ব্রাজিল দলের ডাগআউটে কার্লো আনচেলত্তির আসা মানেই এক নতুন ট্যাকটিক্যাল বিপ্লবের আভাস। তবে বিশ্বকাপ শুরুর মাসখানেক আগে ইতালিয়ান এই মাস্টারমাইন্ড মনে করছেন, ব্রাজিলের মূল সমস্যা প্রতিভার অভাব নয়, বরং অতিরিক্ত মানসিক চাপ।
তাঁর মতে, মাঠে একটি ভুল পাসকেও যখন খেলোয়াড়রা ‘জাতীয় বিপর্যয়’ হিসেবে গণ্য করেন, তখনই ছন্দ পতন ঘটে। মঙ্গলবার রিও ডি জেনেইরোতে ব্রাজিলীয় ফুটবল ফেডারেশনের সদর দপ্তরে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আনচেলত্তি সেলেসাওদের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসার পরামর্শ দেন।

আনচেলত্তি লক্ষ্য করেছেন, ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড়রা নিজেদের ওপর অনেক বেশি প্রত্যাশার চাপ চাপিয়ে দেন। তিনি বলেন, আমি দেখেছি বন্ধুপ্রতিম ম্যাচেও সতীর্থের একটি ভুলকে খেলোয়াড়রা ট্র্যাজেডি মনে করেন। এই অতিরিক্ত উদ্বেগ তাদের সহজাত সৃজনশীলতা ও প্রাণশক্তিকে কমিয়ে দেয়। এই চাপ সামলানোর উপায় হিসেবে তিনি সতীর্থদের মধ্যে দায়বদ্ধতা ভাগ করে নেয়ার ওপর জোর দিয়েছেন।
মজার ব্যাপার হলো, ব্রাজিল ফুটবলকে বদলে দেওয়ার রসদ আনচেলত্তি মাঠের বাইরে খুঁজে পেয়েছেন। এ বছর জীবনের প্রথম ‘কার্নিভাল’ উপভোগ করে তিনি মুগ্ধ। আনচেলত্তি বলেন, কার্নিভালের প্যারেডে আমি দেখেছি দারুণ আনন্দ আর শক্তির পাশাপাশি অবিশ্বাস্য শৃঙ্খলা ও নিখুঁত সময়জ্ঞান। নাচ-গান থেকে শুরু করে সব কিছুর পেছনে এক ধরণের দায়বদ্ধতা ছিল। আমি ঠিক এই জিনিসটাই জাতীয় দলে দেখতে চাই, আনন্দ, শক্তি এবং সুশৃঙ্খল পরিকল্পনা।

ব্রাজিল ফুটবল কি তার জৌলুস হারিয়েছে? আনচেলত্তি এই ধারণাটি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর মতে, ব্রাজিল এখনো বিশ্বের সবচেয়ে বেশি প্রতিভাবান ফুটবলার তৈরির কারখানা। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, আধুনিক ফুটবলে শুধু প্রতিভা দিয়ে জেতা সম্ভব নয়। এর সাথে প্রয়োজন তীব্র গতি ও দলীয় সংহতি।
আনচেলত্তির ভাষায়, প্রতিভাকে হারাতে হলে সংগঠনের প্রয়োজন। আমি মনে করি ব্রাজিলকে জয়ী হতে হলে সৃজনশীলতাকে শৃঙ্খলার ফ্রেম দিয়ে বাঁধতে হবে। প্রতিভা শেখানো যায় না, কিন্তু সংগঠন শেখানো যায়। তাঁর কাছে ‘জোগো বনিতো’ বা সুন্দর ফুটবল মানে শুধু ব্যক্তিগত পায়ের জাদু নয়, বরং দলীয়ভাবে কঠোর পরিশ্রম এবং বল পজেশনে থাকা অবস্থায় দলের দুর্দান্ত মনোভাব।

বিশ্বকাপে ব্রাজিলকে শিরোপার দৌড়ে অনেকে এগিয়ে না রাখলেও এতে মোটেও বিচলিত নন এই অভিজ্ঞ কোচ। উল্টো ডার্ক হর্স হিসেবে টুর্নামেন্ট শুরু করাকেই পছন্দ করছেন তিনি। আনচেলত্তির মতে, এবারের বিশ্বকাপে কোনো দলই নিখুঁত নয় এবং প্রতিটি দলেরই নিজস্ব সমস্যা রয়েছে। তাঁর বিশ্বাস, যে দলটি সবচেয়ে বেশি স্থিতিস্থাপক হবে, তারাই বিশ্বকাপ জিতবে।
দীর্ঘ ২৪ বছরের ট্রফি খরা কাটাতে আনচেলত্তির মন্ত্র পরিষ্কার, ফুটবল বিশ্বে হারানো মর্যাদা ফিরে পাওয়ার একমাত্র পথ হলো বিশ্বকাপ জয়। আর সেই জয়ের জন্য তিনি ব্রাজিলিয়ানদের রক্তে থাকা কার্নিভালের আনন্দ আর ইউরোপীয় ঘরানার শৃঙ্খলাকে এক সুতোয় গাঁথতে বদ্ধপরিকর। বিশ্বকাপের মঞ্চে ‘নতুন’ ব্রাজিল কতটা ভয়ংকর হয়ে ওঠে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
