বেগুন, শসা ও কাঁচা মরিচের বাজারে রীতিমতো অরাজকতা চলছে। রাজধানীর সব বাজারে ঘণ্টায় ঘণ্টায় বাড়ছে এই পণ্যগুলোর দাম। সকালে যে শসা বিক্রি হয়েছে ৫০ টাকায় বিকেলে সেটির দাম ছুঁয়েছে একশ’ টাকা। বেগুনের বাজারেও দামের পার্থক্যটা ত্রিশ থেকে পঞ্চাশ টাকা। একেক বাজারে আবার একেক দামে বিক্রি হচ্ছে এসব পণ্য।
কারওয়ান বাজারের তুলনায় হাতিরপুল বাজারে প্রতিটি পণ্যের দামে ব্যবধান অন্তত ত্রিশ টাকা। এমন পরিস্থিতিতে অসহায় ক্রেতারা।
পেঁয়াজু, বেগুনি আর মুড়ির ভর্তা, ইফতারের আয়োজনে যাই থাকুক না কেনো বেড়েছে বেগুন, পেঁয়াজ, শসা, মরিচ ও ধনেপাতার চাহিদা। আর তাই নানান অজুহাতে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দামও।
মোহাম্মদপুরের টাউনহল বাজারে বেগুন, শসার দাম জানতে চাইলে দোকানি জানালেন সোমবারের তুলনায় বেড়েছে দাম। অজুহাত, সরবরাহ কম। কিন্তু চাহিদা বেশি। সে কারণে দামও বেড়েছে।
বাজারে যখন এমন অরাজকতা তখন কেনাকাটা কমিয়ে দিয়েছেন ক্রেতারা। বেশ কয়েকজন ক্রেতা প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, তারা তুলনার চেয়ে কম কিনছেন মরিচ-বেগুন-শসার মতো পণ্য।

রাজধানীর হাতিরপুলের কাঁচাবাজারের কারওয়ান বাজারের খুব কাছে হলেও দামের পার্থক্য বিশাল। আধা কিলোর কম দূরত্বে ব্যবধান ৩০ থেকে ৪০ টাকার।
ক্রেতাদের দাবি, এ রীতিমতো অন্যায়। সুযোগ নিয়ে দাম বাড়াচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ীরা।
কারওয়ানবাজারের পাইকার ও খুচরা বাজার ঘুরে দেখা যায় ভিন্নচিত্র। বেগুনের দাম এখানে অন্যসব বাজারের তুলনায় ২০ থেকে ২৫ টাকা কম হলেও, ঘণ্টায় ঘণ্টায় বাড়ছে ব্যবধান। একইদিন সকাল ও বিকেলে দামের পার্থক্য দেখা যায় অন্তত ত্রিশ টাকা। ফলাফল ক্রেতা ও বিক্রেতার বিতণ্ডার ঘটনাও ঘটছে।
একই পণ্য ঘণ্টায় ঘণ্টায় দাম পাল্টে যাওয়া কিংবা এক বাজার থেকে আরেক বাজারে যেতেই অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়া; বাজারের অরাজক পরিস্থিতিকেই তুলে ধরে। যে রমজান হতে পারতো সংযমের; সেই রমজান যেনো হয়ে উঠেছে কিছু মানুষের অনৈতিক বাণিজ্যের অন্যতম উপলক্ষ।
নিয়ন্ত্রণহীন ফলের বাজার, ‘প্রতি মিনিটে’ দাম বাড়ছে
রোজার আগের দিন নিয়ন্ত্রণহীন খেজুরসহ বিদেশি ফলের বাজার। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আমদানিতে চড়া শুল্ক এবং ডলার সঙ্কটে এলসি জটিলতার কথা। তাদের দাবি, খেজুরসহ অন্যান্য ফলকে বিলাসী তালিকায় ফেলে উচ্চ শুল্ক আরোপ করায় এর দাম বেড়ে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে।
খুচরা ব্যবসায়ীদের অভিযোগ প্রতি মিনিটে বাড়ছে ফলের দাম।
সরবরাহে ঘাটতি নেই। তাই টাকা দিলেই মিলছে আমদানি করা হরেক জাতের খেজুর। তবে দাম গেলো বছরের প্রায় দুই থেকে তিন গুণ। তাই রোজায় ইফতারে অন্যতম এই উপকরণে যেনো হাত দেয়ার উপায় নেই, বিক্রেতারা বলছেন চড়া শুল্ক দাম বাড়িয়েছে। ফলে এবার কমেছে ক্রেতা।
এক পাইকারি বিক্রেতা জানান, আমরা গত বছর ২৫ টনের শুল্ক দিতাম তিন লাখ ৬০ হাজার টাকা। এখন দিচ্ছি সাড়ে ৫২ লাখ টাকা।
মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি হয়, মাবরুম, কালমি, আজোয়া, জিহাদি, দাবাজ, মরিয়ম এবং বস্তাসহ প্রায় ২০ জাতের খেজুর। গত বছর খুবই ভালো জাতের খেজুরের কেজি ছিলো ১৩০০ টাকা। এবার থেকে ১৭০০ টাকা। বস্তায় সাধারণ মানের খেজুরই পাইকারি বিক্রি হচ্ছে আড়াইশো টাকা কেজিতে।
