উয়েফা নেশনস লিগের আসন্ন ম্যাচে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে আয়ারল্যান্ড ও ইসরাইল। তবে মাঠের ফুটবলের চেয়ে এই ম্যাচকে ঘিরে বর্তমানে আয়ারল্যান্ডের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে যে উত্তেজনার পারদ চড়ছে, তা ফুটবল পাড়ায় রীতিমতো তোলপাড় ফেলে দিয়েছে।
ইসরাইলকে বয়কট করার তীব্র দাবির মুখে এবার আইরিশ দলের হেড কোচ হেইমির হালগ্রিমসন নিজের খেলোয়াড়দের উদ্দেশ্যে এক বিস্ফোরক বার্তা দিয়েছেন। ফুটবলীয় লড়াইকে আক্ষরিক অর্থেই যুদ্ধের ময়দানের সাথে তুলনা করে তিনি বলেছেন, ইসরাইলের বিরুদ্ধে ‘এই যুদ্ধ আমাদের জিততেই হবে’।
গাজায় ইসরায়েলের চলমান নৃশংস সামরিক অভিযানের প্রতিবাদে আয়ারল্যান্ডের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এফএআই)-এর ওপর ম্যাচ দুটি বয়কট করার জন্য দেশের ভেতর থেকেই প্রবল চাপ সৃষ্টি হয়েছে।

এমনকি গতকাল বুধবারও আয়ারল্যান্ডের সংসদ ‘ডেইল’-এর বাইরে এই ম্যাচ বাতিলের দাবিতে নতুন করে বিক্ষোভ হয়েছে। বেশ কয়েকজন ফিলিস্তিনপন্থী আইরিশ রাজনীতিবিদ এবং ফুটবল ব্যক্তিত্ব সোজা জানিয়ে দিয়েছে, গাজায় ইসরাইলের আগ্রাসনের পর তাদের সাথে কোনো ম্যাচ খেলা উচিত নয়।
এর আগে গত নভেম্বর মাসে আয়ারল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন উয়েফার কাছে ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবিলম্বে নিষিদ্ধ করার আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানালেও ইউরোপীয় ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছ থেকে কোনো সাড়া পায়নি।
মজার বিষয় হলো, আইসল্যান্ডীয় বংশোদ্ভূত ৫৮ বছর বয়সী কোচ হালগ্রিমসন নিজেও গত অক্টোবরে ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে নিষিদ্ধ করার দাবি তুলেছিলেন। কাতারের বিরুদ্ধে একটি প্রীতি ম্যাচের আগে ডাবলিনে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি বলেন, এই বিষয়ে আমার ব্যক্তিগত মতামত আমি আগেই জানিয়েছি, সেটা নতুন করে বলার কিছু নেই।
তবে ফুটবলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে, এটি এমন একটি বাধা যা আমার একদম পছন্দ নয়। খেলোয়াড়দের এবং আমাদের এমন একটি বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলাটা অন্যায়। কিন্তু দিনশেষে আমরা খলনায়ক হতে চাই না। আমরা এখানে কোনো অপরাধ করিনি।

ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিয়ে আইরিশ কোচ আরও যোগ করেন, আমার মনে হয় এই পরিস্থিতির সবচেয়ে নিখুঁত জবাব হবে মাঠের খেলায় ওদের হারিয়ে দেওয়া। ওদের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধটা জেতাই হবে আমার পক্ষ থেকে সেরা উত্তর। বয়কট করার মতো অন্য সিদ্ধান্তগুলো আমাদের হাতে নেই, তবে প্রতিপক্ষ যেই হোক না কেন, সব খেলোয়াড়ই দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে এবং ভালো খেলতে মুখিয়ে আছে।
নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে ইসরাইল তাদের বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জন পর্বের ম্যাচগুলো হাঙ্গেরিতে খেলেছিল। নেশনস লিগে আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর আয়ারল্যান্ডের বিরুদ্ধে নিজেদের হোম ম্যাচটিও তারা একটি নিরপেক্ষ ভেন্যুতে খেলবে। তবে আগামী ৪ অক্টোবর ডাবলিনের মাটিতে হতে যাওয়া ম্যাচটি নিয়েই আয়ারল্যান্ডে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে সবচেয়ে বেশি।
ম্যাচটি অন্য কোনো দেশে সরিয়ে নেওয়ার গুঞ্জন উঠলেও, গত ফেব্রুয়ারিতে আয়ারল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, উয়েফার নিয়ম মেনে ইসরাইলের বিরুদ্ধে এই দুটি ম্যাচ খেলা ছাড়া তাদের সামনে কোনো বিকল্প নেই।
ম্যাচ সরানোর এই গুঞ্জন নিয়ে কোচ হালগ্রিমসন সতর্ক করে বলেছেন, নিজেদের মাটিতে না খেলাটা ফুটবলীয় কারণে আমাদের জন্য বড় ধরনের অসুবিধা তৈরি করবে। ঘরের মাঠে আমরা দারুণ খেলি। ডাবলিনের আভিভা স্টেডিয়ামকে আমরা আমাদের শক্তিশালী দুর্গ হিসেবে গড়ে তুলছি, তাই ম্যাচ অন্য কোথাও সরিয়ে নিলে আমাদের জেতার সম্ভাবনা কমে যাবে। আমি আশা করব, মানুষ বিক্ষোভ বা দলের ক্ষতি হয় এমন কিছু না করে, আমাদের এবং খেলোয়াড়দের পাশে এসে দাঁড়াবে।
রাজনীতি আর ফুটবলের এই জটিল মারপ্যাঁচে আগামী সেপ্টেম্বরের ম্যাচ দুটি যে টানটান উত্তেজনায় ঠাসা হতে যাচ্ছে, তা বলাই বাহুল্য।
