বিশ্বকাপের শেষ বত্রিমেল হাইভোল্টেজ ম্যাচে বৃহস্পতিবার মুখোমুখি হচ্ছে ইউরোপসেরা স্পেন এবং অদম্য অস্ট্রিয়া। তবে মাঠের লড়াই শুরুর আগেই স্প্যানিশ মাঝমাঠের জাদুকর পেদ্রি অস্ট্রিয়ান কোচ রালফ রাংনিকের উদ্দেশ্যে একপ্রকার মনস্তাত্ত্বিক চাল খেলে বসেছেন। বার্সেলোনা তারকা পেদ্রি অকপটে স্বীকার করেছেন যে, প্রতিপক্ষ যখন রক্ষণভাগে ‘লো ব্লক’ কৌশলে একটু সনাতনী বা প্রথাগত ফুটবল খেলে, তখন মাঠে বল পায়ে কারিকুরি দেখাতে এবং খেলাটা উপভোগ করতে তার বেশি ভালো লাগে।

গ্রুপ পর্বে মার্সেলো বিয়েলসার উরুগুয়ের হাই-প্রেস ফুটবল স্পেনের জন্য কিছুটা অস্বস্তি তৈরি করলেও শেষ পর্যন্ত আলেক্স বায়েনার একমাত্র গোলে ১-০ ব্যবধানে জিতেই মাঠ ছাড়ে লা রোহারা। আর পুরো গ্রুপ পর্বে কোনো গোল হজম না করে ইতিহাস গড়ে নকআউটে পা রেখেছে তারা। অস্ট্রিয়ার মুখোমুখি হওয়ার আগে পেদ্রি স্প্যানিশ গণমাধ্যম মুন্দো দেপোর্তিভোকে বলেন, খুব কম দলেরই আমাদের চেপে ধরার সাহস থাকে। বিয়েলসার উরুগুয়ে ম্যান-টু-ম্যান মার্কিং করে আমাদের কাজটা কঠিন করে দিয়েছিল। তবে সাধারণত আমরা লো ব্লকের মুখোমুখিই বেশি হই। যখন খেলাটা পুরো সামনে পরিষ্কার দেখা যায়, তখন বল বেশি পায়ে আসে এবং দলীয় কম্বিনেশনটা দারুণ জমে।
তবে এই বিশ্বকাপে স্পেনের প্রধান দুশ্চিন্তার কারণ তাদের দুই ডানা কাটা পড়া। ইউরো ২০২৪ জয়ের দুই প্রধান নায়ক- লামিন ইয়ামাল ও নিকো উইলিয়ামসের জুটিকে চোটের কারণে একসাথে খেলাতে পারছেন না কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে। উইলিয়ামসের অনুপস্থিতিতে লেফট উইংয়ে খেলছেন অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার আলেক্স বায়েনা। পেদ্রি এই পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করে বলেন, ইউরোতে নিকো আর ইয়ামাল দুই প্রান্তে উইং বড় করে খেলত। এখন ইনজুরির কারণে আমাদের কৌশল বদলাতে হয়েছে। বায়েনা হয়তো জাত উইঙ্গার নয়, সে ভেতরে ঢুকে খেলতে পছন্দ করে, তবে সে দারুণ করছে।

উইলিয়ামস না থাকায় এখন স্পেনের সব আলো গিয়ে পড়েছে কিশোর বিস্ময় লামিন ইয়ামালের ওপর, যা ঘুম উড়িয়ে দিয়েছে অস্ট্রিয়ান লেফট-ব্যাক ফিলিপ ম্যুইনের। মাইনৎসের এই ডিফেন্ডার ইয়ামালকে কিলিয়ান এমবাপ্পে বা লিওনেল মেসির সাথে তুলনা করে বলেন, ‘এক বনাম এক’ লড়াইয়ে ইয়ামালকে শতভাগ থামিয়ে রাখা অসম্ভব। তার দুর্দান্ত টেকনিক ও গতি আছে। তাকে আটকাতে আমাদের দলগতভাবে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে, যাতে সে ফাঁকা জায়গা কম পায়।
এদিকে অস্ট্রিয়া এই নকআউট পর্বে এসেছে অনেক নাটকীয়তা পেরিয়ে। আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের ৯৬ মিনিটে সাশা কালাইদজিচের অবিশ্বাস্য গোলে ৩-৩ ড্র করে ১৯৮২ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপের পরবর্তী রাউন্ডে উঠেছে তারা। তবে এই কালাইদজিচ বদলি নামার মাত্র ৬১ সেকেন্ডের মাথায় গোল করে চলতি বিশ্বকাপের তৃতীয় দ্রুততম বদলি গোলের রেকর্ড গড়েছেন। অন্যদিকে অস্ট্রিয়ার ৩৭ বছর বয়সে ভেলকি দেখানো মারকো আরনাউতোভিচও ইতিহাস গড়েছেন; ৩৭ বছর বয়সের পর বিশ্বকাপে একাধিক গোল করা খেলোয়াড়দের তালিকায় মেসি, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ও রজার মিলার পাশে নাম লিখিয়েছেন তিনি।

পরিসংখ্যানের পাতায় অবশ্য স্পেনই যোজন যোজন এগিয়ে। ২০০২ সালের পর বিশ্বকাপে কোনো ম্যাচে প্রতিপক্ষের চেয়ে কম বল পজেশন রাখেনি স্পেন। ম্যান সিটির রদ্রিগো ৩৫০টি পাসের মধ্যে ৩২৮টি সফল করে পাসের রাজা হয়ে আছেন, আর ডিফেন্ডার এমেরিক লাপোর্ত বল পায়ে সবচেয়ে বেশি দূরত্ব (১০৫৯ মিটার) পার করার রেকর্ড ধরে রেখেছেন। বিপরীতে, অস্ট্রিয়ার রক্ষণভাগ টানা ১২টি বিশ্বকাপ ম্যাচে অন্তত একটি করে গোল হজম করার এক লজ্জাজনক রেকর্ড বয়ে বেড়াচ্ছে।
ইউরো ২০২৪-এর পর অস্ট্রিয়ার ধার কিছুটা কমায় ফুটবল পণ্ডিতদের ধারণা—আজকের ম্যাচে স্পেনের টিকির নাগাল পাওয়া অস্ট্রিয়ার জন্য একপ্রকার অসম্ভব হবে এবং স্পেন অনায়াসেই ৩-০ ব্যবধানে ম্যাচটি জিতে শেষ ষোলোর দিকে এগিয়ে যাবে। এখন দেখার বিষয়, পেদ্রির চাওয়া অনুযায়ী রাংনিক আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে স্পেনের ফাঁদে পা দেন, নাকি কোনো নতুন চমক দেখান!
