুন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের এখনই সময়। বহু দুঃসময় পাড়ি দিয়ে আমরা আজকের অবস্থানে পৌঁছেছি। আমাদের হারার আগে হেরে যাওয়ার অবকাশ নেই। ডাকসুর ফল বরং জাগ্রত করবে সারাদেশের বিএনপির সব অঙ্গ সংগঠনকে। আসুন, সে উদ্দীপনায় আমরা প্রস্তুত হই জাতীয় নির্বাচনের জন্য। মানুষের আস্থার দল যে বিএনপি সেটা প্রমাণের উপলক্ষ্য এই ভোট। তাই সময় উপযোগী কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এখন থেকেই মাঠে থাকতে হবে।’
সবশেষ তিনি বলেন, শহীদ জিয়ার আদর্শে, দেশনেত্রী ও গণতন্ত্রের জননী খালেদা জিয়ার দোয়ায় ও জননেতা তারেক রহমানের নির্দেশে দলকে পরিচালনায় আমাদের যেন কোনো ঘাটতি না থাকে। আমরা লড়বো এবং জিতবো। হতাশা ভুলে এ শপথে অনুপ্রাণিত থাকতে হবে আমাদের সবাইকে।
যুদ্ধের পর প্রথম রায়েরবাজারে একাত্তরের শহীদদের শ্রদ্ধা জানালো শিবির!