লেখাপড়া করে যে, গাড়ি-ঘোড়া চড়ে সে। এই বাংলা প্রবাদটি টেকে না যুক্তরাষ্ট্রের মাকিনাক দ্বীপে। সেখানে আপনি যতই লেখাপড়া শিখুন না কেন, আপনাকে চড়তে হবে ঘোড়াতেই। কারণ সেখানে মোটরযান নিষিদ্ধ। শত কোটির মালিকও সেখানে বেড়াতে গেলে চড়তে হয় ঘোড়ার গাড়িতে।
এ যেন ওয়েস্টার্ন গল্পের কোনো ছবি। সেখানে গাড়ির হর্নের বদলে শোনা যাবে ঘোড়ার ডাক। যুক্তরাষ্ট্রের গাড়ির রাজধানী ডেট্রয়েটে অবস্থিত হলেও ৬০০ মানুষ ও একই সংখ্যক ঘোড়ার দ্বীপটিতে এখনও মোটরগাড়ি ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। স্থানীয়দের ভাষায় সেখানে ঘোড়াই রাজা।
মিশিগান অঙ্গরাজ্যে হিউরন হ্রদের মাঝে অবস্থিত মাকিনাক দ্বীপে গলফ কার্ট চলাচলের অনুমতিও নেই। তাই সেখানে জোরালো কোনও আওয়াজ শুনলে ধরেই নেবেন সেটা দ্বীপের ঘোড়া বা পাখির কাছ থেকে এসেছে।

১৮৯৮ সালে এক গাড়ির ব্যাকফায়ারে স্থানীয় ঘোড়াগুলো মারাত্মক ঘাবড়ে যায়। তখন থেকেই দ্বীপের ভেতরে ইঞ্জিনচালিত বাহন নিষিদ্ধ। আধুনিকতার বদলে শান্ত জীবনযাপনকেই গুরুত্ব দিয়েছেন দ্বীপের বাসিন্দারা।
প্রতি গ্রীষ্মে সাধারণ জীবনের স্বাদ নিতে মাকিনাকে আসেন প্রায় ১২ লাখ মানুষ। দ্বীপের বিখ্যাত ফাজ, ৭০ মাইলের ট্রেইল, ঘোড়ার খুঁড়ের শব্দে দশণার্থীরা হারিয়ে যেতে চান শান্ত, নিরিবিলি অতীতে।
মাকিনাক দ্বীপের চুনাপাথরের ঢাল এবং সবুজ বনের সঙ্গে কচ্ছপের পিঠের মিল থাকায় স্থানীয় আদিবাসীরা এর নাম দিয়েছিলেন 'মিচিলিমাকিনাক'। বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায় মহান কচ্ছপের স্থান। বহু শতাব্দী ধরে এই দ্বীপকে মাছধরা ও শিকারের স্থান হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
পরবর্তীতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে ১৭৮০ সালে একটি প্রতিরক্ষা দুর্গ স্থাপন করা হয় সেখানে। তখন দ্বীপের নাম হয় মাকিনাক। আজও দর্শনার্থীরা সেখানে ঐতিহাসিক ক্যানন ফায়ারিং দেখতে পারেন।

বিশেষ পোশাকধারী গাইডের সঙ্গে ঘুরে তারা মিশিগানের প্রাচীন ভবনগুলোতে ইতিহাসের খোঁজ করেন। দ্বীপটিতে রয়েছে ১৩৮ বছরের পুরনো হোটেল, যার সজ্জিত কক্ষ ও দীর্ঘ বারান্দা বিশেষ স্বাতন্ত্র্যের দাবিদার।
দ্বীপের ৮০ শতাংশ এলাকা মাকিনাক দ্বীপ স্টেট পার্কের অন্তর্ভুক্ত, যেখানে পর্যটকরা প্রাচীন বন, চুনাপাথরের স্তম্ভ, হাইকিং, সাইকেল বা ঘোড়ার গাড়িতে ঘুরে আর্ক রক দেখতে পারেন।
দ্বীপে চলাচলের আরেকটি প্রধান মাধ্যম হচ্ছে সাইকেল। এখানে ভাড়া দেয়ার জন্য প্রায় দেড় হাজার সাইকেল রয়েছে। স্থানীয়রা জানান, ঘোড়া ছাড়া সেখানের জীবন অসম্পূর্ণ। খুঁড়ের শব্দে মনে হবে অতীতে ফিরে গেছেন।
শীতকালে দ্বীপটি প্রায় সময়ে বরফ ঢেকে যায় এবং ফেরি বন্ধ থাকে। তবে বসন্ত ও গ্রীষ্মে দ্বীপে প্রাণ ফিরে আসে। লাইলাক ফেস্টিভ্যালের সময় গাছগুলো ফুলে ভরে ওঠে, রাতের আকাশ দেখা যায় ফোর্ট হোল্মস।
