পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ঘনীভূত হওয়া যুদ্ধের মেঘ কাটার লক্ষণ তো নেই-ই, বরং বুধবার ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে নতুন করে পাল্টাপাল্টি আকাশ হামলা বিনিময়ের ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। একদিকে যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করছেন, ইরানের সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনা চলছে, তখন অন্যদিকে ইরানের সামরিক কমান্ড এই দাবিকে শুধুই ‘ভুয়া’ এবং ‘নিজেদের সঙ্গে নিজেরা কথা বলা’ হিসেবে অভিহিত করে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে।

বুধবার ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেশটির যৌথ সামরিক কমান্ডের মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাকারি অত্যন্ত কড়া ভাষায় বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কি এখন নিজের সাথেই নিজে আলোচনা করার পর্যায়ে পৌঁছে গেছেন? আমাদের মতো মানুষ আপনাদের মতো মানুষের সাথে কখনোই আপস করবে না। তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, গত দুই বছরে উচ্চপর্যায়ের আলোচনার মাঝপথেই ওয়াশিংটন দুবার ইরানে হামলা চালিয়েছে, যার ফলে আমেরিকার কূটনীতির ওপর তেহরান আর কোনো ভরসা রাখতে পারছে না।

এদিকে যুদ্ধের ময়দানে কোনো বিরতি দেখা যাচ্ছে না। বুধবারও ইসরাইল তেহরানের বিভিন্ন অবকাঠামো লক্ষ্য করে একের পর এক বিমান হামলা চালিয়েছে। ইসরাইলি বাহিনীর দাবি, তারা তেহরানে দুটি নেভাল ক্রুজ মিসাইল উৎপাদন কেন্দ্র ধ্বংস করেছে।ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা এসএনএন জানিয়েছে, এই হামলায় একটি আবাসিক এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপের নিচে তল্লাশি চালাচ্ছে।
পাল্টা জবাবে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী তেল আবিব ও কিরিয়াত শমোনা ছাড়াও কুয়েত, জর্ডান ও বাহরাইনের মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে নতুন দফায় আক্রমণ চালিয়েছে। কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি তেলের ট্যাঙ্কারে ড্রোনের আঘাতে আগুনের খবর পাওয়া গেছে।

আমেরিকার দেয়া ১৫ দফা প্রস্তাব
আলোচনার গুঞ্জনের নেপথ্যে উঠে এসেছে ১৫ দফা সংবলিত একটি মার্কিন প্রস্তাবের কথা। নিউইয়র্ক টাইমস ও ইসরাইলি চ্যানেল টুয়েলভ-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, আমেরিকা এক মাসের যুদ্ধবিরতির বিনিময়ে একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছে। এই প্রস্তাবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করা, হিজবুল্লাহর মতো গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তা দেয়া বন্ধ করা এবং গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেয়ার শর্ত রয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ এখন চতুর্থ সপ্তাহে পদার্পণ করেছে। হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে ইতিহাসের ভয়াবহতম জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে।

বিশেষ করে এশীয় দেশগুলো, যারা এই পথে ৮০ শতাংশের বেশি অপরিশোধিত তেল আমদানি করে, তারা এখন চরম সংকটে। জ্বালানি সাশ্রয়ে অনেক দেশ ইতিমধ্যে স্কুল বন্ধ রাখা এবং বাড়ি থেকে কাজ করার মতো জরুরি পদক্ষেপ নিয়েছে। সংকট সামাল দিতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা তাদের কৌশলগত মজুদ থেকে ৪০ কোটি ব্যারেল তেল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
কূটনৈতিক ফ্রন্টে পাকিস্তান এই যুদ্ধ অবসানে আলোচনার আয়োজক হওয়ার প্রস্তাব দিলেও পেন্টাগনের প্রস্তুতি বলছে অন্য কথা। ওয়াশিংটন আরও কয়েক হাজার এলিট সেনা মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানোর পরিকল্পনা করছে, যা এই অঞ্চলে আগে থেকে মোতায়েন থাকা ৫০ হাজার মার্কিন সেনার শক্তিকে আরও বৃদ্ধি করবে। ফলে আলোচনা না কি আরও বড় সংঘাত- পারস্য উপসাগরের ভবিষ্যৎ এখন এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স, আল জাজিরা, বিবিসি
