দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভরাডুবির জেরে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের ও মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নুকে তুলোধুনো করেছেন দলটির পরাজিত প্রার্থীরা।
নির্বাচনে ভরাডুবির জন্য জাপা চেয়ারম্যান, মহাসচিব ও চেয়ারম্যানের স্ত্রীকে দায়ী করেন জাপা নেতারা। জিএম কাদের ও চুন্নুকে ‘বাটপার, প্রতারক’ বলেও গালাগাল করেছেন পরাজিত প্রার্থীরা।
দলটির বিক্ষুব্ধ নেতাদের দাবি, নির্বাচন উপলক্ষ্যে সরকার জাতীয় পার্টিকে অনেক টাকা দিয়েছে। বেশি আসনে ছাড় দিতেও রাজি ছিলো। কিন্তু নিজেদের ব্যর্থতার কারণে জাতীয় পার্টি সেটা আদায় করতে পারেনি। এর জন্য দলের মহাসচিব চুন্নু বেশি দায়ী বলে মনে করেন তারা।
রোববার রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে নির্বাচনে অংশ নেওয়া জাতীয় পার্টির প্রার্থীদের এক মতবিনিময় সভা হয়। সেখানে বক্তারা দলের নানা ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়ে সমালোচনা করেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন দলের কো-চেয়ারম্যান ও ঢাকা-৪ থেকে নির্বাচনে অংশ নেওয়া সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা।
উপস্থিত ছিলেন দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য সাইফুদ্দিন আহমেদ মিলন, প্রেসিডিয়াম সদস্য লিয়াকত হোসেন খোকা, প্রেসিডিয়াম সদস্য ও মহানগর উত্তরের সভাপতি শফিকুল ইসলাম সেন্টু, সাবেক সংসদ সদস্য ইয়াহহিয়া চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম পাঠান, আমানত হোসেন খান, যুগ্ম মহাসচিব আমির উদ্দিন আহমেদ ডালু, ফখরুল আহসান শাহজাদা, আব্দুল হামিদ খান ভাসানি, হাসান ইফতেখার, মিজানুর রহমান মিরু, সাহিন আরা চৌধুরী রিমা, সুজন দে, শাহনাজ পারভিনসহ অন্যরা।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২২২ আসনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে টানা চতুর্থবারের মতো সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ।
স্বতন্ত্র প্রার্থীরা পেয়েছে ৬২ আসন, আর সাবেক সেনাশাসক এইচএম এরশাদের গড়া দল জাতীয় পার্টি গতবারের তুলনায় অর্ধেক অর্থাৎ ১১ আসন পেয়েছে। ভোটের আগেই চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের সঙ্গে দ্বন্দ্বের কারণে নির্বাচনে অংশ নেননি রওশন এরশাদ ও তার ছেলে সাদ এরশাদ।
সংসদে বিরোধীদল কারা হচ্ছে তা নিয়ে নানা গুঞ্জনের মধ্যে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার পর বলেছেন, তারা বিরোধীদলে ছিলেন, এবারও বিরোধীদলে থাকতে চান।
দলের মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নুও বলেছেন, তারাই একমাত্র কার্যকর বিরোধী দল।
আওয়ামী লীগের সঙ্গে আসন ভাগাভাগি করে নির্বাচন করলেও গত দুই সংসদে বিরোধীদলের ভূমিকায় আছে জাতীয় পার্টি। দলের চেয়ারম্যান জিএম কাদের ছিলেন একাদশ সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা।
