নিউ জার্সির স্টেডিয়ামে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও দীর্ঘতম মহাযজ্ঞের অবসান ঘটল এক চরম নাট্যমঞ্চের মধ্য দিয়ে। বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে অতিরিক্ত সময়ের স্নায়ুক্ষয়ী লড়াইয়ে ১-০ গোলে গুঁড়িয়ে দিয়ে নিজেদের ইতিহাসের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ট্রফি ঘরে তুলল ইউরোপসেরা স্পেন!
২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে নেদারল্যান্ডসকে হারানোর পর এই প্রথম বিশ্বমঞ্চের মুকুট মাথায় তুলল স্প্যানিশ আর্মাডারা। অন্যদিকে, ১৯৬২ সালের পেলের ব্রাজিলের পর প্রথম দল হিসেবে টানা দুবার বিশ্বকাপ জেতার যে স্বপ্ন নিয়ে লিওনেল মেসি মাঠে নেমেছিলেন, তা মেটলাইফ স্টেডিয়ামের ঘাসেই সমাহিত হলো।

ম্যাচের ৬২ মিনিটে মিকেল ওয়ারজাবালের বদলি হিসেবে যখন বার্সেলোনা ফরোয়ার্ড ফেরান তোরেস মাঠে নামেন, তখন কে জানত তিনিই হতে চলেছেন স্পেনের নতুন ‘ইনিয়েস্তা’! নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলা গোলশূন্য থাকার পর ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।
অবশেষে ১০৬ মিনিটে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। রাইট-ব্যাক পেড্রো পোরোর এক নিখুঁত ক্রস বক্সে খুঁজে নেয় নিকো উইলিয়ামসকে। তার বাড়ানো দুর্দান্ত হেড থেকে একদম কাছ থেকে বল আর্জেন্টিনার জালে জড়িয়ে দেন তোরেস। উল্লাসে ফেটে পড়ে স্প্যানিশ শিবির, আর স্তব্ধ হয়ে যায় নীল-সাদা গ্যালারি।

গোটা ম্যাচজুড়েই স্পেনের টিকিটাকা ফুটবলের সামনে রীতিমতো কোণঠাসা ছিল আর্জেন্টিনা। স্পেনের আক্রমণের তীব্রতা এতটাই ছিল যে, ম্যাচ জুড়েই তারা অজস্র সুযোগ তৈরি করে। আর্জেন্টিনার অসহায়ত্ব ফুটে ওঠে একটি পরিসংখ্যানে, পুরো ম্যাচে গোলপোস্ট লক্ষ্য করে আর্জেন্টিনা তাদের প্রথম শটটি নেয় ১১৭ মিনিটে, যখন লিওনেল মেসির একটি প্রচেষ্টা স্প্যানিশ ডিফেন্সে ব্লক হয়ে যায়! তার আগ পর্যন্ত উনাই সিমনকে কোনো পরীক্ষাই নিতে পারেনি আলবিসেলেস্তেরা।
খেলার উত্তাপ ও মেজাজ এতটাই চড়া ছিল যে, তা রূপ নেয় কুৎসিত ফাউলে। ম্যাচের ৯০ মিনিটে স্পেনের তরুণ ডিফেন্ডার পাউ কুবার্সিকে এক মারাত্মক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন ফাউল করে বসেন চেলসির মিডফিল্ডার এনজো ফার্নান্দেজ। রেফারি স্লাভকো ভিনসিকের সামনে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড তথা লাল কার্ড দেখিয়ে কাতার বিশ্বকাপের ‘সেরা উদীয়মান তারকা’কে মাঠছাড়া করা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। ১০ জনের দলে পরিণত হওয়া আর্জেন্টিনা এরপর আর স্পেনের ওপর কোনো চড়াও প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। শেষ মুহূর্তের সব চাপ সামলে শিরোপা উৎসব করে দে লা ফুয়েন্তের শিষ্যরা।

রেকর্ডের বিশ্বকাপ আর চাঁদের হাট: আমেরিকা, কানাডা ও মেক্সিকো জুড়ে আয়োজিত ৪৮ দলের এই ঐতিহাসিক ও সর্ববৃহৎ বিশ্বকাপটি গোলবন্যার দিক থেকেও ছাড়িয়ে গেছে আগের সব রেকর্ডকে। ফাইনালের আগে পর্যন্ত টুর্নামেন্টে গোলের সংখ্যা ছিল ৩০৭টি!
তবে এই মেগা ফাইনালের গ্ল্যামার শুধু ফুটবলেই সীমাবদ্ধ ছিল না। গ্যালারিতে বসে খেলা দেখেছেন হলিউড মেগাস্টার ব্র্যাড পিট, টম ক্রুজ এবং ম্যাট ডেমন। বাস্কেটবল দুনিয়ার আস্ত একটা অল-স্টার টিমই যেন নেমে এসেছিল গ্যালারিতে; হাজির ছিলেন স্টিফেন কারি, ভিক্টর ওম্বানিয়ামা, শাই গিজিয়াস-অ্যালেকজান্ডার, কেভিন ডুরান্ট এবং জেমস হার্ডেন।
টেনিসের রাজকীয় প্রতিনিধি হিসেবে ছিলেন সেরেনা উইলিয়ামস ও কার্লোস আলকারাজ। এনএফএল- এর এলি ম্যানিং, প্যাট্রিক মাহোমস এবং আমেরিকার কিংবদন্তি স্কিয়ার মিকালো শিফরিন ও লিন্ডসে ভনও ছিলেন উপস্থিত। আর, ফুটবল রাজপুত্রদের মধ্যে গ্যালারি আলো করেছিলেন কাকা, ডেভিড বেকহ্যাম, দিদিয়ে দ্রগবা এবং জিনেদিন জিদান।

ম্যাচ শুরুর ৯০ মিনিট আগে পোস্ট ম্যালোন সমাপনী অনুষ্ঠান বা ক্লোজিং সেরিমনিতে সুরের জাদু ছড়ান, ঠিক যখন মেসিরা স্টেডিয়ামে পা রাখছিলেন। আর প্রথমার্ধের বিরতিতে ফিফার ইতিহাসে প্রথম ২৭ মিনিটের মেগা হাফটাইম শো-তে জাস্টিন বিবার, ম্যাডোনা, শাকিরা, বিটিএস ও বার্না বয়দের সাথে পারফর্ম করে সেসামি স্ট্রিট ও দ্য মাপেটসের চরিত্ররা। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই গ্যালারিতে উপস্থিত থেকে স্পেনের হাতে সোনালী ট্রফি তুলে দেওয়ার ঐতিহাসিক মুহূর্তটির সাক্ষী হন।
সব মিলিয়ে, মাঠের ভেতর এনজোর লাল কার্ডের কলঙ্ক আর মাঠের বাইরে হলিউড-পপ গ্ল্যামারের আলো, এই দুইয়ের মিশেলে স্পেনের এই বিশ্বজয় ইতিহাসের পাতায় অন্যতম এক ‘সসি’ এবং রোমাঞ্চকর ফাইনাল হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে!
