ফুটবল ইতিহাসের মহাতারকা লিওনেল মেসিকে ছোটবেলায় মাত্র কয়েক বছর ট্রেনিং দিয়েই অবসরের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তাঁর শৈশবের কোচ এনরিকে ডোমিঙ্গুয়েজ। মাত্র ৪৫ বছর বয়সে কোচিং ছাড়ার পেছনে কোনো ক্ষোভ বা ব্যর্থতা ছিল না, ছিল এক চরম তৃপ্তি।
ডোমিঙ্গুয়েজের সোজাসাপ্টা কথা ছিল, বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়কে কোচিং করানোর পর ডাগ-আউটে দাঁড়িয়ে শেখানোর মতো আর কিছু অবশিষ্ট থাকে না। বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার হয়ে নিজের ক্যারিয়ারের রেকর্ড ষষ্ঠ বিশ্বকাপের মঞ্চে নামার জন্য যখন ‘এলএমটেন’ গা গরম করছেন, ঠিক তখনই তাঁর শৈশবের শহর রোজারিও থেকে উঠে এল এই মন ছুঁয়ে যাওয়া ও চটকদার গল্প।

প্যারানা নদীর তীরে অবস্থিত আর্জেন্টিনার এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে চার ভাইবোনের মধ্যে তৃতীয় সন্তান হিসেবে জন্ম নেন মেসি। রোজারিওর যে সাধারণ ‘লা বাজাদা’ পাড়ায় তিনি বড় হয়েছেন, তা এখন ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এক পবিত্র তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছে।
চার বছর আগে কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে সোনালী ট্রফি এনে দেওয়া এই রাজপুত্রের জীবনের গল্প আজ রোজারিওর প্রতিটি গলির দেয়ালে দেয়ালে বিশালাকার ম্যুরাল বা ছবির মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। তেমনই এক ম্যুরালে লেখা, ভিনগ্রহের বাসিন্দা, কিন্তু আমাদের পাড়ার ছেলে! মেসির পুরনো বাড়ির রেলিংয়ে ঝুলছে একটি কলম্বিয়ান পতাকা, যেখানে এক ভক্ত লিখে গেছেন, ‘লিও, তোমার শ্রেষ্ঠত্ব সব সীমানা ছাড়িয়ে গেছে। ফুটবল আর জাদুর জন্য তোমাকে ধন্যবাদ’।

মেসির ছোটবেলার বন্ধু ওয়াল্টার ব্যারেরা, যিনি মেসির বাড়ির ঠিক মোড়েই থাকতেন, শুনিয়েছেন এক মজার গল্প। স্কুলে যাওয়ার সময় একটু তাড়াহুড়ো হলেই এই দুই বন্ধু মিলে একটি মিলিটারি বেসের কাঁটাতারের বেড়া কেটে তৈরি করা শর্টকাট রাস্তা ব্যবহার করতেন। একবার তো এক পাহারাদার সৈনিক তাঁদের পেছনে তাড়া পর্যন্ত করেছিলেন! ব্যারেরা হেসে বলেন, আমরা একটু দুষ্টু আর দুরন্ত ছিলাম বটে, কিন্তু পচা ছেলে ছিলাম না।
ছোটবেলায় রাগবি, বেসবল থেকে শুরু করে ফুটভলি, সব খেলাতেই পা লাগাতেন দুই বন্ধু। কিন্তু মেসির ভাগ্য যে ফুটবলের সাথেই বাঁধা, তা প্রথম থেকেই স্পষ্ট ছিল। ব্যারেরা বলেন, আমরা জানতাম ও অনেক দূর যাবে, ও ছিল ফুটবলের জাদুকর। মাত্র ৫ বছর বয়সেই তাঁর অবিশ্বাস্য গতি আর পায়ের কাজের জন্য স্থানীয় ক্লাবে বিস্ময় তৈরি করেছিলেন মেসি।

কম উচ্চতার জন্য আদর করে তাঁর নাম দেওয়া হয়েছিল ‘লা পুলগা’ বা খুদে মাছি। এরপরই তিনি যোগ দেন রোজারিওর অন্যতম সেরা ক্লাব নিউয়েলস ওল্ড বয়েজের যুব একাডেমি ‘মালভিনাস আর্জেন্টিনা’য়, যে ক্লাবের মেসি আজও কট্টর সমর্থক।
নিউয়েলসেই মেসির সাথে দেখা হয় কোচ এনরিকে ডোমিঙ্গুয়েজের। বর্তমানে ৭২ বছর বয়সী এই প্রবীণ কোচ মেসির স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
তিনি বলেন, আমার কাছে মেসি ছিল ঈশ্বরের দেয়া এক উপহার। একদিন আমাকে একজন জিজ্ঞেস করেছিলেন, আজ যখন লিওকে খেলতে দেখেন, তখন আপনার শেখানো কোন টেকনিকটা তাঁর খেলায় খুঁজে পান? আমি বলেছিলাম, কিছুই না! কারণ তাঁকে শেখানোর মতো কিচ্ছু ছিল না। ও জন্ম থেকেই সব জানত। আজ মাঠে ও যা করে, ১২ বছর বয়সেই ও সেসব করত!

তবে মেসির এই মেসিময় হয়ে ওঠার পথটা মোটেও মসৃণ ছিল না। নিউয়েলসের আরেক কোচ আদ্রিয়ান কোরিয়া জানান, মেসির পরিবারকে তখন চরম আর্থিক অনটনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল। কারখানার শ্রমিক বাবা হোর্হে মেসি প্রায়ই কোচকে বলতেন, পকেটে গাড়ির তেল কেনার টাকা নেই বলে হয়তো ছেলেকে আজ অনুশীলনে পাঠাতে পারবেন না।
এর মধ্যেই হোর্হে এবং তাঁর স্ত্রী সেলিয়া মারিয়া জানতে পারেন, তাঁদের ছেলে এক হরমোনজনিত সমস্যায় ভুগছে, যা তাঁর ফুটবল ক্যারিয়ার ধ্বংস করে দিতে পারে। কোরিয়া বলেন, লিও তাঁর সমবয়সীদের চেয়ে ৪০ সেন্টিমিটার খাটো এবং ১৫ কেজি হালকা ছিল। একজন ফুটবলারের জন্য এটা মেনে নেওয়া কঠিন।
বার্সেলোনার সেই ঐতিহাসিক চুক্তি: শেষ পর্যন্ত মেসির প্রতিভা দেখে বার্সেলোনার বিখ্যাত যুব একাডেমি ‘লা মাসিয়া’ তাঁর চিকিৎসার সব খরচ বহন করতে রাজি হয়। ২০০০ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে মেসি স্পেনের বার্সেলোনায় পাড়ি জমান। কোরিয়া বলেন, ও জানত ও কী চায়। ও ফুটবলার হতে চেয়েছিল, বিশ্বের সেরা হতে চেয়েছিল। আর বাকিটা তো ইতিহাস!
