প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক সঙ্কটেও জনগণের কষ্ট লাঘবে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে সরকার। তিনি আরও বলেন, দেশের যতটুকু সম্পদ আছে তা দিয়েই জনগণের সেবা করে যাচ্ছে সরকার। সবার সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিতে কাজ করে যাচ্ছি।
সোমবার সকালে সাভারে বাংলাদেশ লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ৭৩তম বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ কোর্সের সমাপণী অনুষ্ঠানে গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রশাসনের নবীন কর্মকর্তাদের প্রতি উদ্দেশ্য প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০৪১ সালের উন্নত বাংলাদেশ গড়ার কারিগর হবেন প্রশাসনের নবীন কর্মকর্তারা। এ লক্ষ্যে সাধারণ মানুষের জীবন মান উন্নয়নে কাজ করার নির্দেশ দেন তিনি।

শেখ হাসিনা বলেন, ২০৪১ সালে থামলে হবে না, আমাদের আরও এগিয়ে যেতে হবে। ২১০০ সালের ডেল্টা প্লান, সেটাও করে দিয়ে যাচ্ছি। উন্নয়নটা যেন সবসময় টেকসই হয়, সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে। দেশের উন্নয়নে যা করেছি তা পৃথিবীতে বিরল, সেটা আর কেউ করেনি।
জাতীয় উন্নয়নের সুফল ভোগ করতে জনগণের কল্যাণে কাজ করার জন্য সরকারি কর্মকর্তাদের আহ্বান জানিয়েছ সরকার প্রধান বলেন, আপনাদেরকে জনগণের সেবক হতে হবে। মানুষের সেবা করাই সবচেয়ে বড় বিষয়। সবাইকে সেই নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, এটা আমাদের দেশ। দেশের সব জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব। সব সময় এটা আপনাদের মনে রাখতে হবে। তৃণমূল পর্যায়ের মানুষ ভালো থাকলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন অনিবার্য হয়ে ওঠে। এটা কেউ আটকাতে পারবে না।
ইতোমধ্যে হত-দরিদ্র ভূমিহীন গৃহহীনদের মাঝে বিনামূল্যে ঘর-বাড়ি করে দেয়ায় তাঁর সরকার পদক্ষেপের উল্লেখ করে সরকার প্রধান বলেন, শেখ মুজিবের বাংলাদেশে সব মানুষ তাঁর মৌলিক চাহিদা পূরণে সক্ষম হবে, সেটাই আমি চাই এবং দেশে কোন ভূমিহীন বা গৃহহীন যেন না থাকে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা যে শুধু গৃহ নির্মাণ করে দিচ্ছি তাই নয়, তাদের জীবন-জীবিকারও ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। কাজেই আমি চাই আপনারা যারা নতুন হিসেবে দায়িত্ব প্রাপ্ত হবেন তারাও এই বিষয়টির প্রতি খেয়াল রাখবেন। দরিদ্র মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে যার পক্ষে যতটুকু সম্ভব সেভাবেই আপনারা কাজ করে যাবেন।
শেখ হাসিনা বলেন, আমি চাই দেশের মানুষ উন্নত জীবন পাবে, সুন্দর জীবনের অধিকারী হোক এবং সে লক্ষ্য বাস্তবায়নেই আমরা কাজ করে যাচ্ছি।
প্রধানমন্ত্রী প্রশাসনের নবীন কর্মকর্তাদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, জনগণের সেবায় নিবেদিত ও দক্ষ এবং পেশাদারি মনোভাব সম্পন্ন জনপ্রশাসন গড়ে তোলাটাই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য। কেননা তিনি চান জনগণ যেন সবকিছুতে সম্পৃক্ত থাকে, সেজন্য মন্ত্রণালয়ের নামটিও তিনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় করে দিয়েছেন বলেও জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের সেবা দেয়াটা আমাদের সকলের সাংবিধানিক কর্তব্য এটা সব সময় মাথায় রাখতে হবে। কাজেই জাতির পিতার সেই আদর্শ ধারণ করেই আপনারা কাজ করবেন।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর সম্পাদিত জাতির পিতার বিরুদ্ধে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার (স্পেশাল ব্রাঞ্চের) রিপোর্ট নিয়ে প্রকাশিত বই ‘সিক্রেট ডকুমেন্টস অব ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ অন ফাদার অব দি নেশন, বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’ এর সিরিজ বইগুলো এবং জাতির পিতার লেখা ‘আমার দেখা নয়া চীন গ্রন্থটিও প্রশাসনের নবীন কর্মকর্তাদের পড়ে দেখার আহবান জানান।
