আর্জেন্টিনা বনাম স্পেনের মহাকাব্যিক ফাইনালের প্রথমার্ধ শেষ হতে না হতেই নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়াম রূপ নিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কনসার্ট ভেন্যুতে। ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই প্রথমবার আয়োজিত হলো অফিশিয়াল ‘হাফটাইম শো’, যা শুধু ১১ মিনিটের এক পপ সুনামি দিয়ে স্টেডিয়ামের ৮০ হাজার দর্শকসহ বিশ্বজুড়ে থাকা কোটি কোটি ভক্তকে স্তব্ধ করে দিল।
পপ সম্রাজ্ঞী ম্যাডোনা, জাস্টিন বিবার, কল্ডপ্লে, শাকিরা এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মেগাস্টার বিটিএস-এর মতো হেভিওয়েটদের উপস্থিতিতে এই আয়োজন যেন চাঁদের হাটকে হার মানাল!

ম্যাচের প্রথমার্ধের বাঁশি বাজার ঠিক ৬ মিনিটের মাথায়, স্থানীয় সময় ঠিক ৪:০১ মিনিটে শুরু হয় এই মহাযজ্ঞ। অনুষ্ঠানের প্রাক-রেকর্ডকৃত অংশে দেখা যায়, পপ কুইন ম্যাডোনা একটি ডুন বাগিতে চড়ে স্টেডিয়ামের টানেল দিয়ে ঝড় তুলে আসছেন, আর সেই গাড়ি চালাচ্ছেন ব্রাজিলের দুই কিংবদন্তি ফুটবলার রোনালদো ও রোনালদিনিও!

পর্দায় নিজের ২০০০ সালের হিট গান ‘মিউজিক’-এর নতুন ফিউশন গাইতে গাইতে মাঠে প্রবেশ করেন ম্যাডোনা। এরপর তিনি ব্যাটন বুঝিয়ে দেন কন্ডাক্টর গুস্তাভো দুদামেলের হাতে, যিনি নিউ ইয়র্ক ফিলহারমোনিক অর্কেস্ট্রা নিয়ে বিখ্যাত ‘সেভেন নেশন আর্মি’ গানের এক ক্লাসিকাল ঝড় তোলেন, যেখানে দ্য মাপেটস-এর রিক অ্যান্ড রোল পারফরম্যান্সও ছিল চোখে পড়ার মতো।

ঠিক এর পরেই মাঠের সবুজ গালিচায় আগুন ধরায় কে-পপ সম্রাট বিটিএস। বাধ্যতামূলক সামরিক পরিষেবা থেকে তিন বছরের বিরতি কাটিয়ে ফেরার পর এটিই তাদের সবচেয়ে বড় ধামাকা। গত রাতেই প্যারিসের স্টাড দে ফ্রান্সে শো শেষ করে রোববার সকালেই নিউ ইয়র্ক পৌঁছানো এই দলটি ফুটবলের থিমে তাদের বিখ্যাত গান ‘ডায়নামাইন’ গেয়ে পুরো স্টেডিয়ামকে নাচিয়ে তোলে।

বিটিএস-এর পর পর্দায় দেখা মেলে অ্যাপল টিভির বিখ্যাত সিরিজ ‘টেড ল্যাসো’-র প্রধান চরিত্র জেসন সুডেকিস এবং ব্রেন্ডন হান্টের। তারা মাঠের পেছনে জাস্টিন বিবারকে তাতিয়ে দেওয়ার পর বিবার মঞ্চে প্রবেশ করেন। গত এপ্রিলে কোচেলা কনসার্টের পর এটিই ছিল বিবারের প্রথম প্রকাশ্য পারফরম্যান্স। তিনি তাঁর ২০১৫ সালের পিস ‘এভরিথিং হালিলুজা’ গানটি দিয়ে স্টেডিয়ামের গগনবিদারি শোরগোলকে এক অদ্ভুত শান্ত ও মায়াবী আবহে রূপ দেন।

