দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতা এবং দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটির পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী পদের অন্যতম প্রধান দাবিদার তারেক রহমান বৃহস্পতিবার ঢাকা ফিরেছেন। তার এই প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে হাজার হাজার দলীয় সমর্থক তাঁকে এক বর্ণাঢ্য ও উষ্ণ অভ্যর্থনা জানায়।
বাংলাদেশের রাজনীতির ‘রাজপুত্র’ হিসেবে পরিচিত তারেক রহমান তার স্ত্রী জুবাইদা রহমান এবং মেয়ে জাইমা রহমানের সঙ্গে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। কড়া নিরাপত্তার মধ্যে তিনি যখন বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখেন, তখন তিনি ছিলেন খালি পায়ে।
তারেক রহমানের এই প্রতীকী পদচারণা ও স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দেশের রাজনীতির এক সন্ধিক্ষণে ঘটেছে, যা বিএনপির নেতাকর্মীদের জন্য বড় ধরনের এক অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করছে।
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। ইউনূস প্রশাসন আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছে, যার মাধ্যমে একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে।
তারেক রহমানের মা এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া গত ২৩ নভেম্বর থেকে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। বাংলাদেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপির কার্যত নেতা হিসেবে তারেক রহমান হয়তো খুব শিগগিরই দেশের শাসনভার গ্রহণ করতে যাচ্ছেন।
তারেক রহমান কে?

৬০ বছর বয়সী তারেক রহমান বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বড় ছেলে। ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়া দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন।
তারেক রহমান ২০০৮ সাল থেকে লন্ডনে বসবাস করছেন এবং ২০১৮ সাল থেকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর অসুস্থ মা রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলে কারারুদ্ধ হওয়ার পর থেকে তিনি দলের হাল ধরেন।
২০০১ থেকে ২০০৬ সালে তার মায়ের দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় থাকাকালীন তিনি একজন প্রভাবশালী জননেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। তবে সেই সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক সহিংসতার অভিযোগও উঠেছিল। ২০০৬ থেকে ২০০৯ সালের শুরু পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকা সামরিক সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার সেই অভিযোগগুলো নিয়ে তদন্ত করেছিল।
২০০৭ সালের মার্চ মাসে নাটকীয়ভাবে গভীর রাতে ঢাকার বাসভবন থেকে সেনাবাহিনী তাকে গ্রেপ্তার করে। কয়েক মাস পর তিনি জামিনে মুক্তি পান এবং চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান- এরপর থেকে বৃহস্পতিবারের আগ পর্যন্ত তিনি আর দেশে ফেরেননি।
তারেক রহমান এবং বিএনপি বরাবরই তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে বর্ণনা করেছে।
পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকার তাকে অর্থপাচার, জালিয়াতি এবং রাজনৈতিক সহিংসতার অভিযোগে অভিযুক্ত করে সাজা দেয়- যার মধ্যে ২০০৪ সালে শেখ হাসিনার সমাবেশে গ্রেনেড হামলার ঘটনাও ছিল, যাতে অন্তত ২০ জন নিহত হয়েছিল।

তবে ২০২৪ সালের আগস্টে হাসিনার পতনের পর তারেক রহমানের বিরুদ্ধে আনা এসব অভিযোগ ও সাজা স্থগিত বা বাতিল করা হয়েছে, যা তার ঢাকা ফেরার পথ সুগম করে দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার ঢাকার এক জনসভায় সমর্থকদের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, ১৯৭১ সালের মতো ২০২৪ সালেও সর্বস্তরের মানুষ একত্রে এই দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করেছে। তিনি ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং গত বছরের হাসিনা পতনের আন্দোলনের মধ্যে একটি যোগসূত্র স্থাপন করেন।
তিনি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের আহ্বান জানিয়ে বলেন, এখন আমাদের সবার মিলে দেশ গড়ার সময়। আমরা একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে চাই। বাংলাদেশে কোনো নারী, পুরুষ বা শিশু যে-ই হোক না কেন, তারা যেন নিরাপদে ঘর থেকে বের হতে পারে এবং নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারে।
কেন তিনি নির্বাসনে ছিলেন?

১৯৯১ সাল থেকে খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনা- পরস্পর বিরোধী দুটি রাজনৈতিক রাজবংশের এই দুই নারী নেত্রী তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে পর্যায়ক্রমে দেশ শাসন করেছেন।
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বদানকারী শেখ হাসিনা রাজনীতিতে আসেন তাঁর বাবা এবং বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর। ১৯৭৫ সালের আগস্টে এক সামরিক অভ্যুত্থানে শেখ মুজিব ও তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্য নিহত হন।
অন্যদিকে খালেদা জিয়ার উত্থান ঘটে তার স্বামী জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর, যিনি ছিলেন একজন সাবেক সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতি। ১৯৮১ সালের মে মাসে এক ব্যর্থ অভ্যুত্থানে তিনি নিহত হন।

আশির দশকের শেষের দিকে সামরিক শাসক জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের কাছ থেকে ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের জন্য এই দুই নেত্রী একজোট হয়েছিলেন। কিন্তু এরপর থেকে কয়েক দশক ধরে এই দুই দল রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেই থেকেছে।
২০০৯ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় ফেরার পর খালেদা জিয়ার বিএনপি দীর্ঘ সময় ধরে দমন-পীড়নের শিকার হয়। ২০০৭-০৮ সালের জরুরি অবস্থার সময় প্রায় ১৮ মাস বন্দি থাকার পর জামিনে মুক্তি পেয়ে ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে তারেক রহমান যুক্তরাজ্যে চলে যান।
তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনের গুরুত্ব কী?

দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনের পর গত বছর শেখ হাসিনা একটি জনপ্রিয় ছাত্র আন্দোলনের মুখে পড়েন। সরকারি চাকরিতে বিতর্কিত কোটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে শুরু হওয়া এই আন্দোলন পরবর্তীতে তাঁর শাসনের অবসান ঘটানোর এক বৃহত্তর দাবিতে রূপ নেয়। জাতিসংঘের মতে, এই আন্দোলনে প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হয়।
হাসিনার শাসনামলে হাজার হাজার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও সমালোচক গ্রেপ্তার, হত্যা, নির্যাতন বা গুমের শিকার হওয়ায় জনরোষ চরমে পৌঁছায়। ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনগুলো ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। অবশেষে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তিনি হেলিকপ্টারে করে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর বিক্ষোভকারীরা তাঁর বাসভবন দখল করে নেয়।
গত মাসে একটি ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে ছাত্র আন্দোলনে প্রাণঘাতী দমন-পীড়নের দায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছে। তাঁর দল আওয়ামী লীগকে ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়নি।
এদিকে অন্তর্বর্তীকালীন নেতা ড. ইউনূস গত জুন মাসে লন্ডন সফরকালে তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করেছিলেন।

এমন এক সময়ে তারেক রহমান দেশে ফিরেছেন যখন তার মা খালেদা জিয়া হাসপাতালে। কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, আওয়ামী লীগ বিহীন এই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এখন বিএনপি তাদের সেক্যুলার, উদার এবং মধ্যপন্থি অবস্থান দিয়ে দখল করার চেষ্টা করছে। এর প্রমাণ হিসেবে তারা জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বিএনপির সাম্প্রতিক দূরত্ব বা জোট ভাঙার বিষয়টি উল্লেখ করেন।
সাবেক মার্কিন কূটনীতিক জন ড্যানিলোভিচ, যিনি বাংলাদেশে দীর্ঘ আট বছর কাজ করেছেন, আল জাজিরাকে বলেন, তারেক রহমানের ফেরা হলো বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রস্তুতির শেষ ধাপ।
তিনি আরও যোগ করেন, নির্বাচনী প্রচারণার নেতৃত্ব দেওয়ার মাধ্যমে তারেক রহমান গত ১৭ বছরে দেশে কী কী পরিবর্তন এসেছে তা যেমন জানতে পারবেন, তেমনি বাংলাদেশিরাও বুঝতে পারবে এই দীর্ঘ সময়ে তিনি নিজে কতটা বদলেছেন।
আগামী নির্বাচনে বিএনপির অবস্থান কী?

আগামী নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদি তারা জয়ী হয়, তবে দীর্ঘ দুই দশক পর দলটি ক্ষমতায় ফিরবে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের (আইআরআই) ডিসেম্বরের একটি জরিপ অনুযায়ী, বিএনপি ৩০ শতাংশ সমর্থন নিয়ে শীর্ষে রয়েছে, এবং ২৬ শতাংশ সমর্থন নিয়ে জামায়াতে ইসলামী দ্বিতীয় স্থানে আছে।
অভ্যুত্থানের পর ছাত্রনেতাদের একটি অংশ নিয়ে গঠিত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) সাংগঠনিক দুর্বলতা ও তহবিলের অভাবে নির্বাচনী দৌড়ে পিছিয়ে আছে। আইআরআই-এর জরিপে তাদের সমর্থন মাত্র ছয় শতাংশ।
আওয়ামী লীগ নির্বাচনী লড়াইয়ের বাইরে থাকায় ইউনূস-পরবর্তী বাংলাদেশে তারেক রহমানের বিএনপির পথ এখন অনেকটাই সুগম।
ড্যানিলোভিচ মনে করেন, আগামী নির্বাচনে জয় পাওয়ার সব সম্ভাবনা বিএনপির হাতেই। তিনি বলেন, গত ১৭ বছরে দলটি প্রচণ্ড সহ্যশক্তির পরিচয় দিয়েছে; তারা ক্ষমতার বাইরে থেকেও রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের মুখে টিকে থেকেছে। তবে ফেরার পর তারেক রহমানকে তাঁর নিজের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের ভারও সামলাতে হবে।
ড্যানিলোভিচের মতে, তারেক রহমানের প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে তার নির্বাসনকালীন বিশ্বস্ত সহযোগীদের সঙ্গে দেশের মূল ধারার দলীয় কাঠামোর সমন্বয় করা, যা মূলত তার মায়ের হাতে তৈরি এবং যারা এই দীর্ঘ সময় ধরে দেশের মাটিতেই সংগ্রাম করেছে।
নিজভূমে মহাপ্রত্যাবর্তনের পর সপরিবারে নিজ বাসায় তারেক রহমান