রাজধানীতে আয়ান ও আয়হামের মৃত্যুর পর শিশুদের খতনা করানো নিয়ে আতঙ্কে পড়েছেন অভিভাবকরা। ইসলামি সংস্কৃতির অন্যতম প্রতিষ্ঠিত এই অনুশাসন তাদের ছেলে শিশুর জন্য পালন করা নিয়ে রীতিমতো ভয়ে আছেন। খতনা করার সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে দশবার ভাবতে হচ্ছে অভিভাবকদের।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, খৎনার জন্য সনাতনী পদ্ধতির বদলে আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখার বিকল্প নেই। তবে জানতে হবে সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল, ডাক্তার ও তার নেওয়া ব্যবস্থা সম্পর্কে। যেখানে খতনা করানো হবে, সেই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থা ও চিকিৎসকদের সম্পর্কে জেনে নিতে হবে আগেই।
ইসলামে ছেলে শিশুদের খতনা একটি অত্যাবশ্যকীয় ধর্মীয় অনুশাসন হিসাবে বিবেচিত হয়ে আসছে। ধর্মীয় কারণে মুসলমানদের পাশাপাশি ইহুদিরাও খতনা রীতি পালন করে থাকে। এছাড়া ধর্মীয় কারণ ছাড়াও চিকিৎসাগত কারণে অন্য সম্প্রদায়ের মানুষও ছেলে শিশুদের খতনা করে থাকে।
আর খতনা করাতে গিয়ে রাজধানীতে অল্প কয়েক দিনের ব্যবধানে শিশু আয়ানের পর অকালে প্রাণ হারালো ফুলের মতো আরেক শিশু আয়হাম। পর পর দুই শিশুর বেলাতেই একই ঘটনা। ডাক্তারের এনেসথেশিয়া এবং মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া। এনিয়ে সামাজিক মাধ্যমে এখনও আলোচনার ঝড় চলছে।

খতনা করাতে গিয়ে ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে আহনাফ তাহমিদ নামে দশ বছরের একটি শিশু মারা যায়। ঢাকার মালিবাগ চৌধুরীপাড়ায় অবস্থিত জে এস ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড মেডিকেল চেকআপ সেন্টারে এই ঘটনা ঘটে। শিশুটির পরিবারের অভিযোগ, অনুমতি না নিয়েই ‘ফুল অ্যানেসথেসিয়া’ দেওয়ায় তার মৃত্যু হয়েছে।
দেড় মাস আগে খতনা করাতে গিয়ে রাজধানীতেই আয়ান আহমেদ নামে আরও একটি শিশুর মৃত্যু হয়েছিল এবং তার পরিবারও একই অভিযোগ করেছিল। শিশুটির পরিবারের অভিযোগ, অনুমতি না নিয়েই পুরো শরীর অজ্ঞান করতে ‘ফুল অ্যানেসথেসিয়াদেওয়ায় তার মৃত্যু হয়েছে।
বাংলাদেশে কোনও ধরনের অ্যানেসথেসিয়া দেয়া ছাড়াই যুগ যুগ ধরে হাজামরা (যিনি খতনা করান) এ কাজ করে আসছেন। তবে গত কয়েক দশকে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দিয়ে সার্জারির মাধ্যমে খতনা করানোর চল বেশ বেড়েছে। কিন্তু খতনা করাতে গিয়ে অ্যানেসথেসিয়া দেয়া নিয়েই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে দুই মৃত্যুতে।
প্রশ্ন উঠেছে, খৎনার জন্য শিশুকে পুরোপুরি অজ্ঞান করতে হবে নাকি অর্ধেক নাকি শুধু অপারেশনের জায়গাটুকু অবশ করাই যথেষ্ট? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লিখিত কোন গাইডলাইন নেই। তবে শিশুদের যে কোনো অপারেশনের বেলায় পুরোপুরি অজ্ঞান করাই নিয়ম।

কিন্তু কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষার ওপর নির্ভর করবে কীভাবে বা কতটুকু অজ্ঞান করা হবে। শিশুর বয়স ও ওজনের ওপর নির্ভর করবে অজ্ঞান করার ওষুধের পরিমাণ। শিশুর যাতে বমি না হয় সেজন্য পেট থাকতে হবে খালি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো- একজন অভিজ্ঞ এনেস্থেসিওলজিস্ট থাকতে হবে সার্বক্ষণিক।
ছোট-বড় যা-ই হোক, যে কোনও অ্যানেসথেসিয়া দেওয়ার আগে রক্ত, হৃদস্পন্দনের হার-সহ বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য জানতে রোগীর বেশ কিছু স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে। মূলত রোগীর শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে একটা ধারণা পেতে এসব পরীক্ষা করা হয়।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নিওনেটাল সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ডা. আব্দুল হানিফ টাবলু বলেন, কোনও ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই শরীরে অ্যানেসথেসিয়া প্রয়োগ করা হলে রোগীর জীবন সংকটাপন্ন, এমন কি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
অভিযোগ উঠেছে শিশু আয়হামকে অজ্ঞান করার কাজটি করেছিলেন সার্জন নিজেই। ছিলেন না কোন অভিজ্ঞ এনেস্থেসিওলজস্ট। অধ্যাপক টাবলু বলেন, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে চিকিৎসকের যদি কোন অপরাধ পাওয়া যায়, তাহলে তার বিচার হতে হবে অবশ্যই।
যাদের জ্বর, ঠান্ডা, সর্দি-কাঁশি, শ্বাসকষ্ট, বক্ষব্যাধি বা হৃদযন্ত্রে ত্রুটি আছে, তাদের সে অবস্থায় অ্যানেসথেসিয়া না দেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন এই চিকিৎসক। সেই সঙ্গে হাসপাতাল-ক্লিনিকের লাইসেন্স পরীক্ষাই শুধু নয়। মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিতের জন্য তদারকির বিকল্প নেই বলেও মনে করেন এই চিকিৎসক।
খতনায় শিশুর মৃত্যু: দুই চিকিৎসক গ্রেপ্তার, ক্লিনিক সিলগালা
শিশু মৃত্যুতে দোষীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী