মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত এড়ানোর লক্ষ্যে আয়োজিত আসন্ন কূটনৈতিক বৈঠকের প্রাক্কালে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। মঙ্গলবার আরব সাগরে মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কনের দিকে অত্যন্ত ‘আক্রমণাত্মকভাবে’ ধেয়ে আসা একটি ইরানি ড্রোন গুলি করে ভূপাতিত করেছে মার্কিন বাহিনী। এর কয়েক ঘণ্টা পরই হরমুজ প্রণালিতে একটি মার্কিন বাণিজ্যিক ট্যাঙ্কারকে আটকের হুমকি দিয়েছে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের (আইআরজিসি) গানবোট।
ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স প্রথম এই ঘটনার খবরটি জানায়। পরে মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন-সহ বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যম থেকে দুই দেশের এই সামরিক উত্তেজনার খবর নিশ্চিত করেছে।
এমন এক সময়ে এই ঘটনাটি ঘটল যখন কূটনীতিকরা ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পারমাণবিক আলোচনার পথ প্রশস্ত করার চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ইরানের উপকূলের দিকে মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো অগ্রসর হওয়ায় যদি কোনো চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব না হয়, তবে ‘খারাপ কিছু’ ঘটার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। ড্রোন ভূপাতিত হওয়ার খবরের পরপরই বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলে এক ডলারের বেশি বেড়েছে।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স জানান, দক্ষিণ ইরান উপকূল থেকে প্রায় ৫০০ মাইল দূরে আন্তর্জাতিক জলসীমায় অবস্থানরত রণতরি আব্রাহাম লিঙ্কনের দিকে একটি ইরানি ড্রোন ধেয়ে আসছিল। মার্কিন বাহিনী পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করলেও ড্রোনটি এগিয়ে আসতে থাকে। শেষ পর্যন্ত রণতরি ও এর কর্মীদের নিরাপত্তায় একটি যুদ্ধবিমান থেকে ড্রোনটি গুলি করে ভূপাতিত করা হয়।
অন্যদিকে, ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা- তাসনিম জানিয়েছে, আরব সাগরের আন্তর্জাতিক জলসীমায় নজরদারি ও ছবি তোলার মিশনে থাকা একটি ড্রোনের সাথে তাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। তবে ড্রোনটি হারিয়ে যাবার আগে কমান্ড সেন্টারে সব ফুটেজ পাঠাতে পেরেছে দাবি করেছে তেহরান।
রয়টার্স জানায়, মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরানের শাহেদ-১৩৯ মডেলের একটি ড্রোন অস্পষ্ট উদ্দেশ্যে রণতরিটির দিকে উড়ছিল এবং পরে মার্কিন যুদ্ধবিমান এফ-৩৫ থেকে সেটিকে গুলি করা হয়। সেন্টকমের মুখপাত্র নেভি ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স বলেন, নিজেদের প্রতিরক্ষা এবং আব্রাহাম লিঙ্কনের ক্রু-সদস্যদের নিরাপত্তার স্বার্থে একটি এফ-৩৫সি যুদ্ধবিমান ওই ইরানি ড্রোনটি ভূপাতিত করেছে।

ড্রোন ভূপাতিত করার কয়েক ঘণ্টা পর পারস্য উপসাগরের প্রবেশদ্বার হরমুজ প্রণালিতে দ্বিতীয় উত্তেজনাপূর্ণ ঘটনাটি ঘটে। মার্কিন পতাকাবাহী কেমিক্যাল ট্যাঙ্কার এমভি স্টেনা ইম্পারেটিভকে ঘিরে ধরে ইরানের দুটি গানবোট এবং মাথার ওপর দিয়ে উড়তে থাকে একটি ইরানি ‘মোহাজের’ ড্রোন।
ইরানি পক্ষ থেকে রেডিও বার্তার মাধ্যমে ট্যাঙ্কারটিকে থামানোর এবং জব্দ করার হুমকি দেওয়া হয়। খবর পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে মার্কিন ডেস্ট্রয়ার 'ইউএসএস ম্যাকফল' এবং মার্কিন বিমান বাহিনীর যুদ্ধবিমান সেখানে পৌঁছালে ইরানি বাহিনী পিছু হটে এবং পরিস্থিতি শান্ত হয়।
হকিন্স জানান, আইআরজিসির দুটি বোট এবং একটি মোহাজের ড্রোন অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ট্যাঙ্কারটির কাছে চলে আসে এবং সেটিকে জব্দ করার হুমকি দেয়।
সামুদ্রিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সংস্থা ‘ভ্যানগার্ড’ জানিয়েছে, ইরানি বোটগুলো ট্যাঙ্কারটিকে ইঞ্জিন বন্ধ করে তল্লাশির জন্য প্রস্তুত হতে নির্দেশ দিয়েছিল। তবে নির্দেশ না মেনে ট্যাঙ্কারটি গতি বাড়িয়ে যাত্রা অব্যাহত রাখে। পরবর্তীতে ওই এলাকায় টহলরত মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ 'ম্যাকফল' এসে ট্যাঙ্কারটিকে নিরাপত্তা দিয়ে নিয়ে যায়। এর ফলে পরিস্থিতি শান্ত হয় এবং ট্যাঙ্কারটি বর্তমানে নিরাপদ রয়েছে।
কূটনৈতিক আলোচনায় অনিশ্চয়তা ও ইরানের নতুন শর্ত
আগামী শুক্রবার ইস্তাম্বুলে দুই দেশের মধ্যে যে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হওয়ার কথা ছিল, তাতে নতুন জটিলতা তৈরি হয়েছে। সূত্র মতে, ইরান এখন বৈঠকের স্থান পরিবর্তন করে ওমান করার দাবি জানাচ্ছে। এছাড়া তারা আলোচনার পরিধি কেবল পারমাণবিক ইস্যুতে সীমাবদ্ধ রাখতে চায় এবং আঞ্চলিক অন্য দেশগুলোর উপস্থিতি বর্জন করার অনুরোধ করেছে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা জ্যারেড কুশনার বর্তমানে ইসরাইলি কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনার জন্য ওই অঞ্চলে অবস্থান করছেন। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট জানিয়েছেন, বৈঠকগুলো এখনো নির্ধারিত আছে, তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতে সামরিক হামলার বিকল্পও খোলা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে এই অঞ্চলে তাদের সামরিক শক্তি বহুগুণ বৃদ্ধি করেছে। আব্রাহাম লিঙ্কন স্ট্রাইক গ্রুপের পাশাপাশি আরও তিনটি গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার এবং এফ-১৮ সুপার হর্নেট ও ইএ-১৮জি গ্রাউলার ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার জেট মোতায়েন করা হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সোমবার এক বক্তব্যে বলেন, আমরা এখন ইরানের সাথে কথা বলছি। যদি ভালো কোনো সমাধান আসে তবে তা চমৎকার, আর যদি না আসে তবে সম্ভবত খুব খারাপ কিছু ঘটবে।
সামরিক সংঘাত এড়াতে সরাসরি সংলাপে বসছে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র
এপস্টাইন ফাইলে কাঁপছে ব্রিটেনের রাজপ্রাসাদ থেকে পার্লামেন্ট