যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ সামরিক অভিযানের ষষ্ঠ দিনে এসে ইরানসহ গোটা মধ্যপ্রাচ্য এক ভয়াবহ অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়েছে। পারস্য উপসাগর থেকে শুরু করে লেবানন, ইরাক এবং এমনকি ভারত মহাসাগর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে যুদ্ধের আঁচ। একদিকে ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি চরম বিপর্যয়ের মুখে, অন্যদিকে বৈশ্বিক নৌ-বাণিজ্য ও কূটনীতিতে নেমে এসেছে গভীর সংকট।

ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি: গত পাঁচ দিনের টানা হামলায় ইরানে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১,০৪৫ জনে দাঁড়িয়েছে এবং আহত হয়েছেন ৬,০০০-এর বেশি মানুষ। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দাবি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হাসপাতাল, স্কুল, আবাসিক এলাকা এবং ঐতিহাসিক গোলেস্তান প্যালেস ও তেহরান গ্র্যান্ড বাজারের মতো ৩৩টি বেসামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে।

রাজনৈতিকভাবেও ইরান এক সন্ধিক্ষণে। দেশটির প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ছেলে মোতজবা খামেনেই এখন পরবর্তী শীর্ষ নেতা হবার দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে আছেন বলে জানা গেছে। শক্তিশালী রেভল্যুশনারি গার্ডসের সাথে তার ঘনিষ্ঠতা এই জল্পনাকে আরও জোরালো করেছে।

যুদ্ধের নতুন ফ্রন্ট: যুদ্ধের পরিধি এখন কেবল মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বুধবার ভারত মহাসাগরে শ্রীলঙ্কা উপকূলের কাছে একটি মার্কিন সাবমেরিন টর্পেডো ছুড়ে ইরানের যুদ্ধজাহাজ 'আইরিস দেনা' ডুবিয়ে দিয়েছে। শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনী এখন পর্যন্ত ৮৭টি মরদেহ উদ্ধার করেছে।
এদিকে, ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সরকারের বিরুদ্ধে স্থল অভিযান শুরু করেছে। মার্কিন কর্মকর্তারা ইরাকি কুর্দিদের এই যুদ্ধে সরাসরি সহায়তার আহ্বান জানিয়েছেন এবং তারা বর্তমানে 'স্ট্যান্ডবাই' অবস্থানে রয়েছে।

হরমুজ প্রণালী: ইরানি রেভল্যুশনারি গার্ডস কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে। এর ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী ইরানের প্রেসিডেন্টকে আশ্বস্ত করেছেন, তারা তাদের ঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যবহার করতে দেবে না। এর প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পেনের সাথে সব ধরণের বাণিজ্য বন্ধের হুমকি দিয়েছেন।
উপসাগরীয় দেশগুলোতে উত্তেজনা: ইরানের পাল্টা ড্রোন ও মিসাইল হামলায় সৌদি আরব ও কাতারে অস্থিরতা বিরাজ করছে। রিয়াদে মার্কিন দূতাবাসে ড্রোন হামলার নিন্দা জানিয়েছে সৌদি আরব। কাতার তাদের দোহাস্থ মার্কিন দূতাবাসের নিকটবর্তী এলাকা থেকে নাগরিকদের সরিয়ে নিচ্ছে। কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আব্দুল রহমান আল থানি ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ফোন করে অবিলম্বে হামলা বন্ধের দাবি জানিয়েছেন এবং প্রতিবেশীদের এই যুদ্ধে টেনে না আনার আহ্বান জানিয়েছেন।

ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান: ইসরাইলি সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, তারা ইরানের সামরিক সক্ষমতার একটি বড় অংশ ধ্বংস করে দিয়েছে এবং এখন ইরানের আকাশে তাদের পূর্ণ আধিপত্য রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিকভাবে এই যুদ্ধ নিয়ে বিভক্তি দেখা দিয়েছে। মার্কিন সিনেট ট্রাম্প প্রশাসনের এই যুদ্ধের জন্য কংগ্রেসের অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা বাতিল করে দিয়েছে। তবে জনমত জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ২৫ শতাংশ মার্কিন নাগরিক এই যুদ্ধকে সমর্থন করছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন, আর দুই সপ্তাহ সময় দিলে ইরান পারমাণবিক বোমা বানিয়ে ফেলত, তাই এই হামলা জরুরি ছিল।
আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রভাব: বৈরুতসহ লেবাননের বিভিন্ন স্থানে ইসরাইল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে ভয়াবহ গোলাগুলি চলছে। ইরাকের এরবিল বিমানবন্দরের কাছেও ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে। ন্যাটোর বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তুরস্কের আকাশে একটি ইরানি ব্যালিস্টিক মিসাইল ভূপাতিত করেছে।
চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসরায়েলের সাথে কথা বলে অবিলম্বে এই সামরিক অভিযান বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। সার্বিকভাবে, মধ্যপ্রাচ্য এখন এক অনিয়ন্ত্রিত যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে, যার প্রভাব পড়ছে বিশ্ব অর্থনীতি ও নিরাপত্তার ওপর।
যুদ্ধ চাইনি, আত্মরক্ষায় বাধ্য হয়েছি: পেজেশকিয়ান