বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মোট ১৭২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৮৪ জন হাসপাতালে মারা গেছেন এবং ৮৮ জন মৃত অবস্থায় নিয়ে আসা হয়েছিলো। বৃহস্পতিবার হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আসাদুজ্জামান এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান।
তিনি জানান, মৃতদের মধ্যে বেশিরভাগের মৃত্যু হয়েছে গুলির আঘাতে, বিশেষ করে হেডশট ও বুকে গুলির কারণে। মৃতদের ৮৫ শতাংশের ময়নাতদন্ত করা সম্ভব হয়েছে। যারা হাসপাতালে ভর্তি হবার পর মারা গেছেন, তাদের সব তথ্য রয়েছে এবং তাদের ডেথ সার্টিফিকেট দেওয়া হয়েছে।
তবে মৃত অবস্থায় আসা ব্যক্তিদের সঠিক তথ্য না থাকায় তাদের সার্টিফিকেট দেওয়া সম্ভব হয়নি। কিছু লাশের পরিচয় জানা যায়নি। পুলিশ ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত করেছে।
ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী সবুজ মিয়ার পরিচয় ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ্যমে জানা গেছে। যাদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি, তাদের লাশ আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামকে দেয়া হয়েছে। সঠিক সংখ্যাটি পুলিশ জানাতে পারবে।
ময়নাতদন্ত সম্পর্কে ব্রিগেডিয়ার আসাদুজ্জামান বলেন, মৃত্যুর পর ময়নাতদন্তের কাজ পুলিশের দায়িত্ব। পুলিশ কেস হলে মর্গে লাশ পাঠানো হয় এবং ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ ময়নাতদন্ত করে।

প্রথম ধাপে, ১৫ থেকে ২২ আগস্টের মধ্যে মৃত্যুর শিকার সকলের ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। তবে দ্বিতীয় ধাপে মৃত অবস্থায় আসা কিছু লাশের ময়নাতদন্ত হয়নি, কারণ প্রায় এক সপ্তাহ পুলিশ ছিল না।
কিছু পরিবারের সদস্যরা ময়নাতদন্তে বাধা দিয়েছেন, যদিও তাদের বোঝানো হয়েছিল যে বিচারের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ। তারপরেও অনেকে বলেছেন, ময়নাতদন্ত চান না, মরদেহ ফেরত নিতে চান।
ঢামেক পরিচালক জানান, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে সৃষ্ট সহিংসতায় আহত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিয়েছেন ২ হাজার ৬১৩ জন। বর্তমানে চিকিৎসাধীন আছেন ৯৮ জন।
পরিচালক বলেন, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অনেকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে চিকিৎসা নিতে এসেছেন, অনেকেই ভালো হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন, এখনও অনেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
এই আন্দোলনে ঢামেকে রোগী আসা শুরু করে ১৫ জুলাই থেকে। আন্দোলনের সময়কে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রাক-প্রাথমিক (১৫-১৭ জুলাই), প্রাথমিক পর্যায়ে (১৮-২১ জুলাই), অন্তর্বর্তীকালীন (২২ জুলাই থেকে ৩ আগস্ট), দ্বিতীয় পর্যায় (৪-৫ আগস্ট) ও পরবর্তী পর্যায়ে (৯-২৫ আগস্ট) ভাগে ভাগ করেন।

পরিচালক জানান, এই সময়ে মোট চিকিৎসাসেবা নিয়েছে ২৬১৩ জন। তাদের মধ্যে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা নিয়েছে ১৬৯৬ জন, হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৮২৯ জন, হাসপাতালে ভর্তি অবস্থায় মৃত্যু বরণ করেছে ৮৪ জন ও ৮৮ জনকে হাসপাতালে মৃত আনা হয়েছে।
শুরু থেকেই ঢাকা মেডিক্যাল কর্তৃপক্ষ একাই চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছিল। কিন্তু পরের দিকে বিজিবি হাসপাতাল ও সিএমএইচ হাসপাতাল কিছু রোগীর চিকিৎসাসেবা দিতে আগ্রহ প্রকাশ করে।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আসাদুজ্জামান বলেন, আমরা বিজিতে ১৯ জন ও সিএমএইচে ২৬ জনকে পাঠিয়েছি। খোঁজ নিয়েছি, তারা ভালো চিকিৎসা পাচ্ছে, অবস্থার উন্নতি হয়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে আমাদের কাছে রোগী আছে ৯৮ জন। এসব রোগীদের আমরা বিনামূল্যে চিকিৎসা দিচ্ছি। যাদের অপারেশনের প্রয়োজন পড়ছে, আমরা নিজেরা কিনে দিচ্ছি, তাদের কিনতে হচ্ছে না।
দুচোখ হারিয়েছে ৭ জন, হাত-পা কাটা হয়েছে দুজনের। কতজন চোখ হারিয়েছে, জানতে চাইলে বলা হয়, অনেকে চিকিৎসারত আছে। এখনো বলা যাচ্ছে না তাদের অপারেশন দরকার কি না, সেটা সময়সাপেক্ষ।
তবে আমাদের কাছে বর্তমান তথ্য হলো, ৭ জন দুই চোখ হারিয়েছে, খুব বাজেভাবে ইঞ্জুরি হয়েছে। এ ছাড়া ৭০ জন একচোখে খুব খারাপ ইঞ্জুরি হয়েছে। চক্ষু ইঞ্জুরির বেশির ভাগই প্যালেট ইঞ্জুরি।
বেওয়ারিশ লাশ কতগুলো এসেছে, এমন প্রশ্নের জবাবে ঢামেক পরিচালক জানান, আসলে অনেকগুলো লাশ এসেছে। অনেকে মৃত্যুবরণ করেছে হাসপাতালে। আমাদের কাজ মৃত্যুর পর পুলিশ কেস হলে লাশ পুলিশকে দিয়ে দেওয়া। কতগুলো বেওয়ারিশ লাশ, সেটা পুলিশই ভালো বলতে পারবে।
আন্দোলনে আহত হয়ে অনেকে হাসপাতালে এসে নিজ খরচে চিকিৎসা নিয়েছে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য কমিটি করা হয়েছে পরে।
প্রথমদিকে যারা চিকিৎসা নিয়েছে, তাদের অনেককেই হয়তো কিছু খরচ করতে হয়েছে। এরপর সরকারি নির্দেশনা আসার পর সবকিছু হাসপাতাল থেকে দেওয়া হয়েছে।
তবে দু-এক জন থাকতে পারে, যারা নিজ খরচে চিকিৎসাসেবা নিয়েছে। যারা করেছে, তাদের যথাযথ ডকুমেন্টসহ আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে আমরা সেটি দেওয়ার ব্যবস্থা করবো।
অনেকেই আহতদের সহায়তা করতে আসছেন জানিয়ে পরিচালক বলেন, আহতদের জন্য ফান্ড রয়েছে। এ ছাড়া অনেকেই সহায়তা করতে আসছে। সবাই এসে ২০১ নম্বর ওয়ার্ডে যেতে চায়, যেখানে আন্দোলনের আহতদের জন্য ডেডিকেটেড। সবাই যেন সহায়তা পায়, সে জন্য তালিকা করে নির্দেশনা দিচ্ছি।
বন্যায় মৃত্যু ছাড়ালো অর্ধশত, সর্বোচ্চ ফেনীতে
গুমবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদে সই করলো বাংলাদেশ