রাতে এক নারীকে হাত-পা বেঁধে টেনে হেঁচড়ে তুলে নেওয়ার একটি ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। ওই ভিডিওতে দেখা গেছে, কেঁদে কেঁদে ওই নারী চিৎকার করে বলছেন- ‘আমারে বাঁচা, বাঁচা আমারে, আমারে একটু বাঁচা।’
শনিবার (২৮ জুন) মধ্যরাতে ঘটনাটি ঘটেছে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার মৌডুবি ইউনিয়নের মাঝের দেওর গ্রামে।
ঘটনাটি নিয়ে একদিকে যেমন মানুষের কৌতূহল বেড়েছে, অন্যদিকে সৃষ্টি হয়েছে বিভ্রান্তিরও। পুলিশের ভাষ্য, এটি পারিবারিক ঘটনা। কথিত স্বামীর বাড়ি থেকে নারীর পরিবার তাকে নিয়ে গেছে। তবে প্রশ্ন উঠছে, একজন নারীর সঙ্গে এমন আচরণ কেন নির্যাতন বলে গণ্য হবে না?
নারীটির পরিবার, স্থানীয়, পুলিশসহ একাধিক সূত্রে জানা গেছে, মেয়েটির পরিবার বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। আর ছেলেটি ছাত্রলীগের পদধারী। তারা নিজেদের স্বামী-স্ত্রী দাবি করলেও মেয়েটির পরিবার তা মানতে নারাজ। তারা বিয়ের কোনো কাগজপত্র দেখা না পারায় বিষয়টি সমাজপতিদের কাছেও বিব্রতকর।
শনিবার মধ্যরাতে কামাল গাজী নামে এক ব্যক্তি ভিডিওটি শেয়ার করে ক্যাপশনে লেখেন, ওই নারী তার স্ত্রী। তার বাড়ি থেকে স্ত্রীকে এভাবে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, দুই সপ্তাহ আগে কামালের বাড়িতে ওঠেন ওই নারী। কামালের সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে বলেও শোনা যাচ্ছে। কিন্তু শনিবার রাতে নারীর পরিবার জোর করে তাকে তুলে নিয়ে যায়। তাদের ভাষ্য, মেয়েটির পরিবার স্থানীয় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। আর ছেলেটি সদ্য নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের রাঙ্গাবালী উপজেলার শাখার সহ সভাপতি। এ নিয়ে তাদের মধ্যে ঝামেলা।
রাঙ্গাবালী থানার অফিসার ইনচার্জ এমারৎ হোসেন বলেন, তাদের বিয়ের কোনো কাগজপত্র পাওয়া যাচ্ছে না। ৭-৮ দিন আগে মেয়েটি কামালের বাবারবাড়িতে আসেন। কিন্তু কামাল বাড়িতে ছিলেন না। গত পাঁচ আগস্টের পর থেকে তিনি এলাকায় নেই।
তিনি আরও বলেন, শনিবার রাতে বাবা, চাচাসহ পরিবারের কয়েকজন সদস্য তাকে জোর করে নিয়ে যান। এদের মধ্যে স্থানীয় বিএনপির রাজনীতিতে জড়িত লিটু গাজী, মোহসীন হাওলাদার, এরশাদ হাওলাদার এবং স্থানীয় ইউপি সদস্য (মৌডুবি ৯ নম্বর ওয়ার্ড) ইলিয়াস গাজীও ছিলেন। তবে এটি কোনো রাজনৈতিক ইস্যু নয়, পারিবারিক ঘটনা। এতো কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি।
রোববার পটুয়াখালী জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মোহাম্মদ সাজেদুল ইসলাম সজলের সই করা এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ওই ঘটনায় মিথ্যা তথ্য ও অতিরঞ্জিত করে ফেসবুকে ফলাও করে প্রচার করা হয়েছে।
জেলা পুলিশ সুপারের বরাত দিয়ে তিনি জানান, অনাকাঙ্খিত ঘটনাকে পুঁজি করে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে প্রকৃত ঘটনাটিকে ভিন্নখাতে প্রকাশ করতে না পারে, সে লক্ষ্যে জেলা পুলিশের একাধিক টিম মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে।
এদিকে ফেসবুকে ভিডিও পোস্টকারী কামাল গাজীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ওই নারীর সঙ্গে আমার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। বিষয়টি এলাকার সবাই জানে। কিন্তু তারা পরিবার আমাদের বিষয়টি মেনে নিচ্ছিলো না। এজন্য তাকে কোরবানির ঈদের আগে প্রচুর মারধর করেছে। শিকল দিয়ে বেঁধেও রেখেছিলো। পরে ১২ জুন সে আমাদের বাড়িতে চলে আসে। ১৫ জুন অনলাইনে কাজির মাধ্যমে আমাদের কলমা হয় এবং ২০ জুন পটুয়াখালীতে দুই লাখ টাকা দেন মোহরে কাবিন হয়।
তার দাবি, আমরা বৈধ স্বামী-স্ত্রী। সার্টিফিকেট অনুযায়ী স্ত্রীর বয়স ১৯ বছর। আমার কাছে কলমা-কাবিন এবং তার বয়সের সব প্রমাণ আছে। তবুও শনিবার রাত ১২ টার দিকে আমার মা-বোনকে মারধর করে স্ত্রীকে জোর করে তুলে নিয়ে গেছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে ওই নারীর বাবা বলেন, মেয়েকে ভুল বুঝিয়ে নিয়ে কামাল গাজী ‘বিয়ে করছে’। আমার মেয়ে কামাল গাজীর বাড়িতে চলে গিয়েছিল। পরিবারের অমতে ‘বিয়ে করায়’ তাকে ফিরিয়ে নিয়ে আসি। মেয়ে এখন আমাদের হেফাজতে আছে।
ঘটনাটি নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। গোপন বিয়ে এবং সামাজিক সম্মানের দ্বন্দ্ব-সব মিলিয়ে বিষয়টি এখন নানা মাত্রায় আলোচিত।
উপজেলার মৌডুবি ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক আসাদুজ্জামান বলেন, মেয়েটি যে বিবাহিত তার প্রমাণ দেখাতে পারেনি। শনিবার রাতে তার পরিবার জোর করে নিয়ে যায়। মেয়েটি যেতে চাচ্ছিলো না বলে জানতে পেরেছি। তবে মেয়েটি যদি প্রাপ্ত বয়স্ক এবং বিয়ে হয়ে থাকে- তাহলে এভাবে জোর জবরদস্তি ঠিক হয়নি।
মুরাদনগরে নির্যাতনের সেই ভিডিও ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সরানোর নির্দেশ