যুদ্ধ নামক বাস্তবতাকে হুটহাট করে শুরু বা বন্ধ করা যায় না, যা কি না মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের খেয়ালখুশি কিংবা ধসে পড়া বাজারকে সামাল দেয়ার হাতিয়ার হতে পারে না। ফলে ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্রে হামলার হুমকি স্থগিত করার পর, এখন মূল প্রশ্ন এটি নয় যে, ট্রাম্প আবারও পিছিয়ে এসেছেন কি না; বরং প্রশ্ন হলো- ট্রাম্প কি আদৌ এই যুদ্ধ থেকে বের হতে পারবেন, যদি তিনি চানও?
কয়েক দিনের বাগাড়ম্বরের পর সোমবার ট্রাম্প প্রথমবার উত্তেজনা প্রশমনের ইঙ্গিত দেন। তিনি দাবি করেন, ইরানের সাথে ফলপ্রসূ আলোচনায় ১৫টি বিষয়ে ঐক্যমত হয়েছে। যদিও তেহরান কোনো ধরনের আলোচনা বা সমঝোতার কথা সরাসরি অস্বীকার করেছে। বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে আশাবাদী ব্যাখ্যা হতে পারে এই যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়েই এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে সংঘাত আরও বাড়ালে তার চড়া মূল্য দিতে হবে, যা কারোরই কাম্য নয়। এমন উপলব্ধিই অনেক সময় যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটায়।

ট্রাম্প ইরানকে তাদের প্রধান তেল রপ্তানি পথ ‘হরমুজ প্রণালী’ খুলে দেয়ার আলটিমেটাম দিয়ে যুদ্ধের দ্বারপ্রান্ত পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিলেন। বিনিময়ে তেহরানও যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র উপসাগরীয় দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো জ্বালিয়ে দেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছিল।
এই সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দা ডেকে আনতে পারত এবং সেই ইরানি বেসামরিক নাগরিকদের মানবিক সংকট আরও বাড়িয়ে তুলত, যাদের সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি ট্রাম্প দিয়েছিলেন।
তবে এখনই কোনো বড় অগ্রগতির বিষয়ে সন্দিহান হওয়ার অনেক কারণ রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের অসংলগ্ন বক্তব্য এবং যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা না থাকায় মার্কিন বিবৃতির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এছাড়া শেয়ার বাজার ও তেলের দামের অস্থিরতা কমাতে ট্রাম্প এই পাঁচ দিনের বিরতি বা ‘পাঁচ দিনের যুদ্ধবিরতি’ দিয়েছেন কি না, তা নিয়েও সমালোচকরা সন্দিহান।

সোমবার ডাউ জোন্স এবং এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকের উত্থান এবং তেলের দাম ১১ শতাংশ কমে যাওয়া সেই সন্দেহের পালে হাওয়া দিচ্ছে।
ট্রাম্পের এই সময় নেয়ার পেছনে আরেকটি সামরিক কারণ থাকতে পারে। ইরানের তেল শিল্পের কেন্দ্রবিন্দু ‘খার্গ দ্বীপ’ বা উপকূলীয় অঞ্চল দখলের জন্য প্রয়োজনীয় মার্কিন নৌবাহিনী এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। জাপানে মোতায়েন করা একটি ইউনিট দ্রুত পৌঁছাতে পারলেও অন্যটি গত সপ্তাহেই শুধু রওনা হয়েছে।
পাশাপাশি ট্রাম্পের অস্থিতিশীল নেতৃত্ব এবং আজ যুদ্ধ কমানো তো ,কাল যুদ্ধের হুঙ্কার দেওয়ার চিরাচরিত স্বভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এটি তার ব্যক্তিগত জীবন ও ব্যবসায়িক ক্যারিয়ারের মতোই এক অনিশ্চিত খেলা, যেখানে তিনি প্রতিনিয়ত সংকটের মোকাবিলা করেন তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। তবে পারস্য উপসাগরের এই বাস্তবতায় তার এই পদ্ধতি চরম পরীক্ষার সম্মুখীন হতে পারে।

যুদ্ধ চতুর্থ সপ্তাহে পদার্পণ করলেও ইরান এখনো বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি করে রাখার ক্ষমতা রাখে। যদিও তারা মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তবুও তাদের সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যু এবং ক্রমাগত মিসাইল হামলার পর তারা ট্রাম্পের শর্তে নতি স্বীকার করবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইল ত্যাগের যে শর্ত ট্রাম্প দিয়েছেন, তা কোনো বিদ্রোহী দেশের পক্ষে মেনে নেওয়া কঠিন।
যদি আলোচনা শুরুও হয়, তবে ইরানের পক্ষে কে কথা বলবেন তা পরিষ্কার নয়। কারণ দেশটির ক্ষমতা এখন বিকেন্দ্রীভূত এবং অনেক শীর্ষ নেতা নিহত হয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এখন পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকে, তবে তারা আগের চেয়েও কঠোর অবস্থান নিতে পারে।
পরিশেষে, ট্রাম্পের সামনে এখন খুব কম বিকল্পই খোলা আছে এবং যার প্রতিটিই ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি চাইলে হামলা জোরদার করতে পারেন, কিন্তু তাতে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না। তিনি পদাতিক সৈন্য পাঠাতে পারেন, যা হবে তার নিজের 'চিরস্থায়ী যুদ্ধবিরোধী' অবস্থানের পরিপন্থী।

আবার কোনো সত্যিকারের জয় ছাড়াই নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করে যুদ্ধ থেকে সরে আসা সহজ মনে হলেও, তা মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের এক ক্ষুব্ধ ও শক্তিশালী ইরানের সামনে অসহায় করে ফেলবে। মার্কিন প্রেসিডেন্টরা প্রায়ই কঠিন সংকটের মুখোমুখি হন, কিন্তু ট্রাম্প নিজের তৈরি করা এই ইরানি ফাঁদে যেভাবে আটকা পড়েছেন, এমন পরিস্থিতি সচরাচর দেখা যায় না।
