৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি ও হরমুজ খুলে দেয়ার খসড়া প্রস্তুত

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা চুক্তি

আপডেট : ২৪ মে ২০২৬, ০৯:০৩ পিএম

দীর্ঘদিনের বৈরিতা ও সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা কাটিয়ে একটি ঐতিহাসিক চুক্তির একেবারে দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান। মার্কিন প্রশাসনের এক শীর্ষ কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দুই দেশ একটি ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সই করতে যাচ্ছে।

এই চুক্তির আওতায় বিতর্কিত হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করা হবে, ইরান আন্তর্জাতিক বাজারে অবাধে তেল বিক্রির সুযোগ পাবে এবং বিনিময়ে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হবে।

এই সম্ভাব্য চুক্তিটি বৈশ্বিক রাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের যুদ্ধ এড়ানো সম্ভব হবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ বাড়ায় বিশ্ব অর্থনীতিতে জ্বালানির চাপ অনেকটাই কমে আসবে। তবে এই সাময়িক চুক্তিটি শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পের কঠোর পারমাণবিক শর্ত পূরণ করে একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তিতে রূপ নেবে কি না, তা নিয়ে এখনো কিছুটা অনিশ্চয়তা রয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসন এবং মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো ইঙ্গিত দিয়েছে, চুক্তিটি রোববারের মধ্যেই আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হতে পারে। তবে এটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি এবং শেষ মুহূর্তে যেকোনো পক্ষ পিছিয়ে গেলে তা ভেস্তেও যেতে পারে। ইরান সরকার এখনো এই খসড়ার বিস্তারিত নিশ্চিত না করলেও, তেহরানও ইঙ্গিত দিয়েছে যে তারা একটি চুক্তির খুব কাছাকাছি রয়েছে।


চুক্তিতে যা যা থাকছে:
খসড়া অনুযায়ী, দুই দেশ প্রথমে ৬০ দিনের জন্য একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করবে, যা পরবর্তীতে উভয়ের সম্মতিতে বাড়ানো যেতে পারে। এই ৬০ দিন সময়ে হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ টোল-মুক্ত বা শুল্কহীনভাবে খোলা থাকবে। এই জলপথ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজগুলো যাতে নিরাপদে ও অবাধে যাতায়াত করতে পারে, সেজন্য ইরান সেখানে তাদের পেতে রাখা সব সামুদ্রিক মাইন অপসারণ করতে রাজি হয়েছে। এর বিনিময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দরগুলোর ওপর থেকে তাদের অবরোধ তুলে নেবে এবং ইরানের তেল বিক্রির ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করবে।

মার্কিন কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, তেল বিক্রির সুযোগ পাওয়ায় ইরানের অর্থনীতি বড় ধরনের চাঙ্গা হবে, তবে এটি একই সাথে বিশ্ব তেলের বাজারেও বড় স্বস্তি দেবে। ট্রাম্পের স্পষ্ট নীতি হলো, কাজের বিনিময়ে ছাড়। অর্থাৎ, ইরান যত দ্রুত মাইন অপসারণ করে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করবে, মার্কিন অবরোধও তত দ্রুত তুলে নেয়া হবে। ইরান অবশ্য শুরুতেই তাদের ফ্রিজ বা অবরুদ্ধ থাকা তহবিল অবমুক্ত করার এবং স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছিল, কিন্তু মার্কিন পক্ষ স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, আগে ইরানকে মাঠপর্যায়ে বাস্তবসম্মত ছাড় দিতে হবে, তারপরই কেবল তা বিবেচনা করা হবে।


পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা:
সমঝোতা স্মারকের খসড়ায় ইরানের পক্ষ থেকে দুটি বড় প্রতিশ্রুতি রয়েছে, তারা কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না এবং তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি স্থগিত রাখা ও উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করবে।

মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরান ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে এই বিষয়ে মৌখিক প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে। ৬০ দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থেকে স্থায়ীভাবে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং আটকে থাকা তহবিল ফিরিয়ে দেয়ার বিষয়ে আলোচনা করতে রাজি হয়েছে।

তবে এই পদক্ষেপগুলো তখনই কার্যকর করা হবে, যখন একটি চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে এবং ইরান তা বাস্তবে মেনে চলছে কি না, তা যাচাই করা সম্ভব হবে। এছাড়া, সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা অতিরিক্ত মার্কিন সেনা এই ৬০ দিন অঞ্চলেই অবস্থান করবে এবং চূড়ান্ত চুক্তি হলেই কেবল তারা ফিরে যাবে।


ইসরাইল ও হিজবুল্লাহ প্রসঙ্গ:
এই চুক্তির একটি বড় চমক হলো, এর আওতায় লেবাননে ইসরায়েল এবং হিজবুল্লাহর মধ্যকার চলমান যুদ্ধও অবসান ঘটবে। তবে এই শর্তটি নিয়ে কিছুটা অস্বস্তিতে রয়েছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। শনিবার ট্রাম্পের সাথে এক ফোনালাপে তিনি চুক্তির এই দিকটি এবং অন্যান্য কিছু বিষয়ে তাঁর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

তবে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নেতানিয়াহু অত্যন্ত সম্মান ও আনুগত্য বজায় রেখেই তাঁর বক্তব্য তুলে ধরেছেন। মার্কিন পক্ষ স্পষ্ট করেছে যে এটি কোনো একপাক্ষিক যুদ্ধবিরতি হবে না। হিজবুল্লাহ যদি পুনরায় অস্ত্র সজ্জা বা নতুন করে হামলা চালানোর চেষ্টা করে, তবে ইসরায়েলকে তা প্রতিহত করার পূর্ণ অধিকার দেওয়া হবে। সহজ কথায়, হিজবুল্লাহ শান্ত থাকলে, ইসরা্লও শান্ত থাকবে।

