মেটলাইফ স্টেডিয়ামের সবুজ ঘাস রাত ১টায় সাক্ষী হতে চলেছে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এক মহাকাব্যিক থ্রিলারের। ইতিহাসের প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে বর্তমান ইউরোপ সেরা স্পেন এবং বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। একদিকে স্পেনের লক্ষ্য ২০১০ সালের পর তাদের দ্বিতীয় বিশ্ব খেতাব ঘরে তোলা, অন্যদিকে মেসি-বাহিনীর চোখ ১৯৬২ সালের পেলের ব্রাজিলের পর প্রথম দল হিসেবে টানা দুবার বিশ্বকাপ উঁচিয়ে ধরে ইতিহাস ওলটপালট করে দেওয়া।

প্রথম ম্যাচে কেপ ভার্দের সাথে হোঁচট খাওয়ার পর লুইস দে লা ফুয়েন্তের স্পেন যেভাবে উরুগুয়ে, সৌদি আরব, অস্ট্রিয়া, পর্তুগাল, বেলজিয়াম এবং সবশেষে ফ্রান্সকে খড়কুটোর মতো উড়িয়ে ফাইনালে এসেছে, তা তাদের টুর্নামেন্টের হট ফেভারিট বানিয়ে দিয়েছে। ফুটবলপ্রেমীদের চোখ ১৯ বছরের লামিন ইয়ামালের জাদুর দিকে থাকলেও, স্পেনের আসল শক্তি লুকিয়ে আছে তাদের রক্ষণভাগে।
পুরো টুর্নামেন্টে তারা গোল খেয়েছে মাত্র ১টি! সেমিফাইনালে ফ্রান্সের তারকাবহুল আক্রমণভাগকে যেভাবে বোতলবন্দি করে ২-০ গোলে হারিয়েছে স্পেন, তা এককথায় অবিশ্বাস্য। মাঝমাঠ থেকে রদ্রি যখন খেলা নিয়ন্ত্রণ করেন, তখন পেড্রো পোরো রাইট-ব্যাক পপিশন থেকে প্রতিপক্ষের বক্সে ত্রাস সৃষ্টি করেন আর সামনে থেকে গোলের খাতা সচল রাখছেন মিকেল ওয়ারজাবাল। রাতে জিতলে ২০২৪ সালের ইউরোর পর ২০২৬-এর বিশ্বকাপ, ফুটবল সাম্রাজ্যের একক অধিপতি হবে স্পেন।

অন্যদিকে, লিওনেল স্কালোনির আর্জেন্টিনা খুব ভালো করেই জানে বড় মঞ্চে কীভাবে প্রতিপক্ষকে পিষে ফেলতে হয়। গ্রুপ পর্বে মেক্সিকো, জাপান, প্যারাগুয়েকে হারানোর পর নকআউটে ব্রাজিল, ইংল্যান্ড এবং কলম্বিয়ার মতো পরাশক্তিদের বিদায় করে ফাইনালে এসেছে আলবিসেলেস্তেরা।
সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৩-২ গোলের জয়টি ছিল তাদের চিরাচরিত লড়াকু মানসিকতার এক ক্লাসিক উদাহরণ। প্রথমার্ধে পিছিয়ে পড়েও ফুটবল জাদুকর লিওনেল মেসির ছোঁয়ায় যেভাবে তারা ম্যাচ ঘুরিয়েছে, তা কেবল তাদের পক্ষেই সম্ভব।

