একটি ফুটফুটে সুস্থ সন্তানের অপেক্ষায় প্রহর গুনছিলেন মা লিজা আক্তার। কিন্তু গত ২২ এপ্রিল রাতে যখন অস্ত্রোপচারের পর তার সন্তান পৃথিবীর আলো দেখলো, তখন দেখা গেলো এক রূঢ় বাস্তবতা—নবজাতকটির দুই পা ও এক হাত নেই। এই শারীরিক অপূর্ণতা মেনে নিতে পারেননি জন্মদাতা পিতা। নিষ্ঠুরভাবে নির্দেশ দিয়েছেন সন্তানকে ‘ফেলে আসার’। তবে পৃথিবীর সব নিষ্ঠুরতাকে হার মানিয়ে সেই তিন অঙ্গহীন সন্তানকেই পরম মমতায় বুকে টেনে নিয়েছেন মা।
পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার মিয়ারহাট বন্দরের ‘নিউ সততা প্রাইভেট হাসপাতালে’ ঘটে যাওয়া এই ঘটনা এখন মানুষের মুখে মুখে। একদিকে জন্মদাতার চরম নির্মমতা, অন্যদিকে এক জননীর অটল পাহাড়সম ধৈর্য ও ভালোবাসা—এই দুইয়ের বৈপরীত্যে স্তম্ভিত স্থানীয়রা।
নাজিরপুর উপজেলার কলারদোয়ানিয়া গ্রামের দিনমজুর আল আমীনের স্ত্রী লিজা আক্তার। দিনমজুরি করে অভাবের সংসারে এটি ছিরো তাদের তৃতীয় সন্তান। সিজারের পর যখন জানা গেলো শিশুটি শারীরিক প্রতিবন্ধী, তখন আল আমীন সাফ জানিয়ে দেন, এই সন্তান তিনি গ্রহণ করবেন না। হয় একে কোথাও দিয়ে দিতে হবে, না হয় ফেলে আসতে হবে।
স্বামীর এই অমানবিক নির্দেশে ভেঙে পড়লেও পিছপা হননি লিজা। হাসপাতালের বেডে শুয়ে চোখের জল মুছতে মুছতে তিনি বলেন, আমার সন্তান অন্য দশটা শিশুর মতো স্বাভাবিক হাত-পা নিয়ে জন্মায়নি বলে স্বামী তাকে ফেলে দিতে বলছে। কিন্তু আমি তো মা। স্বামী আমাকে ঘরে না তুললেও আমি আমার এই সন্তানকে ছাড়বো না। আমি তাকে ঘাম ঝরিয়ে মানুষ করবো।

লিজা আক্তারের এই সংগ্রাম ও মানবিক অবস্থা দেখে পাশে দাঁড়িয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। নিউ সততা প্রাইভেট হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. গোলাম মোস্তফা সিজারিয়ান অপারেশনসহ সব চিকিৎসা ব্যয় মওকুফ করে দিয়েছেন। এমনকি অস্ত্রোপচারকারী সার্জন ডা. প্রীতিষ বিশ্বাসও নিজের পারিশ্রমিক নেননি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এই মহানুভবতা লিজাকে এক বড়ো শক্তি জুগিয়েছে।
অপারেশন পরিচালনাকারী চিকিৎসক ডা. প্রীতিষ বিশ্বাস বলেন, জিনগত কারণ বা গর্ভাবস্থায় সচেতনতার অভাবে এমনটা হতে পারে। আমরা মানবিক দিক বিবেচনা করে মা ও শিশুর পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছি।
লিজা আক্তার অভাবী মানুষ। ঢাকায় দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালান। তার বড়ো দুটি সন্তান রয়েছে। এই পঙ্গু সন্তানকে নিয়ে তিনি জীবন যুদ্ধে নামতে প্রস্তুত হলেও একটি শঙ্কা তাকে তাড়া করে ফিরছে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, আমি যতোদিন বেঁচে আছি, কাজ করে একে খাওয়াবো। কিন্তু আমি মরে গেলে এই অঙ্গহীন সন্তানকে কে দেখবে? এই চিন্তায় বুক ফেটে যায়।
লিজা বলেন, সমাজের কোনো সহৃদয়বান ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি তার এই অসহায় সন্তানের পাশে দাঁড়ায়, তবে তার এই লড়াই কিছুটা সহজ হবে।
পিতার মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার পর এখন কেবল মায়ের মমতার আঁচলই এই শিশুর একমাত্র আশ্রয়। লিজা এখন সেই পরম আশ্রয় নিয়েই বাড়ি ফেরার অপেক্ষায়।
