ইরানের ওপর মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর ব্যাপক বিমান হামলার প্রথম দিনেই দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হয়েছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এমনটাই ঘোষণা করেছেন।
গত তিন দশক ধরে ইরান শাসন করা ৮৬ বছর বয়সী এই নেতার মৃত্যুর খবর পরবর্তীতে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনেও নিশ্চিত করা হয়েছে। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে ইরান এ পর্যন্ত মাত্র দুজন সর্বোচ্চ নেতা দেখেছে। ইরানের শাসন ব্যবস্থায় এটি একটি সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী পদ, সর্বোচ্চ নেতা একাধারে রাষ্ট্রপ্রধান এবং অভিজাত বিপ্লবী গার্ডসহ (আইআরজিসি) দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক।

খামেনি ঠিক একনায়ক ছিলেন না; বরং তিনি বিভিন্ন ক্ষমতার কেন্দ্রের এক জটিল বিন্যাসের কেন্দ্রে অবস্থান করতেন। তিনি যে কোনো জননীতিতে ভেটো দেওয়ার এবং সরকারি পদের জন্য প্রার্থী বাছাই করার ক্ষমতা রাখতেন। বর্তমান প্রজন্মের তরুণ ইরানিরা খামেনির নেতৃত্বহীন কোনো জীবন কখনো দেখেনি। ইরানের প্রতিটি জনপদে, বিলবোর্ডে এবং দোকানে তাঁর ছবি ছিল সর্বত্র। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের প্রেসিডেন্টরা প্রায়ই পাদপ্রদীপের আলোয় থাকলেও, দেশের ভেতর মূলত কলকাঠি নাড়তেন খামেনিই। এমন সহিংস পরিস্থিতিতে তাঁর মৃত্যু ইরান ও পুরো অঞ্চলের জন্য এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

শৈশব ও রাজনৈতিক উত্থান
আলি খামেনি ১৯৩৯ সালে উত্তর-পূর্ব ইরানের মাশহাদ শহরে এক ধর্মপ্রাণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন আট ভাইবোনের মধ্যে দ্বিতীয়। তাঁর বাবা ছিলেন একজন মাঝারি সারির শিয়া ধর্মগুরু। খামেনি প্রায়ই তাঁর ‘দরিদ্র কিন্তু ধার্মিক’ শৈশবের কথা স্মরণ করে বলতেন, অনেক সময় তাঁর খাবারের তালিকায় শুধু রুটি আর কিশমিশ জুটত। ১১ বছর বয়সেই তিনি ধর্মগুরু হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন। তবে তৎকালীন অনেক ধর্মীয় নেতার মতো তাঁর কাজ ছিল আধ্যাত্মিকতার পাশাপাশি রাজনৈতিক।
একজন দক্ষ বাগ্মী হিসেবে খামেনি ইরানের তৎকালীন রাজা বা শাহ’র সমালোচকদের সাথে যোগ দেন। এ কারণে তাঁকে অনেক বছর আত্মগোপনে থাকতে হয়েছে এবং ছয়বার গ্রেপ্তার হয়ে কারাবরণ ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর, নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি তাঁকে তেহরানের জুমার নামাজের ইমাম নিযুক্ত করেন, যা তাঁকে দেশের নতুন নেতৃত্বের অন্যতম মুখ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

মার্কিন বিরোধিতা ও ক্ষমতার সিঁড়ি
বিপ্লবের পর মার্কিন দূতাবাসে জিম্মি সংকটের সময় খামেনি সেই উগ্রপন্থী ছাত্রদের সমর্থন দিয়েছিলেন। ৪৪৪ দিনের সেই জিম্মি দশা ইরানের সাথে আমেরিকার সম্পর্কের চিরস্থায়ী ফাটল ধরিয়ে দেয় এবং ইরানকে এক দীর্ঘস্থায়ী আন্তর্জাতিক একাকীত্বের পথে ঠেলে দেয়। ১৯৮১ সালে এক হত্যাচেষ্টায় তিনি গুরুতর আহত হন এবং তাঁর ডান হাতটি চিরতরে অচল হয়ে যায়। একই বছর প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ-আলি রাজাই নিহত হওয়ার পর খামেনি ৯৭ শতাংশ ভোট পেয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।