মার্কিন কর্মকর্তা আরও মন্তব্য করেন, নেতানিয়াহুর নিজস্ব অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে, কিন্তু ট্রাম্পকে পুরো যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্ব অর্থনীতির স্বার্থের কথা চিন্তা করতে হচ্ছে।


যেভাবে সম্ভব হলো এই চুক্তি:
এই কূটনৈতিক সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ পর্দার আড়ালের প্রচেষ্টা। শনিবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বেশ কয়েকজন আরব ও মুসলিম দেশের নেতাদের সাথে একটি কনফারেন্স কলে কথা বলেন এবং তাঁরা সবাই এই চুক্তিকে সমর্থন জানান। এই নেতাদের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন জায়েদও ছিলেন।

এছাড়া সৌদি আরব, কাতার, মিশর, তুরস্ক এবং পাকিস্তানের শীর্ষ নেতারা এই কলে অংশ নেন, যাঁরা শুরু থেকেই মধ্যস্থতার চেষ্টায় যুক্ত ছিলেন। তবে এই পুরো প্রক্রিয়ায় প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে পাকিস্তান। দেশটির ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির গত শুক্র ও শনিবার নিজে তেহরানে অবস্থান করে চুক্তিটি চূড়ান্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অবশ্য গত কয়েকদিন ধরে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলেন—তিনি ইরানের ওপর বড় ধরনের সামরিক হামলা চালাবেন, নাকি কূটনীতির পথে হাঁটবেন। তবে শনিবার সন্ধ্যা নাগাদ তিনি কূটনৈতিক সমাধানের দিকেই চূড়ান্তভাবে ঝুঁকে পড়েন। হোয়াইট হাউস আশা করছে, আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ছোটখাটো মতবিরোধগুলো দূর করে আজই চুক্তির ঘোষণা আসবে।

তবে যুক্তরাষ্ট্র যদি মনে করে ইরান পারমাণবিক আলোচনা নিয়ে নাটক করছে, তবে এই চুক্তি ৬০ দিনও টিকবে না। অন্যদিকে, মার্কিন প্রশাসন বিশ্বাস করে, বর্তমান চরম অর্থনৈতিক সংকটের কারণে ইরান নিজেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং তাদের আটকে থাকা নগদ টাকা ফেরত পাওয়ার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তি করতে আগ্রহী হবে। ট্রাম্পের উপদেষ্টারা জানিয়েছেন, ইরান যদি পারমাণবিক শর্তগুলো মেনে চলে, তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের সাথে সম্পর্ক পুরোপুরি স্বাভাবিক করতে এবং দেশটির বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে বড় ধরনের সহযোগিতা করতেও প্রস্তুত আছেন।

তথসূত্র: অ্যাক্সিওস

এআরএস
দীর্ঘ সাড়ে চার বছরের রক্তাক্ত সংঘাতের পর রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয় পক্ষই শান্তি আলোচনার ক্ষেত্রে নতুন আশার ইঙ্গিত দিয়েছে। রাশিয়ার দূর প্রাচ্যে আয়োজিত এক অর্থনৈতিক ফোরামে ভাষণ দেয়ার সময় রুশ...
যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অর্থনৈতিক ও সামরিক অবরোধ স্বত্বেও অপরিশোধিত তেল বিক্রি থেকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছে ইরান। গত ২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শেষ হওয়া মাত্র ১১ দিনের ব্যবধানে দেশটির সরকারি...
মধ্যপ্রাচ্যে চরম উত্তেজনার আবহেই কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে মার্কিন ও বিদেশি বাহিনীর সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরানের সামরিক বাহিনী। একই সঙ্গে কুয়ে ভূখণ্ডে...
দক্ষিণ লেবাননের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলি আল-তাহের পাহাড়ি রিজ এলাকায় বড় ধরণের সামরিক অভিযান চালালে যুক্তরাষ্ট্রকে জোরালো পাল্টাহামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। তিন জন ঊর্ধ্বতন...
বিশ্বকাপ ফুটবলের মঞ্চে আলো ছড়ানো খেলোয়াড়দের ঘিরে বিশ্বজুড়ে সদ্য সমাপ্ত মধ্য বছরের ট্রান্সফার উইন্ডোতে রেকর্ড বাণিজ্য হয়েছে। ফুটবল সংস্থা ফিফা বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক এই...
প্রাকৃতিক আবহাওয়াগত প্রক্রিয়া হিসাবে পরিচিত 'এল নিনো'র প্রভাব বিশ্বজুড়ে দৃশ্যমান হতে শুরু করায় পৃথিবী চরম আবহাওয়ার এক বিপজ্জনক অঞ্চলে প্রবেশ করেছে বলে সতর্কবার্তা দিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব...
গভীর ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও বৈশ্বিক উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডা থেকে শত শত কোটি ডলার সমমূল্যের স্বর্ণের রিজার্ভ যুক্তরাজ্যে সরিয়ে নিয়েছে নেদারল্যান্ডস। বুধবার ডাচ সেন্ট্রাল ব্যাংক...
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের আরাধ্য ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শুভ জন্মতিথি ও জন্মাষ্টমী শুক্রবার। ন্যায়নীতি, সত্য ও সুন্দরকে প্রতিষ্ঠা এবং দুষ্টের দমন করে মানবজাতির কল্যাণের লক্ষ্যে ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের এই...
লোডিং...
সর্বশেষপঠিত

এলাকার খবর