শান্ত পরিবেশকে মুহূর্তেই আবার রক-কনসার্টে রূপ দিতে মঞ্চে অবতীর্ণ হন ল্যাটিন পপ কুইন শাকিরা এবং নাইজেরিয়ান তারকা বার্না বয়। আফ্রিকার উগান্ডার ‘গেটো কিডস’-এর হলুদ পোশাকের একদল নৃত্যশিল্পীর সাথে তারা গেয়ে ওঠেন ২০২৬ বিশ্বকাপের অফিশিয়াল থিম সং ‘দাই দাই’, যা গ্যালারির দর্শকদের বুনো উল্লাসে ভাসিয়ে দেয়।

শেষভাগে কল্ডপ্লে ব্যান্ডের ক্রিস মার্টিনের কিউরেশনে স্টেডিয়ামের ঘাস বাঁচাতে বিছানো রামধনু রঙের তার্পিনের ওপর স্টাটেন আইল্যান্ডের স্কুলপড়ুয়ারা এসে যোগ দেয় এবং অস্ট্রেলিয়ান গায়ক ইমানুয়েল কেলির সাথে মিলে কল্ডপ্লের নতুন গান ‘উই ড্যান্স’ পরিবেশন করে এক স্বর্গীয় আবহ তৈরি করে।

মাঠের এই নজিরবিহীন গ্ল্যামার উপভোগ করতে গ্যালারিতে সশরীরে হাজির ছিলেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এছাড়াও ফ্যাশন ও হলিউড আইকন ফ্যারেল উইলিয়ামস, ম্যাট ডেমন, আদ্রিয়ান ব্রডি এবং উইল ফেরেলদের মতো মেগাস্টারদের গ্যালারিতে খোশমেজাজে ম্যাচ ও কনসার্ট উপভোগ করতে দেখা যায়। গ্লোবাল সিটিজেনের প্রযোজনায় এই হাফটাইম শোর মূল লক্ষ্য ছিল বিশ্বকাপের প্রতিটি টিকিট থেকে ১ ডলার অনুদান নিয়ে প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলারের একটি শিক্ষা তহবিল গঠন করা।

হাফটাইম শো যদি সুনামি হয়, তবে ম্যাচ শুরুর ৯০ মিনিট আগের প্রাক-ম্যাচ অনুষ্ঠানটি ছিল এক জম্পেশ কালবৈশাখী ঝড়! সেখানে পোস্ট ম্যালোন তাঁর নতুন গান ‘ক্রোম হার্টব্রেকার’ এবং স্পাইডার-ম্যান মুভির বিখ্যাত গান ‘সানফ্লাওয়ার’ গেয়ে দর্শকদের মন জয় করেন, যেখানে তাঁর সাথে মঞ্চে আসেন সোয়ে লি। এছাড়া ইন্টারনেট সেনসেশন আইশোস্পিড এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিংয়ের গ্রাফিক্সের ওপর নাচানাচি করে দর্শকদের মনে করিয়ে দেন, বস, এটাই বিশ্বকাপ!

সবশেষে রব্বি উইলিয়ামস, নিকোল শেরজিঙ্গার এবং লরা পাওসিনি মিলে ফিফা অ্যান্থেম ‘ডিজায়ার’ গান এবং জেনিফার হাডসন আমেরিকার জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করেন। এরপর হলিউড হার্টথ্রব টম ক্রুজ মাঠে এসে যখন তাঁর সেই বিখ্যাত ‘ফুটবলের কোনো নির্দিষ্ট ভাষা নেই’ ভাষণটি দিচ্ছিলেন, তখন গ্যালারিতে দর্শকদের ‘ওলে, ওলে, ওলে’ চিৎকারে নিউ জার্সির আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয়ে উঠছিল।
ফুটবল আর পপ মিউজিকের এমন রাজকীয় ও সফল জুগবন্দি বিশ্ববাসী এর আগে কখনো দেখেনি। একদিকে মাঠের ভেতর মেসি-ইয়ামালের বিশ্বকাপ জয়ের তীব্র লড়াই, আর অন্যদিকে বিরতিতে পপ দুনিয়ার এই মেগা ধামাকা, সব মিলিয়ে ২০২৬-এর এই ফাইনাল ইতিমধ্যেই ইতিহাসের সবচেয়ে দামি ও বিনোদনমূলক স্পোর্টিং ইভেন্ট হিসেবে নিজের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখে নিলো!