যুদ্ধকালীন নেতা ও সর্বোচ্চ ক্ষমতা
প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন তিনি ইরান-ইরাক যুদ্ধের মোকাবিলা করেন। দীর্ঘ আট বছরের সেই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে তিনি নিজেই অনেক সময় সম্মুখ সমরে উপস্থিত থাকতেন। ইরাকের রাসায়নিক হামলা এবং পশ্চিমা দেশগুলোর সাদ্দাম হোসেনকে সমর্থন দেওয়ার ঘটনাটি পশ্চিমাদের প্রতি তাঁর আজীবন অনাস্থার জন্ম দেয়। ১৯৮৯ সালে খোমেনির মৃত্যুর পর বিশেষজ্ঞ পরিষদ খামেনিকে পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচন করে। যদিও ধর্মীয় পাণ্ডিত্যে তাঁর অবস্থান নিয়ে কিছুটা বিতর্ক ছিল, কিন্তু তিনি অত্যন্ত কৌশলে সংসদ, বিচার বিভাগ, পুলিশ ও বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর মধ্যে নিজের অনুগতদের একটি শক্তিশালী বলয় তৈরি করেন।

অভ্যন্তরীণ শাসন ও চ্যালেঞ্জ
খামেনি তাঁর ৩০ বছরেরও বেশি সময়ের শাসনামলে যেকোনো অভ্যন্তরীণ বিরোধ কঠোরভাবে দমন করেছেন। ১৯৯৯ সালের ছাত্র আন্দোলন, ২০০৯ সালের নির্বাচনের পরবর্তী বিক্ষোভ এবং ২০১৯ সালে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি নিয়ে আন্দোলন, প্রতিটি ক্ষেত্রেই ইন্টারনেট বন্ধ করে বা সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে বিক্ষোভকারীদের থামানো হয়েছে। যদিও তিনি নারী শিক্ষার প্রসারে কাজ করেছেন, কিন্তু লিঙ্গ সমতায় বিশ্বাসী ছিলেন না। হিজাব বিরোধী আন্দোলনে যুক্ত নারীদের তিনি কঠোর শাস্তির আওতায় এনেছেন। ২০২২ সালে মাহসা আমিনীর মৃত্যুর পর ইরান এক বিশাল জনরোষের মুখে পড়ে, যেখানে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে কয়েকশ মানুষ নিহত হয়।

পরমাণু সংকট ও শেষ অধ্যায়
আন্তর্জাতিকভাবে খামেনি ইরানকে এক একঘরে রাষ্ট্রে পরিণত করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁর শাসনামলে পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ইসরায়েল ও পশ্চিমাদের সাথে ইরানের তীব্র দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। ২০১৫ সালে একটি পরমাণু চুক্তি হলেও ২০১৮ সালে ট্রাম্প তা বাতিল করে ইরানের ওপর পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। ২০২০ সালে কাসেম সোলাইমানির হত্যাকাণ্ড পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তোলে।
২০২৫ সালের জুনে ইসরাইল ইরানের পরমাণু স্থাপনায় হামলা চালালে ইরানও পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ধসে পড়া অর্থনীতির জেরে ইরানে ব্যাপক জনবিক্ষোভ শুরু হয়, যা খামেনি অত্যন্ত নির্মমভাবে দমন করেন। এতে কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়। ট্রাম্পের পরমাণু চুক্তি সংক্রান্ত আল্টিমেটাম সত্ত্বেও খামেনি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করতে অস্বীকার করেন এবং সতর্ক করেন যে যুদ্ধ শুরু হলে তা পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে।
আলি খামেনি অত্যন্ত শক্ত হাতে ইরানের ক্ষমতার লাগাম ধরে রেখেছিলেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত কঠোর নিয়ম-কানুনের অধীনেই এখন ইরান শাসিত হচ্ছে। তাঁর এই আকস্মিক প্রস্থানের পর কে হবেন পরবর্তী উত্তরসূরি এবং দেশটিতে কী ধরনের পরিবর্তন আসবে, তা নিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে চলছে গভীর জল্পনা।
তথ্যসূত্র: বিবিসি
