খেলা মাঠে গড়ানোর আগেই মাঠের বাইরের গরম খবরে টালমাটাল ফরাসি ফুটবল দল। কিলিয়ান এমবাপেকে ঘিরে বিশ্বকাপের ঠিক আগমুহূর্তে ফরাসি ড্রেসিংরুমে যে তীব্র অশান্তি আর ফাটল ধরেছে, তা নিয়ে এখন তোলপাড় পুরো ফুটবল দুনিয়া। পারফরম্যান্স নয়, বরং এমবাপের অহংকার, রক্ষণাত্মক খেলায় অনীহা আর দলের চেয়ে ব্যক্তিগত জীবনকে বেশি প্রাধান্য দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে সতীর্থ ও সমর্থকদের মনে ক্ষোভের আগুন জ্বলছে।
লিলের ডেক্যাথলন অ্যারেনায় উত্তর আয়ারল্যান্ডের বিরুদ্ধে ফ্রান্সের শেষ প্রস্তুতি ম্যাচটি ছিল মূলত ঘরের মাঠে সমর্থকদের কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার মঞ্চ। কিন্তু ম্যাচ শেষ হতে না হতেই শুরু হয় আসল ড্রামা। শেষ বাঁশি বাজার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ফরাসি দলের ক্যাম্প ছেড়ে চম্পট দেন অধিনায়ক এমবাপে।

যদিও ফরাসি ফেডারেশন জানায়, ব্যক্তিগত কারণে তাকে ছুটি দেয়া হয়েছিল, কিন্তু আসল রহস্য ফাঁস হয় যখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার কিছু ছবি ভাইরাল হয়। দেখা যায়, দলের সাথে বিশ্বকাপের বিমান ধরার আগে তিনি স্পেনের মাদ্রিদে তার প্রেমিকা এস্তার এস্পোসিতোর সাথে দিব্যি রোমান্স করে বেড়াচ্ছেন!
বিশ্বকাপের মতো এত বড় টুর্নামেন্টের ঠিক আগমুহূর্তে অধিনায়কের এমন ‘খেয়ালি’ আচরণকে কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না ফরাসি সমর্থকরা। তাদের পরিষ্কার কথা, এমবাপের কাছে দেশের চেয়ে প্রেমিকার সাথে ঘোরাঘুরির গুরুত্ব বেশি।
বিখ্যাত ফরাসি সংবাদমাধ্যম ‘লেকিপ’ ড্রেসিংরুমের আরেকটি বিস্ফোরক তথ্য সামনে এনেছে। ম্যাচের পর নাকি উসমান ডেম্বেলে সোজাসুজি লকার রুমে গিয়ে এমবাপের কলার চেপে ধরার মতো অবস্থা করেছিলেন!

ডেম্বেলে স্পষ্ট ভাষায় এমবাপেকে আক্রমণ করে বলেন, দলে শুধু গোল করার জন্য বসে থাকলে চলবে না, প্রতিপক্ষের পা থেকে বল কেড়ে নেওয়া এবং ডিফেন্সে সাহায্য করার জন্য তাকে আরও বেশি দৌড়াতে হবে। এমবাপের অলস রক্ষণাত্মক মানসিকতা নিয়ে ফরাসি শিবিরে ক্ষোভ দীর্ঘদিনের, আর এবার পিএসজির প্রাক্তন সতীর্থ ডেম্বেলে সেটা এমবাপের মুখের ওপর বলে দেওয়ায় পরিস্থিতি বেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
নাটকের এখানেই শেষ নয়। ফ্রান্সের ড্রেসিংরুমে যে চরম ঠান্ডা লড়াই চলছে, তার প্রমাণ মিলেছে অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার এনগোলো কন্তের সাথে এমবাপের একটি ভাইরাল ভিডিওতে। আইভরি কোস্টের বিরুদ্ধে ম্যাচের আগে টানেলে যখন কন্তে লাইনে দাঁড়িয়ে প্রতিটি খেলোয়াড়কে হাসিমুখে জড়িয়ে ধরছিলেন, তখন এমবাপে সামনে আসতেই দুজনের কেউ কারও দিকে তাকাননি পর্যন্ত! কোনো হ্যান্ডশেক বা সৌজন্য বিনিময় তো দূর, দুজন দুদিকে মুখ ফিরিয়ে চলে যান।
ভেতরের খবর হলো, এই ইগোর লড়াইয়ের সূত্রপাত গত ২৯ মার্চ, ২০২৬-এ কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচে। সেদিন কন্তের জন্মদিন ছিল এবং প্রথমবারের মতো তিনি ফ্রান্সের অধিনায়কের আর্মব্যান্ড পরে মাঠে নেমেছিলেন। কিন্তু ম্যাচের শেষ ১০ মিনিটে এমবাপে যখন বদলি হিসেবে মাঠে নামেন, তখন কন্তেকে তার হাতের সেই প্রিয় আর্মব্যান্ডটি খুলে এমবাপের হাতে তুলে দিতে বাধ্য করা হয়। জন্মদিনে এমন অপমানে কন্তে যে মনে মনে চটে আছেন, তা এখন স্পষ্ট।

এত সব কাদা ছোড়াছুড়ি আর অশান্তি মাথায় নিয়েই প্যারিসের লে বুর্জে বিমানবন্দর থেকে আট ঘণ্টার ফ্লাইট শেষে বোস্টনে এসে পৌঁছেছে ফ্রান্স দল। প্রস্তুতি ম্যাচে আইভরি কোস্টের কাছে ২-১ গোলে হেরে এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডকে ৩-১ ব্যবধানে হারিয়ে তাদের প্রস্তুতিও খুব একটা নিখুঁত নয়।
১৬ জুন, মঙ্গলবারই সাদিও মানের সেনেগালের বিরুদ্ধে ম্যাচ দিয়ে গ্রুপ 'আই'-তে ফ্রান্স তাদের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করবে। ইরাক ছাড়াও এই গ্রুপে রয়েছে আর্লিং হালান্ডের নরওয়ে, যাকে বিশ্বকাপের সবচেয়ে কঠিন গ্রুপ বা 'গ্রুপ অফ ডেথ' বলা হচ্ছে। এই কঠিন বৈতরণী পার হতে গেলে কোচ দেশমকে অবশ্যই ড্রেসিংরুমের এই আগুন থামাতে হবে এবং এমবাপের সেরা ফর্মটা আদায় করে নিতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যার মন পড়ে আছে মাদ্রিদে, সেই এমবাপে কি পারবেন ফ্রান্সকে এক সুতোয় বাঁধতে? উত্তর দেবে সময়ই!
