রাশিয়া বনাম ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বিশ্বের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মেরুকরণ করে নতুন আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে ‘ব্রিকস’। পাঁচ দেশের এই জোট এখন আকারে বড় হচ্ছে। যোগ দিতে আগ্রহ জানিয়েছে বাংলাদেশও। এবার সেই কথা সরাসরি শোনা গেলো সরকার প্রধানের কন্ঠেও।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন এবং দক্ষিণ আফ্রিকার সমন্বয়ে গঠিত ব্রিকস জোটের অংশ হতে চায় বাংলাদেশ। বুধবার বিকেলে, গণভবনে সুইজারল্যান্ড ও কাতারে তার সাম্প্রতিক সফরের বিষয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি একথা জানান।
ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন- বিশ্বের দ্রুত বেড়ে চলা অর্থনীতির চার দেশ। তাদের নামের প্রথম অক্ষর নিয়ে ২০০১ সালে ‘ব্রিক’ শব্দটি ব্যবহার করেন আমেরিকার আর্থিক প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাক্সের সে সময়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ জিম ও’নিল। ধারণাটিকে গুরুত্বের সঙ্গে নেয় চার দেশ।

এরপর ২০০৬ সালে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সম্মেলন চলাকালীন পুটিনের উদ্যোগে চার দেশের মন্ত্রীরা জোটে র কার্যক্রম নির্ধারণে আলোচনায় বসেন। ২০০৯ সালে রাশিয়াতে বসে ব্রিকের প্রধম সম্মেলন। পরের বছর এই জোট যোগ দেয়ার ঘোষণা দেয় দক্ষিণ আফ্রিক।
এর মধ্য দিয়ে ব্রিক পরিণত হয় ব্রিকস-এ। ব্রিকের তৃতীয় আর পাঁচ দেশের অংশগ্রহনে প্রথম সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয় ২০১১ সালে চীনের বেইজিংয়ে। তার আগে ২০১০ সালে দ্বিতীয় সম্মেলনটি বসেছিলো ব্রাজিলের রাজধানী ব্রাসিলিয়াতে।
ব্রিকস বর্তমানে বিশ্বে অর্থনৈতিকভাবে অন্যতম বৃহৎ শক্তি শালী জোট। কিছু পরিসংখ্যানে সেই চিত্র পাওয়া যায়। জাতিসংঘের বিনিয়োগ বিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাডের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই পাঁচ দেশের সম্মিলিত জনসংখ্যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৪২ শতাংশ।
বিশ্বের অর্থনৈতিক জিডিপির ৩১ শতাং বা এক তৃতীয়াংশের নিয়ন্ত্রক তারা। বিশ্ব বাণিজ্যেরও ১৬ শতাংশ পাঁচটি দেশের দখলে। বিশ্ব অর্থনীতিতে ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠা এই পাঁচ দেশ মিলে ২০১৪ সালে গঠন করে ‘নিউ ডেভলপমেন্ট ব্যাংক’। চীনের সাংহাইতে এর প্রধান কার্যালয়।
সেই সঙ্গে পাঁচ দেশের বাইরেও উম্মুক্ত রাখা হয় জোটে অংশগ্রহনের সুযোগ। ব্যাংক ওয়েবসাইটে দেয়া তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ দেশের বাইরে ২০২১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ প্রথম ব্যাংকটির সদস্য হয়। একই বছরের চার অক্টোবর সদস্য হয় সংযুক্ত আরব আমিরাত।
সংবাদ সম্মেলনে এই বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত সপ্তাহে জেনেভায় দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসার সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তার সঙ্গে বৈঠকে তিনি ব্রিকস জোটে বাংলাদেশের যোগ দেওয়ার আগ্রহের কথা জানান।
সিরিল রামাফোসা তখন বলেন, অগাস্টে জোহানেসবার্গে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে জোটের সদস্য সংখ্যা বাড়ানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একজন সাংবাদিক জানতে চান, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের বাস্তবতায় যে অর্থনৈতিক সঙ্কট তৈরি হয়েছে, সেই সময়ে ব্রিকসে যোগ দিলে কোনো সুবিধা বাংলাদেশের হবে কি না।
উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ব্রিকসে আমরা যোগ দেব এই কারণে, ব্রিকস প্রথম যখন এটার প্রস্তুতি নেয়, তখন থেকেই আমরা এর সঙ্গে ছিলাম এবং আছি। কিন্তু আমরা ফাউন্ডার মেম্বার হতে পারিনি। এখন আমরা চেয়েছি সেটার মেম্বার হতে।
তিনি বলেন, আমরা চাচ্ছি যে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কোনো একটার ওপর যেন নির্ভরশীলতা না হয়। কাজেই অন্যান্য দেশের সঙ্গেও যেন আমাদের অর্থ বিনিময়ের সুযোগটা থাকে। আমাদের প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো যেন আমরা সহজে ক্রয় করতে পারি, আমার দেশের মানুষের কষ্ট লাঘব করতে পারি। সেই সব বিষয় বিবেচনায় করেই কিন্তু আমরা ব্রিকসে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

আন্তর্জাতিক কোনো মুদ্রা চালু করার পরিকল্পনা বাংলাদেশের আছে কি না- এমন এক প্রশ্নের জবাবে মুচকি হেসে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আদার ব্যাপারি জাহাজের খবর নিতে বলছেন।
পরে তিনি বলেন, এখানে আমরা দেখব যে বিকল্প কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা অর্থ ব্যবহারের ব্যবস্থা কেউ যদি নেয়, আমরা তার সঙ্গে আছি। ইতোমধ্যে আমরা কয়েকটি দেশের সঙ্গে আলোচনা করছি, আমরা যেন আমাদের নিজস্ব অর্থের বিনিময়ে ক্রয়-বিক্রয় করতে পারি, সেই পদক্ষেপটাও কিন্তু আমরা ইতোমধ্যে নিয়েছি।
সরকার প্রধান বলেন, শুধু ডলারের ওপর নির্ভরশীল না, আমরা নিজেরা নিজেদের অর্থে বিভিন্ন দেশের সেঙ্গ যেন বিনিময় করতে পারি, কেনাবেচা যাতে যা লাগে করতে পারি, সেই পদক্ষেপও নেওয়া আছে। যখন এটা কার্যকর হয় তখন আপনারা এটা দেখতে পাবেন।
একাত্তর/এআর
