গত বছরের সাত অক্টোবর ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় হামলা শুরুর পর ইসরাইলকে একটি দিনের জন্যও শান্তিতে ঘুমাতে দেয়নি লেবাননের শক্তিশালী সশস্ত্র আন্দোলন- হিজবুল্লাহ। লেবানন সীমান্ত থেকে প্রতিদিন ড্রোন, রকেট আর মিসাইল হামলা চালিয়ে আসছে সংগঠনটি। তিতিবিরক্ত হয়ে, সেপ্টেম্বর থেকেই লেবাননে বিমান হামলার পাশাপাশি স্থলযুদ্ধে শুরু করে ইসরাইল। কিন্তু তাতেও দমানো যাচ্ছে না হিজবুল্লাহকে।
প্রতিরোধ আন্দোলনের এই মহাশক্তির মেরুদন্ড ভেঙ্গে দিতে ইসরাইল শুরু করে গুপ্ত হত্যা। চোরাগোপ্তার আর সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে একের পর এক হিজবুল্লাহ নেতাকে হত্যা করতে থাকে জায়নবাদি ‘খুনে’ নেতা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। সেপ্টেম্বরেই বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলীতে হিজবুল্লাহর সদর দফতরে ইসরাইলের ভয়াবহ সন্ত্রাসী বোমা হামলায় নিহত হন সংগঠনের প্রধান হাসান নাসরুল্লাহ।
ওই সময় শোনা গিয়েছিল স্থলাভিষিক্ত হবেন হাসিম সাফিউদ্দিন। তবে নাসরুল্লাহ নিহত হওয়ার এক সপ্তাহ না পেরুতেই ইসরাইলের আরেক সন্ত্রাসী হামলায় সাফিউদ্দিনও মারা যান। ইসরাইল ভেবেছিলো প্রতিরোধ যোদ্ধারা নেতা শূন্য হয়ে পড়বে। ভুল ভেবেছিলো তেল আবিব। তাদের ধারণার বিপরীতে, এক মাসের বেশি সময় পর শেখ নাঈম কাশেমকে নতুন প্রধান হিসেবে ঘোষণা করেছে হিজবুল্লাহ।

কাশেম তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে হিজবুল্লাহর উপ-প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সেই সঙ্গে সংগঠনের মুখপাত্র হিসেবে কাজ করেছেন। হত্যা চেষ্টার হুমকি থাকায় গত অক্টোবর থেকেই নাঈম দামেস্ক হয়ে ইরানে চলে যান। এরপর থেকে তিনি সেখানেই আছেন। তাঁর অবস্থান কঠোরভাবে গোপন রেখেছে তেহরান। আপাতত সেখান থেকেই নতুন দায়িত্ব সামলাবেন শেক নাঈম কাশেম।
নাঈম কাশেমকে কেন প্রধান করা হলো তার জবাবও দিয়েছে হিজবুল্লাহ। তাদের তরফে জানানো হয়েছে, কাশেম সংগঠনের নীতি ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখেন। তিনি হিজবুল্লাহর দুই নম্বর নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এখন সেই উপপ্রধান থেকে প্রধান পদে উন্নীত হয়েছেন। ১৯৮০ এর দশকের শুরুতে যাঁরা হিজবুল্লাহ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তাদের মধ্যে তিনিও অন্যতম।
শেখ নাঈম কাসেম ১৯৫৩ সালে লেবাননের রাজধানী বৈরুতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পারিবারিক ইতিহাস খুব একটা জানা যায় না। নাঈম কাশেম তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু করেন লেবানিজ শিয়া আন্দোলন শিয়া আমল মুভমেন্টের সঙ্গে। পরে ১৯৭৯ সালে তিনি শিয়া আমল মুভমেন্ট ছেড়ে দেন। এর পর ইরানে ইসলামি বিপ্লবের পর তিনি নতুন করে ভাবতে শুরু করেন।

ইরানের ইসলামপন্থী সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর, দেশটির বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) লেবাননে হিজবুল্লাহ সৃষ্টিতে সহায়তা করে। লেবাননে ১৯৮২ সালে ইসরাইলি আগ্রাসনের মুখে গঠিত হয় হিজবুল্লাহ। শেখ নাঈম কাসেম শুরু থেকেই এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। যে বৈঠকের মাধ্যমে হিজবুল্লাহর জন্ম হয়েছিলো সেটিতেও উপস্থিত ছিলেন নাঈম কাশেম।
হাসান নাসরুল্লাহ জীবিত থাকাকালেই ৭১ বছর বয়সী নাঈম কাসেমকে হিজবুল্লাহর ‘দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা’ হিসেবে উল্লেখ করা হতো। তিনি ১৯৮০-এর দশকের গোড়ার দিক থেকেই গোষ্ঠীটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ধর্মীয় পণ্ডিত। নাঈম কাশেম ১৯৯১ সালে সশস্ত্র গোষ্ঠীটির তৎকালীন সেক্রেটারি জেনারেল আব্বাস আল-মুসাভির আমলে হিজবুল্লাহর উপপ্রধান হিসেবে নিযুক্ত হন।
মুসাভি পরের বছর, ইসরাইলি হেলিকপ্টার হামলায় নিহত হন। মুসাভি নিহত হওয়ার পর সাঈদ হাসান নাসরুল্লাহ হিজবুল্লাহর প্রধান হন। বয়সে নাসরুল্লাহর চেয়ে বড় হলেও গোষ্ঠীটির ডেপুটি হিসেবেই থেকে যান নাঈম কাসেম। লেবাননে ১৯৯২ সালে যে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় সেই নির্বাচনে হিজবুল্লাহর হয়ে নির্বাচন পরিচালনা করেন শেখ নাঈম কাসেম।
তিনি দলের মুখপাত্র হিসেবেও কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। ইসরাইলের হিজবুল্লাহর চলমান সংঘর্ষের মধ্যেই তিনি প্রায়ই বিদেশি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছেন। শেখ নাঈম কাসেম ২০০৫ সালে হিজবুল্লাহর ইতিহাস নিয়ে একটি বই লিখেন। বইটির নামের ইংরেজি অর্থ করলে দাঁড়ায় ‘ইনসাইডারস লুক’। হিজবুল্লাহর নতুন প্রধান সাদা পাগড়ি পরেন। তাঁর দুই পূর্বসূরি নাসরুল্লাহ ও সাইফুদ্দিন কালো পাগড়ি পরতেন।
সম্প্রতি নাঈম কাশেম তার এক ভাষণে দখলদার ইসরাইলের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির কথাও বলেছিলেন। ওই বারই প্রথমবারের মতো গাজায় যুদ্ধবিরতি ছাড়া ইসরাইলের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির ইঙ্গিত দিয়েছিলো হিজবুল্লাহ। তবে নাঈম কাশেম সঙ্গে এও জানিয়ে দেন, যদি ইসরাইল যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চায় তাহলে তারা প্রস্তুত আছেন।
হিজবুল্লাহর নতুন প্রধান হলেন নাঈম কাশেম