সারা পৃথিবীতেই দিনদিন এক নীরব ঘাতকে পরিণত হচ্ছে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বা অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স। তবে ভারতে এটি খুব দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন দেশটির চিকিৎসকরা।
দেশটির মহারাষ্ট্র রাজ্যে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট 'সুপারবাগ সংক্রমণ' সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকরা। সময়ের সাথে সাথে যখন ব্যাকটেরিয়া তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ওষুধকে প্রতিরোধে সক্ষম হয়ে ওঠে তখন তাকে সুপারবাগ বলা হয়।
ল্যানসেট মেডিক্যাল জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ সালে এই রেজিস্ট্যান্সের ফলে পৃথিবীতে প্রায় ১৩ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। সংক্রমণের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক এসব রোগীদের ক্ষেত্রে কাজ করেনি।
অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের দ্বারা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত দেশগুলোর মধ্যে একটি ভারত। সেখানে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট সংক্রমণের কারণে প্রতি বছর প্রায় ৬০ হাজার নবজাতকের মৃত্যু হয়।
এই পরিস্থিতি কীভাবে আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে তা উঠে এসেছে নতুন এক সরকারি প্রতিবেদনে। মহারাষ্ট্রের কস্তুরবা হাসপাতালে চালানো জরিপে দেখা গেছে, পাঁচটি প্রধান ব্যাকটেরিয়াল প্যাথোজেনকে মোকাবেলায় যেসব অ্যান্টিবায়োটিকের সবচেয়ে বেশি কার্যকর হওয়ার কথা ছিল, সেগুলো খুব কমই কাজ করছে।
এসব প্যাথোজেনের মধ্যে রয়েছে কলেরা সংক্রামক ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়া, নিউমোনিয়ার ব্যাকটেরিয়া এবং শ্বাসনালী ও ত্বকের সংক্রামক রোগ ছড়ানো স্ট্যাফাইলোকক্কাস ব্যাকটেরিয়া।
এসব প্যাথোজেনের বিরুদ্ধে প্রধান যেসব অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়, সেগুলো এসব রোগ নিরাময়ে ১৫ শতাংশেরও কম কার্যকর বলে চিকিৎসকরা প্রমাণ পেয়েছেন।
তবে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হলো একাধিক ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম অ্যাসিনেটোব্যাক্টার বাউমানি, যেটি সিসিইউতে লাইফ সাপোর্টে থাকা ফুসফুসের সমস্যার রোগীদের আক্রমণ করে।
ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিক্যাল রিসার্চের (আইসিএমআর) এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কার্বাপেনেম নামের একদল অতি শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে রেজিস্ট্যান্স এক বছরে ১০ শতাংশ বেড়ে গেছে। ৩০টি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল থেকে সংগ্রহ করা তথ্যে এর প্রমাণ পাওয়া গেছে।
আইসিএমআর-এর বিজ্ঞানী ডা. কামিনী ওয়ালিয়া বলেন, এটি ভয়ঙ্কর কেননা প্রাণঘাতী সেপসিস ও আইসিইউতে থাকা রোগীদের চিকিৎসায় এই অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়।
কলকাতার এএমআরআই হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা বিশেষজ্ঞ শাশ্বতী সিনহা জানান, আইসিইউতে থাকা ৬০ শতাংশ রোগীই অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট সংক্রমণে আক্রান্ত হন। পরিস্থিতি এত ভয়ানক যে কিছু রোগীর চিকিৎসার আর কোনো পথই খোলা থাকে না।
কস্তুরবা হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানান, নিউমোনিয়া ও মূত্রনালির সংক্রমণ নিয়ে গ্রামাঞ্চল থেকে আসা রোগীদের চিকিৎসায়ও অ্যান্টিবায়োটিক আর কাজ করছে না। যেহেতু তাদের বেশিরভাগই প্রেসক্রিপশন ছাড়াই আসেন ও ওষুধের নামও বলতে পারেন না, তাদের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ইতিহাস জানাও দুষ্কর হয়ে পড়ে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের অনেক চিকিৎসক বিনা বিচারে অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ সেবনের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। ফ্লু, সাধারণ সর্দিজ্বর, ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া ও এমনকি ডায়রিয়ার চিকিৎসায়ও অ্যান্টিবায়োটিক দেয়া হয়, যেখানে এর কোনো কার্যকারিতাই আসলে নেই।
বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারির সময়ে রোগীদের চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়, যা আরও খারাপ প্রভাব ফেলে। গত বছর আইসিএমআর-এর এক জরিপে দেখা যায়, করোনায় আক্রান্তদের মধ্যে যারা অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের ফলে সংক্রমিত হন, তাদের অর্ধেকই মৃত্যুবরণ করেন।
আরও পড়ুন: ভেনেজুয়েলায় ভারী বৃষ্টি ও বন্যায় ২৫ জন নিহত
তবে এর জন্য শুধু চিকিৎসকদের দোষ দিলেও হবে না। জনসংখ্যার বিশাল একটা অংশ অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স ও এর প্রভাব সম্পর্কে সচেতন নন। এমনকি সচ্ছল ও শিক্ষিত শ্রেণির লোকও অসুস্থ হলেই চিকিৎসকদের অ্যান্টিবায়োটিকের প্রেসক্রিপশন দিতে চাপ দেন।
ভারতের বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স রোধে চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দেয়ার পাশাপাশি ডায়াগনস্টিক সেন্টার স্থাপন ও হাসপাতালে সংক্রমণের হার কমানো জরুরি। নাহলে ভবিষ্যতে এই সমস্যা মহামারির রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তারা।
একাত্তর/এসজে
