গেলো মার্চের ১৮ তারিখ থেকে বাংলাদেশে পরীক্ষা বিবেচনায় করোনা শনাক্তের হার ছিলো এক শতাংশ বা তারও নীচে। প্রায় ৮৬ দিন পরে এই শনাক্তের হারটা এখন আবারও দুই শতাংশের ওপরে। চলতি বছরের মার্চের ২৫ তারিখে দৈনিক আক্রান্তের সংখ্যা ছিলো একশরও বেশি।
এরপর আড়াই মাস কোনদিনই আক্রান্তের সংখ্যা একশ অতিক্রম করেনি। তবে গেলো ১২ জুন করোনায় দৈনিক আক্রান্তের সংখ্যাটা ছিলো ১০৯ এবং এরপরের দিন ১৩ জুনেও আক্রান্তের সংখ্যাটা আরো বেড়ে দাঁড়ায় ১২৮ জনে।
আরও পড়ুন: সাড়ে তিন শতাংশ ছাড়ালো করোনা শনাক্তের হার
সপ্তাহের বিবেচনায়ও রোগীর সংখ্যা বেড়েছে আগের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি। জুনের প্রথম সপ্তাহে যেখানে করোনা আক্রান্তের মোট সংখ্যা ছিল দুইশ’র কিছু বেশি সেখানে জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহে বাংলাদেশে করোনা আক্রান্তের সংখ্যাটা ছাড়িয়ে গেছে পাঁচ-শতাধিক।
শতাংশের হিসেবে সপ্তাহান্তে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে ১৪৮ শতাংশ। আর চলতি মাসে আক্রান্ত হিসেবে যাদের পাওয়া গেছে তাদের প্রায় ৭০ ভাগই ঢাকা বিভাগের।

শুধু বাংলাদেশ নয় পাশের দেশ ভারতেও করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে গেলো সপ্তাহ জুড়েই। ভারতে জুনের প্রথম সপ্তাহে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যাটা যেখানে ছিলো ২৬ হাজারের বেশি সেখানে জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহে রোগীর সংখ্যাটা ৫২ হাজারেরও বেশি। সপ্তাহের ব্যবধানে ভারতে করোনার আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে ৯৫ শতাংশ।
করোনাকে সবার আগে নিয়ন্ত্রণে আনা দেশ চীনেও করোনা আক্রান্তের সংখ্যাটা বাড়তির দিকে। যদিও জনসংখ্যার তুলনায় আক্রান্ত শনাক্তের সংখ্যাটা খুবই কম। তারপরও জুনের প্রথম সপ্তাহের চেয়ে দ্বিতীয় সপ্তাহে চীনে করোনার আক্রান্তের সংখ্যাটা দ্বিগুণ হয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার আরেক দেশ মালদ্বীপেও দুই সপ্তাহের ব্যবধানে আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ৬৯ শতাংশ। আর শ্রীলঙ্কায় এই হার বৃদ্ধি পেয়েছে ২৫ শতাংশ।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে করোনার মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে মূলত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে। সৌদি আরব, আরব আমিরাত, কুয়েতসহ মধ্য প্রাচ্যের প্রায় সব দেশেই করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে।
কুয়েতে জুনের প্রথম সপ্তাহে যেখানে প্রায় সাড়ে আটশ আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছিলো , দ্বিতীয় সপ্তাহে সেখানে শনাক্ত হয়েছে দুই হাজারেরও বেশি মানুষ।
আরব আমিরাতেও সপ্তাহের ব্যবধানে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে শতাংশ। লেবাননে এই হার বেড়েছে ৯৪ শতাংশ, কাতারে ৪৪ শতাংশ আর বাহারাইনে বেড়েছে ৫৬ শতাংশ।

মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও করোনার আক্রান্তের সংখ্যাটা বাড়ছে ধীরে ধীরে। যুক্তরাজ্য, জার্মানি, নেদারল্যান্ড, নরওয়েসহ বেশ কিছু দেশে করোনার গ্রাফটা উর্ধ্বমুখী।
