রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দিনভর আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়েছে। এতে চার জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে একজন ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের নেতা এবং আরেকজন শিক্ষার্থী বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। বাকি দুই জনের মধ্যে একজন বাসচালক এবং অপরজন বেসরকারি অফিসের চাকরিজীবী। এছাড়া, নগরীতে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনায় কয়েকশ' আহত হয়েছেন। এদের মধ্যে সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের কর্মীরাও রয়েছেন।
রোববার সকাল থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্ট দখলে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী এবং আন্দোলনকারীদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষ চলেছে। এসব সংঘর্ষের সময় উভয়পক্ষের কর্মিদের হাতে লাঠি-সোটাসহ বিভিন্ন ধরনের ধারালো ধাতব বস্তু দেখা গেছে। বেশিরভাগ এলাকায় পুলিশ ধৈর্য্যের পরিচিয় দিলেও কোথায় কোথায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুঁড়েছে।
সকাল থেকেই উত্তপ্ত ছিল রাজধানীর এলাকাগুলো। রোববার বেলা ১টার দিকে সংঘর্ষ শুরু হয় কাঁটাবন এলাকায়। সেখানে দুই পক্ষের মধ্যে শুরু হয় ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ। এক পর্যায়ে একটি পক্ষে থেকে ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে। কাটাবন থেকে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের শাহবাগ, সায়েন্স ল্যাব ও বাটা সিগন্যাল এলাকা পর্যন্ত। একই সময় চিকিৎসাশাস্ত্রে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকটি গাড়িতে ভাংচুর এবং একটি আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্সে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা।

সকাল থেকে শাহবাগ মোড়ে লাঠিসোঁটা হাতে শত শত লোক জড়ো হতে থাকেন। সকালে সাড়ে ১০টার পরে তারা পুরান ঢাকার দিক থেকে মিছিল নিয়ে শাহবাগে আসেন। সে সময় বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সামনের দিকে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা স্লোগান দিচ্ছিলেন। তবে পুরান ঢাকার দিক থেকে আসা মিছিল থেকে তাঁদের ধাওয়া দেওয়া হয়। তাঁরা হাসপাতালের ভেতরে ঢুকে যান।
আন্দোলনকারীরা এ সময় হাসপাতালের বাইরে থাকা বেশ কিছু যানবাহনে আগুন দেয়। তারা হাসপাতালের ভেতরে ঢুকে পড়ে। এ সময় হাসপাতালের প্রাঙ্গণে রাখা কয়েকটি গাড়ি ও অ্যাম্বুলেন্স ভাঙচুর ও আগুন দেয়া হয়। হাসপাতালের ভেতরে আশ্রয় নেওয়া আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা ইটপাটকেল ছুঁড়ে জবাব দিচ্ছিলেন। পরে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল হাসপাতালে ভাঙচুরের ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েন সেখানে চিকিৎসা নিতে যাওয়া এবং ভর্তি থাকা রোগীরা। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে চিকিৎসকদের মধ্যে। হাসপাতাল প্রাঙ্গণে গাড়ি এবং অ্যাম্বুলেন্সে ভাঙচুর ও আগুন দেয়ার ঘটনায় তারা নিন্দা জানান। তারা অভিযোগ করেন, কোন শিক্ষার্থী এসব কাজ করতে পারে না। কোন মহলের চক্রান্তেই এ ধরনের জঘন্য হামলা হয়েছে।
শাহবাগের অদূরে রাজধানীর বাংলামোটর ও কারওয়ান বাজার এলাকায় (সোনারগাঁও মোড়) আন্দোলনকারী ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। দুপুর আড়াইটা থেকে বাংলামোটর ও কারওয়ান বাজার মোড় এলাকায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। আন্দোলনকারীরা এক এক করে বাংলামোটর মোড়ে অবস্থান নেয়।

অপর দিকে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা সোনারগাঁও মোড়ে অবস্থান নেয়। এক পর্যায়ে আন্দোলনকারীরা কারওয়ান বাজারের দিকে এগিয়ে আসার চেষ্টা করলে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা শুরু হয়। এ সময় থেমে থেমে শোনা যায় গুলির শব্দ। বিকেল পর্যন্ত চলে সেখানে হাঙ্গামা। এতে আতঙ্ক বিরাজ করছে গোটা এলাকাজুড়ে।
বিকালে ফার্মগেট এলাকায় সংঘর্ষের মধ্যে আহত হয়ে তৌহিদুল ইসলাম (২২) নামের এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। তিনি মহাখালীর ডিএইট কনসালটেন্ট লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানের অফিস সহকারী। তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় বিকাল সোয়া ৫টার দিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসাপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে এলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন।
