পৃথিবীতে এমন কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠান কি পাওয়া যাবে যেখানে প্রধান নির্বাহীর মতো শীর্ষ পদে চাকরির জন্য কোনো অভিজ্ঞতার দরকার নেই? বাংলাদেশে এমন একটি প্রতিষ্ঠান আছে যেখানে গেলো পাঁচ বছরে পাঁচ জন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এসেছেন, যাদের সংশ্লিষ্ট বিষয়টিতে কোনো অভিজ্ঞতাই ছিলো না। আবার যখনই তারা একটু একটু করে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করছিলেন, তখনই বদলি। এই প্রতিষ্ঠানটির নাম বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে এখন ২১টি উড়োজাহাজ রয়েছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরই বিমানকে গতিশীল করতে একে একে ১০টি নতুন বোয়িং কেনা হয়। বর্তমানে বিমানের সম্পদ প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। ২০১৯ সালে বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও পদের জন্য বিজ্ঞাপ্তি দেয়া হয়েছিল। যেখানে বলা হয়েছিল যেকোনো এয়ারলাইন্সের পরিচালক বা ব্যবস্থাপনা কাজের ১০ বছরসহ এয়ারলাইন্সে কমপক্ষে ২০ বছরের কাজের অভিজ্ঞতা থাকবে হবে। কিন্তু সেই বিজ্ঞপ্তি আর বাস্তবায়ন করা হয়নি।

হাজার হাজার কোটি টাকার এই এভিয়েশন শিল্পে গত পাঁচ বছর ধরে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে যারা নিয়োগ পাচ্ছেন তাদের সবারই এভিয়েশন ব্যবসায় অভিজ্ঞতা ছিল শূন্য। আবার যখনই তারা বিমানের ব্যবসা বুঝতে শুরু করেছেন তখনই তাদের বদলি করে দেয়া হয়েছে। এদের সবাই প্রশাসন ক্যাডারের অতিরিক্ত সচিব থেকে বদলি হয়ে বিমানের প্রধান নির্বাহী হয়েছিলেন।
অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদ উল আলম বলেন, প্রায় ৩৩ বছর কাজ করছি। কিন্তু শূন্য অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি এয়ার লাইন্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হওয়া যায় এটি অন্য কোথাও দেখি নাই। এটা আমাদের দেশে অতীতে হয়েছে, এখনও হচ্ছে।
তার মতে, পেশাদার কাজগুলো পেশাদার লোক দিয়েই করাতে হবে। তা না হলেও ওই পেশায় পেশাদারিত্ব থাকবে না।
এভিয়েশন খাতটি আলু পটলের মতো কোনো ব্যবসা নয়, যে চাইলেই যে কেউ এটি সহজে বুঝতে পারবেন। এখানে অভিজ্ঞতার দামটা অনেক বেশি, যোগ করেন ওয়াহিদ উল আলম।

উদহারণ হিসেবে বলা যায়- এয়ার ইন্ডিয়ার প্রধান নির্বাহী ক্যামবেল উইলসন। এভিয়েশন জগতে তার অভিজ্ঞতা ২৬ বছরের। মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইজহাম বিন ইসমাইল। নিজ প্রতিষ্ঠানে তার অভিজ্ঞতা ৪০ বছরের। মালদ্বীভিয়ান এয়ারলাইন্সের প্রধান নির্বাহীর অভিজ্ঞতা ১৬ বছরের। সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের প্রধান নির্বাহীর অভিজ্ঞতা ৩৪ বছর। এমনকি নেপালের মতো দেশটির যে এয়ারলাইন্স; তার প্রধান নির্বাহীর অভিজ্ঞতাও ন্যুনতম আট বছর।
আর বাংলাদেশ বিমানের এই পদটি যেন সরকারি আর দশটা বদলির চাকরির মতো। যেখানে সদ্য যোগ দেয়া প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলাম গত সাড়ে পাঁচ বছর প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের একান্ত সচিব হিসেবে কাজ করেছেন। তার এই অভিজ্ঞতা বিমানের ব্যবসাক্ষেত্রে কোনো কাজে আসার কথা নয়। প্রতিষ্ঠার ৫২ বছরে বিমানে এখন পর্যন্ত প্রধান নির্বাহী বা ব্যবস্থাপনা পরিচালক হয়েছেন ৪২ জন।
কাজী ওয়াহিদ উল আলম বলেন, একজন যতো শার্প ব্রেনের হোন না কেন তাকে বুঝতে সময় দিতে হবে। কেননা তিনি সেটি বুঝে এই সেবা দেবেন। এজন্য একজন যতো কাজ করবেন, তার অভিজ্ঞতা ততো বাড়বে। কিন্তু সেই সুযোগ আমরা এখানে দিচ্ছি না। এটা আমার জেনেশুনে নাকি না জেনেই করছি তা আমি জানিনা। তবে এটা ভালো পলিসি নয়। এতে করে বিমান যে তিমিরে ছিলে, সেই তিমিরেই থেকে যাচ্ছে, আমরা আগাতে পারছি না।
শুধু প্রধান নির্বাহীর পদই নয়।বিমানের পরিচালক প্রশাসন, পরিচালক গ্রাহক সেবা, পরিচালক কার্গোসহ এমন ৬টি পদে প্রশাসন ক্যাডারসহ সরকারের অন্যান্য দপ্তর থেকে আসা কর্মকর্তারা আছেন। যাদের সবারই এভিয়েশনের অভিজ্ঞতা ছিল শুন্য। এসব পদে অতিথি পাখির মতো এসে কর্মকর্তারা কিছুদিন থেকে আবার চলে যান। আর এভাবেই বিশ্ব মানের এয়ারলাইন্স গড়ার স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ।
