গ্রেট শো অন আর্থ- ফিফা বিশ্বকাপের মহাযজ্ঞ শুরু হতে বাকি আর মাত্র কয়েকটা ঘণ্টা। বৃহস্পতিবার ঐতিহ্যবাহী এস্তাদিও আজতেকা স্টেডিয়ামে স্বাগতিক মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার ম্যাচ দিয়ে পর্দা উঠছে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও ৪৮ দলের এই মেগা টুর্নামেন্টের।
কিন্তু মাঠের বল গড়ানোর আগেই অফ-ফিল্ড কেলেঙ্কারি, ট্রাম্প প্রশাসনের বিতর্কিত অভিবাসন নীতি আর মেক্সিকোর রাজপথে দাঙ্গা আতঙ্কে পুরো টুর্নামেন্ট এখন খাদের কিনারায়! এমন এক চরম উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে বুধবার মেক্সিকো সিটিতে মিডিয়ার মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো, যেখানে টিকিটের আকাশচুম্বী দাম এবং আমেরিকার ‘মিলিটারি স্টাইল’ ইমিগ্রেশন ক্র্যাকডাউন নিয়ে তাঁকে ধুয়ে দেওয়ার জন্য তৈরি হয়ে আছেন বিশ্ব সাংবাদিকরা।

সবচেয়ে বড় বোমাটি ফেটেছে মিয়ামি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। আফ্রিকার বর্ষসেরা রেফারি, সোমালিয়ার ওমর আরতানকে মার্কিন ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ চরম হেনস্তা করে দেশ থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। এর ফলে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কট্টর অভিবাসন নীতি যে এই ফুটবল মহোৎসবে এক বড় ধরণের কালিমালিপ্ত ক্ষত রেখে যাচ্ছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রথম সোমালিয়ান হিসেবে বিশ্বকাপে ম্যাচ পরিচালনা করার স্বপ্ন নিয়ে আমেরিকা পৌঁছানো আরতানকে টানা ১১ ঘণ্টা ম্যারাথন জেরা করা হয়, এরপর একটি বন্দি সেলে আটকে রেখে প্রথম ফ্লাইটে তুরস্কে ফেরত পাঠানো হয়।
স্বপ্নভঙ্গ ও মার্কিন প্রশাসনের ‘জঙ্গি’ জুজু: চরম হতাশা প্রকাশ করে রেফারি ওমর আরতান দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসকে বলেন, আমার জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্নটাকে ছিঁড়ে ফেলা হলো। আমি শুধু একজন রেফারি, যে নিজের স্বপ্নপূরণ করতে বিশ্বকাপে এসেছিল।
সোমালি সরকারের পক্ষ থেকে আরতানের বৈধ ভিসা ও সমস্ত কাগজপত্রের সত্যতা নিশ্চিত করা হলেও মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের এক কর্মকর্তা উল্টো দাবি করেছেন, এই রেফারির সাথে নাকি সন্দেহভাজন জঙ্গি সংগঠনের সদস্যদের যোগাযোগ রয়েছে, তাই তাঁকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি!

তবে মোগাদিশুতে ফিরে আরতান এক বীরোচিত সংবর্ধনা পেয়েছেন এবং হুংকার দিয়ে বলেছেন, এই অন্যায়ে আমি দমে যাব না, ২০৩০ বিশ্বকাপে আমি থাকবই। কেবল রেফারিই নন, ট্রাম্পের এই বিতর্কিত নীতির কারণে বহু হাই-প্রোফাইল ফুটবল অফিশিয়াল ও ভক্তদেরও যৌথ আয়োজক দেশ আমেরিকায় ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না।
উদ্বোধনী ম্যাচেই দাঙ্গার কালো মেঘ: আমেরিকার বাইরে মেক্সিকোর পরিস্থিতিও থমথমে। টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী ম্যাচকে পণ্ড করতে রাজধানী মেক্সিকো সিটির রাজপথে নেমেছে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী। গত মঙ্গলবার তারা এস্তাদিও আজতেকা স্টেডিয়ামের দিকে যাওয়ার প্রধান রাস্তাগুলো ব্লক করে দেয়। যদিও বিশাল পুলিশ বাহিনী ব্যারিকেড দিয়ে স্টেডিয়াম রক্ষা করেছে।

মেক্সিকোর বামপন্থী প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শিনবাউম এই বিক্ষোভকে উসকানি বলে উল্লেখ করলেও সোজা জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি কোনো আন্দোলন দমনের জন্য পুলিশি নির্যাতন করতে দেবেন না, তবে উদ্বোধনী ম্যাচের নিরাপত্তা শতভাগ ‘গ্যারান্টিড’।
মাঠের স্বস্তি কেবল ‘বুড়ো’ মেসিতে: মাঠের বাইরের এই নরক গুলজারের মাঝে ফুটবলপ্রেমীদের জন্য একমাত্র স্বস্তির খবর নিয়ে এসেছেন বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন লিওনেল মেসি। হ্যামস্ট্রিংয়ের চোট কাটিয়ে গত মঙ্গলবার আলাবামার মাঠে আইসল্যান্ডের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে বদলি হিসেবে মাত্র ২০ মিনিট খেলেই যাদুর ছোঁয়া দেখিয়েছেন ৩৮ বছর বয়সী এই কিংবদন্তি। ৮৮,০০০ দর্শকের গগনবিদারি চিৎকারের মাঝে মাঠে নেমেই লাউতারো মার্টিনেজকে দিয়ে একটি ফাউল আদায় করান এবং পেনাল্টি থেকে বুলেট গতির শটে গোল করে আর্জেন্টিনাকে ৩-০ ব্যবধানে জেতান।

রেকর্ড ষষ্ঠ বিশ্বকাপে নামার জন্য পুরোপুরি ফিট মেসি আগামী ১৬ জুন কানসাস সিটিতে আলজেরিয়ার বিপক্ষে ট্রফি ধরে রাখার মিশন শুরু করবেন। তবে মাঠের বাইরে ফিফা এবং ট্রাম্প প্রশাসন যেভাবে বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে, তাতে ফুটবল প্রেমীরা খেলা উপভোগ করবেন নাকি এই নোংরা রাজনীতি গিলবেন, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন!
