লিওনেল মেসি যে তর্কাতীতভাবে সর্বকালের সেরা ফুটবলার, তাতে এখন আর কোন বিতর্ক নেই। তবে তার কট্টর ভক্তদেরও হয়তো এই মহাতারকার জীবনের সব খুঁটিনাটি জানা নেই। গোল আর ট্রফির চেনা খতিয়ানের বাইরে মেসির জীবনের এমন ১০টি চমকপ্রদ তথ্য এখানে তুলে ধরা হলো:
১. এক সঙ্গীতশিল্পীর নামানুসারে নামকরণ: মেসির পুরো নাম লিওনেল আন্দ্রেস মেসি। তার জন্মের সময় মা সেলিয়ার প্রিয় গায়ক ছিলেন পপ তারকা লিওনেল রিচি; আর তার নামানুসারেই এই ফুটবল জাদুকরের নাম রাখা হয় 'লিওনেল'। সঙ্গীত জগতের চার্ট ছাড়িয়ে এই নামটি যে একদিন ফুটবল লোকগাথার চূড়ায় পৌঁছাবে, তা হয়তো তখন কেউ ভাবেনি।

২. ফুটবলার মেসিকে গড়ে তুলেছিলেন তার নানী: এজেন্ট কিংবা স্কাউটদের নজরে আসার অনেক আগেই, রোজারিওতে মেসির শৈশবের প্রথম এবং সবচেয়ে একনিষ্ঠ সমর্থক ছিলেন তার দাদি সেলিয়া। ছোট্ট মেসির অনুশীলন থেকে শুরু করে প্রতিটি ম্যাচে নিয়মিত মাঠে হাজির থাকতেন তিনি। মেসি পেশাদার ফুটবলার হওয়ার আগেই তিনি পরলোকে পাড়ি জমান। কিন্তু দাদিকে কখনোই ভোলেননি মেসি; আজও প্রতিটি গোলের পর আকাশের দিকে আঙুল উঁচিয়ে তিনি গোলটি নানীর স্মৃতির উদ্দেশ্যেই উৎসর্গ করেন।

৩. পেশাদার ফুটবলে আসার আগেই প্রায় ৫০০ গোল: মাত্র সাত বছর বয়সে নিজের শহরের ক্লাব 'নিওয়েলস ওল্ড বয়েজ'-এ যোগ দেন মেসি। ২০০০ সালে বার্সেলোনায় পাড়ি জমানোর আগে ক্লাবের বিভিন্ন যুব দলের হয়ে তিনি প্রায় ৫০০ গোল করেছিলেন। এই অবিশ্বাস্য পরিসংখ্যানই আভাস দিচ্ছিল যে, বিশ্ব ফুটবলের বড় মঞ্চে কেমন এক ঝড় তুলতে যাচ্ছেন এই বিস্ময়বালক।
৪. লড়েছেন গ্রোথ হরমোনের ঘাটতির বিরুদ্ধে: ১০ বছর বয়সে মেসির শরীরে 'গ্রোথ হরমোন ডেফিসিয়েন্সি' বা উচ্চতা বৃদ্ধির হরমোনজনিত জটিলতা ধরা পড়ে। এর চিকিৎসা ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল, যা আর্জেন্টিনার মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। মূলত এই চিকিৎসার খরচ মেটানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েই বার্সেলোনা তাকে স্পেনে নিয়ে আসে এবং চুক্তির অংশ হিসেবে তার চিকিৎসার সব দায়িত্ব নেয়।

৫. শৈশবের ভালোবাসাকেই জীবনসঙ্গী করা: মেসি বিয়ে করেছেন তার শৈশবের প্রেমিকা আন্তোনেলা রোকুজ্জোকে। রোজারিওতে বেড়ে ওঠার সময় থেকেই তারা একে অপরকে চেনেন। থিয়াগো, মাতেও এবং চিরো নামের তিন পুত্রসন্তান রয়েছে এই দম্পতির। আধুনিক ফুটবলের চাকচিক্যময় দুনিয়ায় তাদের এই সম্পর্কটিকে অন্যতম নিভৃত ও নিখাদ ভালোবাসার গল্প হিসেবে দেখা হয়।
৬. সতীর্থের সন্তানের গডফাদার: আর্জেন্টাইন সতীর্থ সার্জিও অ্যাগুয়েরোর সাথে মেসির বন্ধুত্ব মাঠের সীমানা ছাড়িয়ে বহু দূর। তাদের এই আত্মিক সম্পর্কের গভীরতা বোঝা যায় একটি তথ্যে, অ্যাগুয়েরোর ছেলে বেনজামিনের 'গডফাদার' (ধর্মপিতা) হলেন স্বয়ং লিওনেল মেসি।

৭. ট্যাটুতে আঁকা জীবনের গল্প: মেসির শরীরে থাকা অসংখ্য ট্যাটুর প্রায় পুরোটাই তার পরিবারকে উৎসর্গ করা। এর মধ্যে সবচেয়ে ব্যক্তিগত ট্যাটুগুলোর মধ্যে রয়েছে তার স্ত্রীর চোখ, ছেলেদের নাম ও হাতের ছাপ এবং পিঠের ওপর মায়ের প্রতিকৃতি। এক কথায়, নিজের শরীরটাকেই প্রিয়জনদের ভালোবাসার এক জীবন্ত ডায়েরি বানিয়ে রেখেছেন তিনি।
৮. বার্সেলোনার প্রথম চুক্তি সই হয়েছিল টিস্যু পেপারে: ২০০০ সালের ডিসেম্বরে, মাত্র ১৩ বছর বয়সী মেসির ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে বার্সেলোনার তৎকালীন স্পোর্টিং ডিরেক্টর কার্লেস রেক্সাচ একটি দুপুরের খাবারের টেবিলে বসে সাধারণ এক ন্যাপকিন বা টিস্যু পেপারে প্রাথমিক চুক্তিপত্রটি লিখেছিলেন। মেসির বাবাকে আশ্বস্ত করতেই তড়িঘড়ি করে এই অনানুষ্ঠানিক চুক্তি করা হয়েছিল। ২০২৪ সালে সেই ঐতিহাসিক টিস্যু পেপারটি নিলামে ৯ লঅখ ৬৫ হাজার মার্কিন ডলারে বিক্রি হয়।

৯. ইনস্টাগ্রামে সবচেয়ে বেশি লাইক পাওয়া ছবি: ২০২২ সালের বিশ্বকাপ জয়ের পর ট্রফি হাতে উদযাপনের বেশ কয়েকটি ছবি ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করেছিলেন মেসি। সেই পোস্টটি ৭ কোটি ৪০ লাখের (৭৪ মিলিয়ন) বেশি লাইক পেয়ে ইনস্টাগ্রামের ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি লাইক পাওয়া পোস্টের রেকর্ড গড়ে। মজার বিষয় হলো, এর আগে এই রেকর্ডটি ছিল একটি সাধারণ ডিমের ছবির দখলে!
১০. ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা অ্যাসিস্ট দাতা: বিশ্বকাপের ইতিহাসে একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে দুইবার টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার 'গোল্ডেন বল' জিতেছেন মেসি। শুধু গোল করাই নয়, গোল করানোর ক্ষেত্রেও (অ্যাসিস্ট) তিনি সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছেন। ক্লাব ও আন্তর্জাতিক ফুটবল মিলিয়ে তার অ্যাসিস্টের সংখ্যা ৪১০ ছাড়িয়ে গেছে, যা ক্যারিয়ারের এই গোধূলিলগ্নেও প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে।