যদিও করোনায় সবচেয়ে বেশি ঘায়েল হওয়া দেশ যুক্তরাষ্ট্রে এখনও করোনার গ্রাফটা নিম্নমুখী তবে, ইসরাইলে আবার সপ্তাহের ব্যবধানে দ্বিগুণ হয়েছে রোগীর সংখ্যা।
বিশ্বে করোনার এমন উচ্চমুখীতার কারণ নতুন কোন ভ্যারিয়েন্ট কি না তা এখনো জানা সম্ভব হয়নি। বিশ্বব্যাপী করোনার জিনোম সিকোয়েন্সের তথ্য সংরক্ষণের ওয়েবসাইট জিআইএসএইড এ জমা পরা সবশেষ জিনোম সিকোয়েন্সগুলো মূলত ওমিক্রণ আর ডেল্টা ধরণেরই।
তবে, সাম্প্রতিক সময়ে প্রাপ্ত নমুনার জিনোম সিকোয়েন্সের তথ্য বিশ্লেষণ করতে অন্তত সপ্তাহ দুয়েক সময় প্রয়োজন হবে গবেষকদের। তবে করোনা যে এক সময় মহামারী আকারে না থেকে মৌসুমী অসুখে পরিণত হয়ে পড়বে সে তথ্য আগের অভিজ্ঞতা থেকে জানিয়েছিলেন গবেষকেরা। তাই এবার উর্ধ্বগতি মৌসুমের প্রভাব নাকি নতুন কোন ভ্যারিয়েন্ট তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা এখনও সহনশীল পর্যায়ে আছে। তবে গেলো বছরের ডেল্টা আর চলতি বছরের জানুয়ারিতে ওমিক্রণ সংক্রমণের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তারা বলেন, হঠাৎ করেই করোনা আবারও যেনো ভয়াবহ হয়ে উঠতে না পারে সেজন্য মাস্কের ব্যবহার আবারো জোরদার করতে হবে।
শুধু শহরকেন্দ্রীক সচেতনতা কার্যক্রম নয় বরং প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত মাস্কের ব্যবহার কিংবা শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে হবে।
করোনার টিকা কার্যক্রমে বাংলাদেশের উদ্যোগের প্রশংসা করে বিশেষজ্ঞরা বলেন, অধিকাংশ মানুষই টিকার আওতায় এসেছেন। ফলে মৃত্যু ঝুঁকি অনেকটাই কমানো গেছে।
তারপরও প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে যারা বাকি আছেন তাদেরকেও দ্রুতই টিকার আওতা নিয়ে আসতে পারলে করোনার ভয়াবহতা ঠেকানো সম্ভব বলে মনে করেন তারা।
২০২০ সালের মার্চ মাসে প্রথমবারের মত বাংলাদেশে করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হয়। এরপর দীর্ঘ সময় লকডাউনের ঘেরাটোপে আবদ্ধ ছিলো বাংলাদেশের মানুষ। সে বছর জুন-জুলাই মারাত্মক সংক্রমণে বহু মানুষ মারা যায়। এরপর শীতের সময়টাতে সংক্রমণ কমতে শুরু করে তবে ২০২১ সালের মার্চে আবারও বাড়তে শুরু করে সংক্রমণ।
মার্চ-এপ্রিল মাসে হঠাৎই ঢেউয়ের মত সংক্রমণ বাড়তে থাকে আবার মে মাসে নিম্নমুখী হয় করোনার গ্রাফ। তবে স্বস্তি ছিলো না তখন কারণ পরের মাসেই ডেল্টার ভয়াবহ সংক্রমণে পুরো বিশ্বের সাথে বাংলাদেশও ছিলো বিপর্যস্ত। আগস্টের পরে কমে সেই ঢেউ।
এরমধ্যে করোনার ভ্যাক্সিনেশন কার্যক্রমও এগিয়ে যায় অনেকটা। বিশেষ করে গেলো বছর আগস্ট থেকে বৃহদাকারে টিকা কার্যক্রম চালানো হয়। ফলে চলতি বছর করোনার তৃতীয় ধাক্কা অনেকটাই সামলে নেয়া গেছে। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে ওমিক্রণের সংক্রমণে হঠাৎই বাড়তে থাকে করোনা। সে সময়টাতে দৈনিক আক্রান্তের সংখ্যাটা ১৬ হাজারে গিয়ে ঠেকলেও মৃত্যু ছিলো আগের চেয়ে অনেক কম।
পরে ফেব্রুয়ারি থেকে কমতে শুরু করে সংক্রমণ আর মার্চে শনাক্তের হার নেমে আসে এক শতাংশেরও নীচে। সাম্প্রতিক সময় করোনার কিছুটা উর্ব্ধমুখীতা যেনো অসহনীয় পর্যায়ে না যেতে পারে সেজন্য বার বারই জনসচেতনার ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
একাত্তর/এআর