তিনি বলেন, এই সিরিজগুলোতে যদি একটি চোখ বোলানো যায়-তাহলে বাংলাদেশের ইতিহাস জানা যাবে, সংগ্রাম সম্পর্কে জানা যাবে, সর্বোপরি সমগ্র বাংলাদেশ সম্পর্কে জানা যাবে। অন্যদিকে ‘আমার দেখা নয়া চীন’ গ্রন্থ থেকে সেখানকার নারীর ক্ষমতায়ন বা নারীদের অবস্থা বা সমাজের অনগ্রসর লোকদের অবস্থা, কৃষক-শ্রমিকের অবস্থা সম্পর্কে জাতির পিতার অনুধাবন ও মূল্যায়ন সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভ সম্ভব হবে।
প্রধানমন্ত্রী আমাদের রপ্তানি পণ্যের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করতে পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং নতুন বাজার খুঁজে বের করার ওপর গুরুত্বারোপ করার পাশাপাশি যে অঞ্চলে যে পণ্য উৎপাদন হয়, সেখানকার নির্দিষ্ট বিশেষ রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চলে সে ধরনের শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি বলেন, যেখানে সেখানে শিল্প কারখানা করা যাবে না। ১০০ শিল্প অঞ্চল গড়ে তোলা হচ্ছে, কৃষি জমি যেন না কমে যায় সেদিকে দেখতে হবে। অঞ্চলভিত্তিক শিল্পকারখানা গড়তে হবে, যেখানে যে শিল্পের কাঁচামাল বা কৃষিপণ্য উৎপাদিত হয়, সে ধরণের শিল্প কারখানা গড়তে হবে।
তিনি বলেন, এদেশটা আমাদের-কাজেই, এদেশের মানুষের কল্যাণ করাটা সকলের সাংবিধানিক দায়িত্ব। সেই ধারাটা সবসময় মনের মধ্যে থাকতে হবে। মানুষের সেবক হতে হবে। জনগণের সেবক হতে হবে। কেননা, জনগণের সেবা করাটাই সব থেকে বড় কথা। সেভাবেই আপনারা কাজ করে যাবেন।
শেখ হাসিনা বলেন, তৃণমূলের মানুষ যদি ভালো থাকে, দেশের অর্থনীতির অগ্রগতি হবেই। এটা কেউ থামাতে পারবে না। তা চিন্তা করেই আওয়ামী লীগ সরকার দেশের উন্নয়নে নানা ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আজীবন এই অঞ্চলের বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তাঁকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করার পর আবারও সেই বৈষম্য ফিরে আসে। সেখান থেকে জাতিকে মুক্তি দেওয়া আওয়ামী লীগ সরকারের লক্ষ্য। আর সেই লক্ষ্য নিয়েই আওয়ামী লীগ সরকার কাজ করে যাচ্ছে।
যেখানে জাতির পিতা বলে গেছেন, ‘আজকে যতটুকু অর্জন এদেশের কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি মানুষ রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, ঘাম ঝরিয়েই তো তা অর্জন করেছে। সেখান থেকেই তো বেতন ভাতা আমাদের সবকিছু হয়।’ তাদের ভাগ্য আমরা কেন পরিবর্তন করব না- সে প্রশ্নও উত্থাপন করেন তিনি।
তিনি বলেন, করোনার পর ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ এবং একে ঘিরে স্যাংশন ও পাল্টা স্যাংশনে দেশের মানুষের কষ্ট হচ্ছে। কাজেই সেই কষ্ট কতটুকু আমরা লাঘব করতে পারি, আমাদের সকলের সেই প্রচেষ্টাই থাকবে।
সরকার প্রধান বলেন, আজকে উন্নত দেশগুলোও হিমসিম খাচ্ছে, তারপরেও আমাদের যেটুকু সামর্থ্য ও শক্তি আছে-তা দিয়ে আমরা জনগণের সেবা করে যাব। এই কথাটা মনে করেই আপনাদের চলতে হবে।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে জন প্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন কোর্সে বিশেষ কৃতিত্ব অর্জনকারী তিন কৃতী শিক্ষার্থীর হাতে পদক ও সনদ তুলে দেন। শেখ রায়হান আকবর জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রীর নিকট থেকে প্রথম স্থান অধিকার করে রেক্টর’স পদক গ্রহণ করেন। জোবায়দা ফেরদৌস দ্বিতীয় এবং আব্দুল্লাহ আল রাজী তৃতীয় হন।
৬ মাস ব্যাপী এবারের কোর্সে মোট ৪৬১ জন অংশগ্রহণ করেন। যারমধ্যে ১১৯ জন নারী।
অনুষ্ঠানে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব কেএম আলী আজম বক্তৃতা করেন। বিপিএটিসি’র রেক্টর রমেন্দ্র নাথ বিশ্বাস স্বাগত বক্তৃতা করেন। সনদ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে দুজন শিক্ষার্থী আই মোহাম্মদ হাসান এবং ফারজানা ইয়াসমিন নিজস্ব অনুভূতি ব্যক্ত করে অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন।
৭৩তম বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ কোর্সের ওপর অনুষ্ঠানে একটি ভিডিও চিত্রও পরিবেশিত হয়।
একাত্তর/এআর