গত বুধবার বনানীতে দলীয় চেয়ারম্যানের কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করে নেতা-কর্মীরা। সেখান থেকে দলের চেয়ারম্যান ও মহাসচিবকে পদত্যাগ করার আল্টিমেটাম দেওয়া হয়।
এদিকে শুক্রবার দলীয় পদ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয় সাবেক মন্ত্রী কাজী ফিরোজ রশীদ ও এইচএম এরশাদের সাবেক প্রেস সচিব সুনীল শুভ রায়কে।
রোববারের মতবিনিময় সভায় জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য শফিকুল ইসলাম সেন্টু বলেন, ভোটের আগে ২৩ জন প্রার্থী আমার সঙ্গে দেখা করতে আসেন। তাদের আক্ষেপ, ক্ষোভ বা দুঃখ যে, আমরা নমিনেশন পেপার সাবমিট করে নির্বাচনী প্রচারের কাজে ব্যস্ত। ঢাকায় আসলাম মহাসচিব, চেয়ারম্যান হয়তো আমাদের কিছু দেবেন। এ কারণে আমরা ঢাকায় এসেছি। আমি তাদের বক্তব্য শুনেছি। ঢাকায় আমাকে ছাড়া তারা আর কাউকে পাননি। প্রার্থীরা বলেছেন, আমরা নির্বাচন থেকে সরে আসছি। আমাদের যা ছিলো খরচ করেছি। আমাদের যদি কিছু সহযোগিতা না করেন, তাহলে আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।
জাপা মহাসচিব টাকা দেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন জানিয়ে সেন্টু বলেন, আমি তাকে বললাম যাই পান কিছু কিছু দেন। মহাসচিব বললেন, টাকা পেয়েছি, কিন্তু অল্প। উনি কী করলেন, চেয়ারম্যানের স্ত্রীর কাছে একটা অ্যামাউন্ট দিয়ে চলে গেলেন নির্বাচনী এলাকায়। কোনো প্রার্থীকে তিনি কিছু বলেননি। মহাসচিব বললেন, সেন্টু এটা শেরীফা কাদের দেখবেন।
তিনি বলেন, আপনারা সমঝোতা করলেন। সরকার ২৬টা সিট তুলে দিয়েছে। সরকার কোনো কৃপণতা করেনি আমার জানা মতে। সরকার সব কিছু আপনাদের ভরপুর দিয়েছে, কোনো কিছু বাকি রাখেনি। অর্থ দিয়েছে, সিটও দিয়েছে। সিট আপনারা ২৬টা আনছেন, এটা আপনাদের ব্যর্থতা। সরকারের কোনো ব্যর্থতা নেই। সরকার আপনাদের ভরপুর দিয়েছে। আমরা জানি, বাবলা ভাই জানে, খোকা সাহেব জানে।
সেন্টু দাবি করেন, যখনই শেরীফা কাদেরের সিটটা কনফার্ম হয়নি, জিএম কাদের বললেন আমি ভোটে যাবো না। যেই তার স্ত্রীর (শেরীফা কাদের) সিটটা দিয়ে দিয়েছে, সে (জিএম কাদের) দৌড়ায়ে চলে গেছে।
জিএম কাদেরকে উদ্দেশ করে সাবেক সংসদ সদস্য ও সিলেটের প্রার্থী ইয়াহহিয়া চৌধুরী বলেন, আপনি গণতন্ত্র শিখিয়েছেন, আপনার মধ্যে গণতন্ত্র নেই। আপনি স্ত্রীর জন্য ফিরোজ, বাবলা, খোকা, পীর ফজলু, আতিক, ভাসানিসহ নয়টি সিট কোরবানি দিয়েছেন। সমাঝোতার আসনের জন্য চেয়ারম্যান নিজের স্ত্রী, নাতি আর মেয়ের ভাসুরের জন্য দৌড়াদৌড়ি করেছেন।
সিরাজগঞ্জের মুখতার হোসেন বলেন, রক্তমাংস, দোকানপাট বিক্রি করে নির্বাচন করেছি। স্বতন্ত্র ও নৌকার লোকদের হামলার মুখে জীবন যায়, কিন্তু দলের কোনো সহযোগিতা পাইলাম না। একটু দেখা পর্যন্ত দিলেন না। তারা আমাদের বরাদ্দকৃত টাকা নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছেন
রাজনীতিবিদ ক্ষমতায় না থাকলে দেশের উন্নতি হয় না: প্রধানমন্ত্রী