১৯৮১ সালের ৩০ মে। একদল বিপথগামী সেনা কর্মকর্তার হাতে নির্মমভাবে নিহত হন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। সেই সময় ঘরোয়া পরিবেশে জীবন কাটানো এক সাধারণ গৃহবধূ ছিলেন খালেদা জিয়া। কিন্তু ইতিহাসের অমোঘ নিয়মে সেই গৃহবধূই হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের রাজনীতির এক অপরাজেয় শক্তি এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রধান সিপাহসালার।
গত ৩০ ডিসেম্বর সকালে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে তাঁর প্রয়াণের মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটলো বাংলাদেশের রাজনীতির এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের।
১৯৮২ সালে এইচ এম এরশাদ সামরিক শাসন জারি করলে বিএনপির অস্তিত্ব যখন সংকটের মুখে, ঠিক তখনই দলের হাল ধরেন খালেদা জিয়া। ১৯৮৩ সালের ৩ জানুয়ারি ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন তিনি এবং ১৯৮৪ সালের ১০ মে নির্বাচিত হন দলের চেয়ারপারসন। এরশাদবিরোধী দীর্ঘ আন্দোলনে তিনি ছিলেন রাজপথের অগ্রসেনানী। এই আন্দোলনের সময় ১৯৮৩, ১৯৮৪ এবং ১৯৮৭ সালে মোট তিনবার তিনি গৃহবন্দি হন। তাঁর আপসহীন লড়াইয়ের ফলেই ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারের পতন ঘটে।
১৯৯১ সালে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন বেগম খালেদা জিয়া। তাঁর এই মেয়াদেই দেশে পুনরায় সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা চালু হয়। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি স্বল্প মেয়াদে ক্ষমতায় থাকাকালে তাঁর হাত ধরেই সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়, যা বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে এক মাইলফলক। পরবর্তীতে ২০০১ সালে চারদলীয় জোট গঠন করে তিনি তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন।
বেগম জিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন শুধু ক্ষমতার মসনদেই সীমাবদ্ধ ছিলো না; তিনি পাঁচবার কারাবরণ করেছেন। ২০০৭ সালের এক-এগারোর সময় এক বছরেরও বেশি সময় বন্দি থাকার পর ২০০৮ সালে তিনি মুক্তি পান। তবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় শুরু হয় ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি।

তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের আমলে একটি বিতর্কিত ও প্রহসনের মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে তাঁকে নাজিমুদ্দিন রোডের পুরোনো কারাগারে যেতে হয়। দীর্ঘ দুই বছর কারাবন্দি থাকার পর ২০২০ সালে নির্বাহী আদেশে মুক্তি পেলেও কার্যত তিনি গৃহবন্দি এবং অসুস্থ অবস্থায় জীবন অতিবাহিত করেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের দিনই তিনি সম্পূর্ণ কারামুক্ত হন। অসুস্থ শরীর নিয়ে চিকিৎসার জন্য একবার লন্ডনে গেলেও শারীরিক প্রতিকূলতার কারণে রাজনীতিতে আর সক্রিয় হতে পারেননি। দীর্ঘ অসুস্থতার পর ৮০ বছর বয়সে ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর তিনি চিরবিদায় নেন।
গৃহবধূ থেকে প্রধানমন্ত্রী, কারাবরণ থেকে রাজপথের আপসহীন নেতৃত্ব- খালেদা জিয়ার জীবন বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং নারীর ক্ষমতায়নে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি নেই, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ ও সংগ্রামের ইতিহাস যুগে যুগে এদেশের মানুষের মনে অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
খালেদা জিয়ার জানাজা ও দাফন হবে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায়
খালেদা জিয়াকে নিয়ে তারেক রহমানের আবেগঘন পোস্ট