দু’বছর আগে লুইস দে লা ফুয়েন্তের হাত ধরেই নতুন এক আক্রমণাত্মক কৌশলে ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জিতেছিল স্পেন। এবার ফিফা বিশ্বকাপে ‘লা রোজা’ বা স্পেন মাঠে নামছে হট ফেভারিট হিসেবে। তবে স্প্যানিশ দলের প্রধান কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে এই হাইপ বা ফেভারিট তকমা নিয়ে লুকিয়ে চুরিয়ে খেলতে নারাজ; বরং বুক ঠুকে এই গৌরবকে আলিঙ্গন করছেন তিনি।
টুর্নামেন্ট শুরুর প্রাক্কালে সংবাদসংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে দে লা ফুয়েন্তে জানিয়েছেন, এই ফেভারিট তকমা মূলত তাঁর এক দশকেরও বেশি সময় ধরে স্পেনের তৃণমূল পর্যায় থেকে গড়ে তোলা দীর্ঘমেয়াদী প্রজেক্টেরই এক প্রাপ্য স্বীকৃতি।
স্পেনের হেড কোচ বলেন, স্পেনকে ফেভারিট বলা হচ্ছে দেখে আমরা সত্যিই আনন্দিত। এটি আমাদের এক বিশাল উদ্দীপনা নিয়ে বিশ্বকাপে মাঠে নামতে সাহায্য করবে। আমরা এমন এক ক্ষুধার্ত দল যারা বড় কিছু অর্জন করতে চায় এবং নিজেদের প্রতিনিয়ত আরও উন্নত করতে চায়।

তবে ফেভারিট তকমা পেলেও দলের ভেতর যেন আত্মতুষ্টি জেঁকে না বসে, সে বিষয়ে দারুণ সতর্ক ৬৪ বছর বয়সী এই মাস্টারমাইন্ড। তিনি মনে করেন, মাঠের লড়াইয়ে নামার আগেই নিজেদের বিজয়ী ভাবলে তা হবে মস্ত বড় ভুল। দে লা ফুয়েন্তে বলেন, আমরা যদি মনে করি ফেভারিট হওয়াই সব কিছুর গ্যারান্টি দেয়, তবে আমরা ভুল পথে হাঁটছি। এটি আসলে কিছুরই গ্যারান্টি দেয় না! এবারের বিশ্বকাপে অন্তত আট থেকে দশটি দল আছে যারা বিশ্বমানের। তারা কি আমাদের চেয়ে ভালো? অবশ্যই। আমরা কি নিজেদের তাদের মতোই শক্তিশালী মনে করি? অবশ্যই করি। কিন্তু দিনশেষে এসব সমীকরণ মাঠে কোনো গ্যারান্টি এনে দেয় না।
কাটছে ইয়ামাল-উইলিয়ামসদের ইনজুরি আতঙ্ক: আগামী ১৫ জুন বিশ্বকাপ ডেবিউট্যান্ট বা নবাগত দেশ কেপ ভার্দের বিরুদ্ধে ম্যাচ দিয়ে নিজেদের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করবে স্পেন। আর এই ম্যাচের আগেই স্প্যানিশ শিবিরে স্বস্তির সুবাতাস বইছে। দলের অন্যতম প্রধান তিন তারকা- লামিন ইয়ামাল, নিকো উইলিয়ামস এবং মিকেল মেরিনোর ইনজুরি সমস্যা অনেকটাই কেটে গেছে।
উল্লেখ্য, গত এপ্রিলের মাঝামাঝিতে হ্যামস্ট্রিং ইনজুরিতে পড়েন দুই তরুণ তুর্কি ইয়ামাল ও উইলিয়ামস। অন্যদিকে, পায়ের পাতার স্ট্রেস ফ্র্যাকচারের অস্ত্রোপচারের কারণে গত জানুয়ারি থেকে মাঠের বাইরে ছিলেন তারকা মিডফিল্ডার মিকেল মেরিনো।

তাঁদের সর্বশেষ আপডেট নিয়ে কোচ বলেন, আমার বিশ্বাস, উদ্বোধনী ম্যাচেই তারা সবাই স্কোয়াডে থাকার জন্য ফিট হয়ে যাবে। তবে তার মানে এই নয় যে তারা শুরু থেকেই খেলবে। আমরা হয়তো প্রথম ম্যাচে তাদের খেলার সময় কিছুটা কমিয়ে দিতে পারি, কিংবা একদমই মাঠে না নামিয়ে বিশ্রাম দিতে পারি।
রোটেট পদ্ধতিতে খেলবে স্পেন: ফুয়েন্তের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ স্পেনের কৌশলগত পরিকল্পনা নয়, বরং তিন দেশের যৌথ আয়োজনে হতে যাওয়া বিশাল টুর্নামেন্টে ফুটবলারদের ফিটনেস ধরে রাখা। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকোর মাটিতে এবারই প্রথম ৪৮ দলের অংশগ্রহণে রেকর্ড ১০৪টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে।
এই দীর্ঘ পথচলা এবং ধকল সামলাতে স্পেনের ২৬ সদস্যের স্কোয়াডকে কোনো নির্দিষ্ট ছকে না রেখে অত্যন্ত নমনীয় ও রোটেট বা অদলবদল পদ্ধতিতে ব্যবহার করার পরিকল্পনা করছেন কোচ।
তিনি বলেন, এবার অনন্য এবং কঠিন এক টুর্নামেন্ট, যেখানে ম্যাচগুলোর মাঝে রিকভারি বা সেরে ওঠার জন্য খুব কম সময় পাওয়া যাবে। প্রচুর ক্লান্তি, দীর্ঘ বিমানভ্রমণ, তীব্র গরম, তাপমাত্রার তারতম্য, আর্দ্রতা এবং টাইম জোনের পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলো ফুটবলারদের শরীরের ওপর চরম ধকল ফেলবে।

দে লা ফুয়েন্তে আরও যোগ করেন, আমরা পরিস্থিতি বুঝে এবং প্রতিমুহূর্তে খেলোয়াড়দের শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে দলে রোটেশন বা পরিবর্তন আনব। দলের প্রত্যেকেই দারুণ ছন্দে আছে এবং প্রথম বা দ্বিতীয় ম্যাচ থেকেই খেলার জন্য প্রস্তুত। তবে এই মুহূর্তে আমার সবচেয়ে বড় প্রার্থনা ও চিন্তা হলো, টুর্নামেন্ট চলাকালীন যেন নতুন করে কোনো খেলোয়াড় ইনজুরিতে না পড়েন।
ইউরোর পর এবার আমেরিকার মাটিতে স্প্যানিশ তিকিতাকার নতুন সংস্করণ নিয়ে দে লা ফুয়েন্তে বিশ্বজয় করতে পারেন কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
