বছর ঘুরে আবার ফিরে এসেছে যিশু খ্রিস্টের জন্মদিন—পবিত্র বড়দিন। বিশ্বজুড়ে গির্জাগুলোতে শুরু হয়েছে বিশেষ প্রার্থনা, আর শহর থেকে গ্রাম মেতে উঠেছে আলোকসজ্জা ও উৎসবের আনন্দে। কনকনে ঠান্ডাকে উপেক্ষা করেই মানুষের মনে এখন উৎসবের উষ্ণতা।
বড়দিন উপলক্ষে প্রতিটি গির্জা এবং খ্রিস্টান পল্লিগুলোতে বর্ণিল সাজসজ্জা ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। যিশুর জন্মের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তকে স্মরণ করতে তৈরি করা হয়েছে ‘গোয়ালঘর’ বা ‘ক্রিব’। ঘরে ঘরে শোভা পাচ্ছে ক্রিসমাস ট্রি, যা রঙিন আলো। সাজানো হয়েছে ছোট ছোট উপহার দিয়ে। পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে কেক কাটা এবং বিশেষ ভোজের আয়োজন এই উৎসবের অন্যতম অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বড়দিনের মূল সুরই হলো শান্তি ও মানবতা। গির্জাগুলোতে বিশেষ প্রার্থনায় বিশ্বের শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করা হচ্ছে। ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবাই একে অপরের সঙ্গে উপহার বিনিময় করছে। যিশুর প্রেম ও ক্ষমার বাণী ছড়িয়ে পড়ছে সবখানে।
এদিকে বড়দিন উপলক্ষে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস এক বাণীতে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের প্রীতি ও শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। তিনি এক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নে দেশপ্রেম ও মানবতার মহান আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী সবাইকে এগিয়ে আসার আহবান জানিয়েছেন।
প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, খ্রিষ্টান ধর্মের প্রবর্তক যিশু খ্রিষ্ট এই দিনে বেথেলহেমে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পৃথিবীতে শান্তি, ন্যায় এবং মানবমুক্তির বার্তা নিয়ে আগমন করেছিলেন। মানবজাতিকে পাপমুক্ত করে সত্য, কল্যাণ ও ন্যায়ের পথে পরিচালিত করাই ছিল তার জীবনের অন্যতম লক্ষ্য। মহামতি যিশু সর্বদা বিপন্ন, অবহেলিত ও অনাহারক্লিষ্ট মানুষের সেবায় নিবেদিত ছিলেন। আমৃত্যু তিনি প্রচার করে গেছেন ক্ষমা, ভালোবাসা ও প্রভুভক্তির মহিমা। তার জীবনাচরণ ও মহৎ চারিত্রিক গুণাবলি আজও তার ভক্ত ও অনুসারীদের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।

ফাদার ক্রিসমাস থেকে সান্তা ক্লজ: এক বিবর্তনের গল্প
বড়দিনের সবচেয়ে জনপ্রিয় চরিত্র সান্তা ক্লজ বা ফাদার ক্রিসমাস। তবে লাল পোশাকের এই হাসিখুশি বৃদ্ধের বর্তমান রূপটি কিন্তু একদিনে তৈরি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে কয়েকশ বছরের ইতিহাস।
সেন্ট নিকোলাস: আসল অনুপ্রেরণা
সান্তা ক্লজের গল্পের শুরু খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীতে বর্তমান তুরস্কের মায়রা অঞ্চলে। সেখানে সেন্ট নিকোলাস নামে এক দয়ালু বিশপ বাস করতেন। তিনি তার উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সমস্ত সম্পদ দরিদ্রদের দান করে দিতেন। বিশেষ করে শিশুদের প্রতি তার ভালোবাসা ছিল অসীম। প্রচলিত আছে, তিনি গোপনে শিশুদের জুতোয় বা মোজায় স্বর্ণের মুদ্রা রেখে যেতেন।

সিন্টারক্লাস ও ডাচ প্রভাব
সেন্ট নিকোলাসের মৃত্যুর পর তার এই দয়ালু ভাবমূর্তি ইউরোপ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। ওলন্দাজ বা ডাচ ভাষায় তাকে ডাকা হতো ‘সিন্টারক্লাস’। ১৬০০-এর দশকে যখন ওলন্দাজরা আমেরিকায় বসতি স্থাপন করে, তারা তাদের সঙ্গে এই সিন্টারক্লাসের ঐতিহ্য নিয়ে যায়। ধীরে ধীরে ইংরেজি উচ্চারণে এটি 'সান্তা ক্লজ'-এ রূপান্তরিত হয়।
ফাদার ক্রিসমাস বনাম সান্তা ক্লজ
ব্রিটেনে প্রাচীনকাল থেকেই ‘ফাদার ক্রিসমাস’ নামে একটি চরিত্র ছিলো। তিনি ছিলেন উৎসব, ভোজ এবং আনন্দের প্রতীক। প্রথম দিকে তার পরনে থাকতো সবুজ রঙের আলখাল্লা। উনিশ শতকের দিকে আমেরিকান সান্তা ক্লজ এবং ব্রিটিশ ফাদার ক্রিসমাস চরিত্র দুটি মিলেমিশে এক হয়ে যায়।

আধুনিক রূপ ও লাল পোশাক
সান্তা ক্লজের বর্তমানের ভুঁড়িওয়ালা, সাদা দাড়ি এবং লাল পোশাকের রূপটি জনপ্রিয় করার পেছনে চিত্রকর থমাস ন্যাস্ট এবং পরবর্তীতে ১৯৩০-এর দশকে কোকাকোলা কোম্পানির বিজ্ঞাপনের বড়ো ভূমিকা ছিলো। তাদের প্রচারের ফলেই সান্তা ক্লজ আজকের বিশ্বজনীন রূপ লাভ করে—যিনি রেইনডিয়ার টানা স্লেজে চড়ে উত্তর মেরু থেকে শিশুদের জন্য উপহার নিয়ে আসেন।