ধানমন্ডিতে ত্রিমুখী ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া উত্তপ্ত হয়ে উঠে গোটা এলাকা। ধানমন্ডি দুই নম্বর রোড থেকে শুরু করে জিগাতলা হয়ে ২৭ নম্বর পর্যন্ত পুরো এলাকা পরিণত হয় রণক্ষেত্রে। পুলিশ ও আওয়ামী লীগের কর্মিরা অবস্থান নেয় পিলখানা বিজিবি গেট এলাকায়। আন্দোলনকারীরা অবস্থান নেয় ধানমন্ডি পপুলার হাসপাতাল পার হয়ে স্টার কাবাব অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের সামনে।
দুপুর ১২টার পর ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয় এলাকা থেকে একটি মিছিল আসতে শুরু করে সায়েন্স ল্যাবরেটরির উদ্দেশে। এই সময় সায়েন্স ল্যাবে অবস্থান নেয়া আন্দোলনকারীরা পপুলার হাসপাতাল পার হয়ে এসে মিছিলটিকে ধাওয়া দেয়। প্রথমে পিছু হটে মিছিলটি। এরপরে শুরু হয় সংঘর্ষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে দুপুর ১টা পর্যন্ত অন্তত ১০-১৫টি সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার গ্যাস ছুড়ে। এতে অন্তত পাঁচ জনকে আহত হয়েছে বলে জানা গেছে।
দুপুরে রাজধানীর জিগাতলা এলাকায় সংঘর্ষের মধ্যে গুলিবিদ্ধ হয়ে এক শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। তার নাম আব্দুল্লাহ সিদ্দিকী (২৩)। তিনি রাজধানীর হাবিবুল্লাহ বাহার ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী। বিকাল পৌনে ৪টার দিকে আব্দুল্লাহকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে এলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক।
রাজধানীর মিরপুর ১০ নম্বরে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষে দুইজন নিহত হয়েছেন। নিহত ব্যক্তির নাম মিরাজ হোসেন। তার বয়স ২২ থেকে ২৩ বছর হবে। তিনি পেশায় বাসচালক। এ সময় আহত হয়েছে কমপক্ষে তিন শতাধিক। মিরপুর ১০ নম্বর এলাকার ড. আজমল হাসপাতাল, আলোক হাসপাতাল ও পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
মিরপুর নিহত আওয়ামী লীগ নেতা আনোয়ারুল ইসলাম ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের কার্যকরী কমিটির সদস্য। তিনি উত্তরা এলাকায় আওয়ামী লীগের অবস্থান কর্মসূচিতে ছিলেন। বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার মধ্যে দুপুর ১টার দিকে উত্তরার রাজলক্ষ্মী এলাকার লতিফ এম্পোরিয়াম মার্কেটে আশ্রয় নেন। এ সময় বিক্ষোভকারীরা গিয়ে তার ওপর হামলা করেন। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। পরে মরদেহ উত্তরা–১৪ নম্বর সেক্টরে নিহতের নিজ বাসায় রাখা হয়েছে।
সকাল সাড়ে ১০টা থেকে আওয়ামী লীগের দখলে ছিলো গোল চত্বর। বিকেল সাড়ে তিনটায় প্রায় ৫ ঘণ্টা পর আন্দোলনকারীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া করে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এরপর গোল চত্বর দখলে নেয় আন্দোলনকারী। আন্দোলনকারীদের ধাওয়ায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মিরপুর দুই নম্বর স্টেডিয়ামের সামনের দিকের সড়কে চলে যান। সেখানে উত্তেজনায় বিরাজ করছিলো।
মিরপুরে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এই সংঘর্ষ বেনারশি পল্লী, আইডিয়াল গার্লস স্কুল সড়ক, বিআরটিএ সড়ক, মিরপুর ৬ নম্বর, আল হেলাল হাসপাতাল সড়কে ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে পুলিশ টিয়ারসেল ও গুলি নিক্ষেপ করে। এতে দুই পক্ষের বহু আহত হয়েছেন। সেখানকার হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে আহতের সংখ্যা কয়েক শত হবে।
ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের প্রবেশের প্রধান ফটকে ইটপাটকেল ও লাঠিসোঁটা দিয়ে ভাঙার চেষ্টা করেছে আন্দোলনকারীরা। বেলা ১১টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। এ সময় লাঠি হাতে নিয়ে ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দিয়ে পুরান ঢাকায় বিক্ষোভ মিছিল করে তারা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে।। পরে আন্দোলনকারীরা মিছিল নিয়ে রায়সাহেব বাজারের দিকে চলে যায়। যাওয়ার সময় আন্দোলনকারীরা পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর করে।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল সূত্র জানায়, রোববার বিকাল তিনটা পর্যন্ত রাজধানীর শাহবাগ, শনির আখড়া, নয়াবাজার, ধানমন্ডি, সায়েন্স ল্যাবরেটরি, পল্টন, প্রেস ক্লাব এবং মুন্সীগঞ্জ থেকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ১১১ জনকে এখানে আনা হয়। এর মধ্যে ৩৩ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বাকিদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
পুড়ছে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল, অসংখ্য গাড়িতে আগুন
আবারও উত্তপ্ত উত্তরা, দফায় দফায় সংঘর্ষ