স্পেনের ডিফেন্স যদি সেরা হয়, তবে আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগ এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে বিধ্বংসী। টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ ১৯টি গোল (ম্যাচ প্রতি গড়ে ২.৭টি গোল) করেছে আর্জেন্টিনা, যেখানে মেসি ও হুলিয়ান আলভারেজের জুটি প্রতিপক্ষের ডিফেন্সকে স্রেফ তাসের ঘরের মতো ভেঙে চলেছে। যদিও ডিফেন্সে স্পেনের চেয়ে আর্জেন্টিনাকে কিছুটা দুর্বল লেগেছে, তবে ঠিক সময়ে গোল বের করে প্রতিপক্ষকে গোলবন্যায় ভাসিয়ে দিতে ওস্তাদ এই লাতিন পরাশক্তি।
ফাইনালে নামার আগে স্প্যানিশ শিবিরে কোনো বড় চোটের দুঃসংবাদ নেই। ফ্রান্সের বিপক্ষে হালকা চোট পাওয়া ইয়ামাল এবং পোরো দুজনেই রাতে শুরু থেকেই মাঠে নামছেন। দে লা ফুয়েন্তে তাঁর উইনিং কম্বিনেশন ভাঙছেন না। রদ্রি ও ফাবিয়ান রুইজের মাঝমাঠের সামনে ইয়ামাল, ওলমো ও বানোর আক্রমণাত্মক চতুরঙ্গ চাল থাকবে ওয়ারজাবালকে বল জোগানোর জন্য।

স্পেনের সম্ভাব্য একাদশ: উনাই সিমন; পোরো, কুবার্সি, লাপোর্তে, কুকুরেয়া; রদ্রি, ফাবিয়ান রুইজ; ইয়ামাল, ওলমো, বানো; ওয়ারজাবাল।
আর্জেন্টিনাও পূর্ণ শক্তির স্কোয়াড নিয়ে নিউ জার্সির মাঠে নামছে। ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো এবং লেয়ান্দ্রো পারেদেস ছোটখাটো চোট কাটিয়ে পুরোপুরি ফিট। সেমিফাইনালে বেঞ্চ থেকে এসে ইমপ্যাক্ট তৈরি করা রদ্রিগো ডি পল আজ শুরু থেকেই মাঝমাঠের ইঞ্জিন সামলাবেন। আর গোল করার মূল দায়িত্ব থাকছে মেসি ও আলভারেজের কাঁধে।
আর্জেন্টিনার সম্ভাব্য একাদশ: এমিলিয়ানো মার্টিনেজ; মন্তিয়েল, রোমেরো, লিসান্দ্রো মার্টিনেজ, তাগলিয়াফিকো; ডি পল, পারেদেস, এনজো ফার্নান্দেজ, ম্যাক অ্যালিস্টার; মেসি, আলভারেজ।
পরিসংখ্যান বলছে, আর্জেন্টিনা টুর্নামেন্টের সবকটি (৭টি) ম্যাচ জিতে ফাইনালে এসেছে এবং প্রতি নকআউট ম্যাচে অন্তত দুটি করে গোল করেছে। অন্যদিকে, স্পেনের ওয়ারজাবাল একাই করেছেন ৫ গোল এবং টুর্নামেন্টে সবচেয়ে কম গোল খাওয়ার রেকর্ডও তাদেরই।

আর্জেন্টিনা বারবার প্রমাণ করেছে কেন তারা বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন, তবে গ্রুপ পর্ব থেকে সেমিফাইনাল পর্যন্ত স্পেনকে মনে হয়েছে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে গোছানো ও নিখুঁত দল। তাদের রক্ষণভাগ যেমন ইস্পাত কঠিন, তেমনি ইয়ামাল ও ওলমোদের পা থেকে যেকোনো মুহূর্তে জাদুকরী পাস বের হতে পারে।
মাঠের লড়াইয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ শেষে বলা যায়, ম্যাচটি হবে হাড্ডাহাড্ডি ও চরম শ্বাসরুদ্ধকর। তবে মাঠের দুই প্রান্তেই (আক্রমণ ও রক্ষণ) স্পেনের যে ভারসাম্য রয়েছে, সেটাই হয়তো ফাইনালের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেবে। তবে, মেসি নামে একজন যাদুকর আছেন, যিনি একাই ফাইনালের ভাগ্য বদলে নিতে পারেন। তাই চূড়ান্ত কোন প্রেডিকশন করতে দ্বিধাবোধ করছেন ফুটবল পণ্ডিতরা।
