ভারতের মূল মনোযোগ এখন সক্ষমতা এবং অভিপ্রায়ের ওপর, বিশেষ করে বাংলাদেশের নতুন সরকার সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও অনুপ্রবেশের মতো বিষয়ে সহযোগিতা করবে কি না এবং দক্ষিণ এশিয়ায় ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় থাকবে কি না, সেদিকে।
১২ ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচন- ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সহিংসতা এবং শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনের অবসানের পর যা প্রথম, তা ভারতের কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে কোনো পরিবর্তন জাতীয় নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করে কি না, দিল্লি তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।
ভারতের দৃষ্টিভঙ্গিতে এখানে তিনটি আন্তঃসম্পর্কিত ইস্যু রয়েছে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হলো একটি সম্ভাব্য পাকিস্তান-চীন-বাংলাদেশ অক্ষ। যদি নতুন প্রশাসন দিল্লির প্রতি হাসিনার মতো বন্ধুভাবাপন্ন না হয়, তবে এই ত্রিভুজ জোট দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের প্রভাব দুর্বল করে দিতে পারে।
এছাড়া সীমান্ত ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে অবৈধ অনুপ্রবেশের বিষয়টি পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে চলা হিন্দু-বিদ্বেষী মনোভাব ও সহিংসতা ভারতের উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপট: হাসিনা ক্ষমতায় থাকাকালে দিল্লি ও ঢাকা অত্যন্ত স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রেখেছিল। আওয়ামী লীগ প্রধান, যিনি এই নির্বাচনে নিষিদ্ধ এবং মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি, একটি 'ভারত-বান্ধব' সরকার চালিয়েছিলেন, যা বাণিজ্য, যোগাযোগ, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং পানিবণ্টন চুক্তির ওপর গুরুত্ব দিয়েছিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা একমত, দিল্লি আওয়ামী লীগের মতো একটি বন্ধুভাবাপন্ন দলের সাথেই কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। তবে তারা ঢাকার ক্ষমতার এই পরিবর্তনকেও বাস্তবসম্মতভাবে দেখছে। তাই বিএনপি ক্ষমতায় এলে ভারত হয়তো খুব একটা বিচলিত হবে না, বিশেষ করে দলের বর্তমান প্রধান তারেক রহমান যখন আশ্বাস দিয়েছেন যে তাঁর প্রশাসন ভারতের স্বার্থকে সম্মান জানাবে।
পাকিস্তান-চীন যোগসূত্র: ভারতের জন্য উদ্বেগের বিষয় হলো জামায়াতে ইসলামীর বিজয় বা তাদের জোটে থাকা। এটি বাংলাদেশের নীতিকে পাকিস্তান ও চীনের দিকে ঝুঁকিয়ে দিতে পারে, যা ভারতকে একটি কৌশলগত ফাঁদে ফেলবে। হার্ডলাইনার দল জামায়াতে ইসলামী যদি ক্ষমতার সমীকরণে প্রবেশ করে, তবে বিএনপির সাথে ভারতের সম্পর্ক সামলানো জটিল হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশে চীনের পদচিহ্ন ইতিমধ্যেই স্পষ্ট। মোংলা বন্দরের আধুনিকায়নে বেইজিংয়ের বিশাল বিনিয়োগ এবং এর সামরিক ব্যবহারের সম্ভাবনা ভারতের জন্য বড় এক নিরাপত্তা ঝুঁকি। অন্যদিকে, ঢাকা যদি ইসলামাবাদের ঘনিষ্ঠ হয়, তবে বাংলাদেশ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অস্থিরতা সৃষ্টির জন্য পাকিস্তান-সমর্থিত সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর 'লঞ্চপ্যাড' হয়ে উঠতে পারে।
সীমান্ত ইস্যু: ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের রাজনীতিতে অনুপ্রবেশ একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ইস্যু। হাসিনা সরকারের পতনের পর গত কয়েকমাসে এক হাজারের বেশি অনুপ্রবেশের চেষ্টা রেকর্ড করা হয়েছে। ৪,১০০ কিলোমিটারের এই দীর্ঘ ও ঘনবসতিপূর্ণ সীমান্ত সুরক্ষিত রাখা দিল্লির জন্য এখন বড় অগ্রাধিকার।
হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা: হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনা ভারতে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাড়িঘর ও মন্দিরে প্রায় দুই হাজারের বেশি হামলার ঘটনা ঘটেছে। ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পর অন্তত ২৩ জন হিন্দু নিহত হয়েছেন। দিল্লি বারবার কূটনৈতিক চ্যানেলে সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা এবং দৃশ্যমান পুলিশিংয়ের দাবি জানিয়ে আসছে।
বাণিজ্য বিঘ্ন: ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ বার্ষিক ১৪ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় সুতার ৮০ শতাংশই আসে ভারত থেকে। কোনো প্রতিকূল সরকার যদি 'সরবরাহকারী বৈচিত্র্যকরণের' নামে চীনের দিকে ঝুঁকে পড়ে, তবে তা ভারতের রপ্তানি আয়ে বড় আঘাত হানবে। তবে অর্থনীতি পুনর্গঠনের স্বার্থে নতুন সরকার ভারতের সাথে বাণিজ্যিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখবে বলেই আশা করা যায়।
পরিশেষে: ভারতের মূল লক্ষ্য হলো এমন এক বাংলাদেশ, যারা সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে সহযোগিতা করবে এবং দক্ষিণ এশিয়ার শক্তিসাম্য রক্ষা করবে। দিল্লির জন্য আদর্শ পরিস্থিতি হলো ঢাকাকে শেখ হাসিনার আমলের মতো এক নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে পাওয়া, যারা চীন ও পাকিস্তানের প্রভাব ঠেকিয়ে ভারতের পূর্ব সীমান্তে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে।
নোট: এনডিটিভির সিনিয়র এডিটর চন্দ্রশেখর শ্রীনিবাসনের লেখা মন্তব্য প্রতিবেদনটি সামান্য পরিমার্জনসহ অনুবাদ করা হয়েছে।
ভোট দিলেন তিন বাহিনী প্রধান, চাইলেন দুর্নীতিমুক্ত দেশ
ভোটের পর নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশায় রাজনীতিবিদরা