পাঁচ বছরে খেজুরের দাম বেড়েছে সাতগুণ
পবিত্র রমজানে ইফতারের অন্যতম অনুষঙ্গ খেজুর। কিন্তু পাঁচ বছরে খেজুরের দাম বেড়েছে প্রায় সাতগুণ। পাঁচ বছর আগেও যেসব খেজুরের দাম ছিল প্রতি কেজি ১০০ থেকে ১৫০ টাকা, সেসব খেজুরের কেজি এখন ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ পাঁচ বছরের ব্যবধানে এসব খেজুরের দাম কেজিপ্রতি সাত থেকে আটগুণ পর্যন্ত বেড়েছে।
বাজারে সবচেয়ে কম দামের খেজুর ‘জাহেদি’ জাতের। এই খেজুর প্রতি কেজি ৩০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে, যা গত বছর ছিল ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা। অর্থাৎ এই জাতের খেজুরের দাম বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। পাঁচ বছর আগে ‘জাহেদি’ খেজুর বিক্রি হতো ৫০ থেকে ৫৫ টাকা কেজি দরে।
গত রমজানের তুলনায় এবার পেঁয়াজের দাম বেড়েছে ২২৩ শতাংশ
সম্প্রতি সময়ে বাজার ঘুরে দেখা যায় পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১১০ টাকা কেজিতে, যা গত বছর ছিল ৩০-৩৫ টাকা। শতাংশের হিসেবে এক বছরে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে ২২৩ শতাংশ।
শুধু পেঁয়াজ নয় ছোলা, সয়াবিন তেল, চিনি, খেজুরসহ অন্যান্য ফল, ডাল, মুড়ি, আলু, বেগুন, ইসবগুল, কাঁচা মরিচ, ধনেপাতা, লেবু, পুদিনা পাতা, সস এবং জুস আরও যেসব পণ্য আছে তার সবকিছুরই দাম বেড়েছে।
দুই দিনের ব্যবধানে বেড়েছে মুরগির দাম
দুই দিনের ব্যবধানে বেড়েছে ব্রয়লার মুরগির দাম। ক’দিন আগেও ২০০ টাকায় বিক্রি হওয়ার মুরগি খুচরা পর্যায়ে বিক্রি হচ্ছে ২৩০ থেকে ২৪০ টাকায়।
রোজা সামনে রেখে সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণের কথা বললেও এভাবে দাম বাড়ায় ক্ষুব্ধ ক্রেতারা। তারা দ্রুত সংশ্লিষ্টদের এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
সোমবার রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মহাখালী, রামপুরা বাজার, মোহাম্মদপুর শিয়া মসজিদ কাঁচা বাজারসহ কয়েকটি বাজারে ঘুরে দেখা যায় সোনালী মুরগী ৩৩০ থেকে ৩৪০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

দেশি মুরগির দাম বেড়েছে কেজিতে ৫০ টাকা। বিক্রি হচ্ছে ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকায়। এছাড়া গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকায়।
‘পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ আছে, দাম বাড়ার সুযোগ নেই’
রোজায় পণ্য সরবরাহে ঘাটতি নেই। তাই দাম বেড়ে যাওয়ারও সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুস শহীদ। সোমবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা জানান।
এসময় কৃষিমন্ত্রী বলেন, মজুতদার ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে। কোনোভাবেই তাদের ছাড় দেওয়া হবে না। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাণিজ্য, কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়কে একসঙ্গে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেই দায়িত্ব পালন করতে আমরা বদ্ধপরিকর।
খেজুর নিয়ে বক্তব্যের যে ব্যাখ্যা দিলেন শিল্পমন্ত্রী
নিয়ন্ত্রণহীন ফলের বাজার, ‘প্রতি মিনিটে’ দাম বাড়ছে
‘আগুন’ ছড়িয়েছে মাংসের বাজারে
‘পাঁচ টাকার লেবু ১৫ টাকা হয় কীভাবে?’
‘রোজায় দাম বাড়িয়ে সৌদিতে চলে যায় ব্যবসায়ীরা’