এক সময়ের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মিত্র মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে এবার চরম ধস নেমেছে। একটি ইতালীয় টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনে মেলোনি তাঁর সাথে একটি ছবি তোলার জন্য রীতিমতো ‘মিনতি বা ভিক্ষা’ করেছিলেন। ট্রাম্পের এমন মন্তব্যকে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট আখ্যা দিয়ে শুক্রবার তীব্র ক্ষোভ ও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন মেলোনি। একই সাথে পশ্চিমা বিশ্বের শত্রুদের প্রতি ট্রাম্প কেন এত নরম এবং দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত মিত্রদের প্রতি কেন এত আক্রমণাত্মক, তা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে কঠোর ভাষায় ধমক দিয়েছেন ইতালির প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী।

ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনের একটি ভিডিওতে মেলোনি ও ট্রাম্পকে একটি ছোট সোফায় পাশাপাশি বসে গভীর আলোচনায় মগ্ন থাকতে দেখা গেলেও, ট্রাম্প বিষয়টিকে শুধু মেলোনির প্রতি ‘দয়া দেখানো’ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। ইতালির ‘লা সেভেন’ টিভি চ্যানেলকে দেয়া এক সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ও (মেলোনি) সম্ভবত খুশি যে আমি ওর সাথে কথা বলেছি। আমার তো ওর সাথে কথা বলার কোনো দরকারই ছিল না। ও আমার সাথে একটা ছবি তোলার জন্য আক্ষরিক অর্থেই কাকুতি-মিনতি করছিল। ও এতটাই মরিয়া ছিল যে ,আমি ছবিটা তুলতামই না, কিন্তু ওর প্রতি মায়া-দয়া হওয়ায় আমি রাজি হয়েছিলাম।
ইউরোপীয় কূটনৈতিক সূত্রগুলো অবশ্য ভিন্ন কথা বলছে। তাদের মতে, জি-৭ সম্মেলনে মেলোনি ছিলেন অন্যতম জোরালো কণ্ঠস্বর, যিনি বেশ কয়েকটি নীতিগত বিষয়ে ট্রাম্পকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। ট্রাম্প যখন বারবার অভিযোগ করছিলেন যে পশ্চিমা মিত্ররা যুক্তরাষ্ট্রকে একলা ফেলে চলে গেছে, তখন মেলোনি ইউরোপের অবস্থান শক্তভাবে ডিফেন্ড করে ট্রাম্পকে মনে করিয়ে দেন যে মিত্ররা সবসময়ই ওয়াশিংটনের পাশে ছিল।

ট্রাম্পের এই মন্তব্যের জবাবে একটি ভিডিও বার্তা সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করে মেলোনি বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই বক্তব্য সম্পূর্ণ বানোয়াট এবং কাল্পনিক। আমি ফ্রাঙ্কলি স্তব্ধ। আমি জানি না কেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট তাঁর মিত্রদের সাথে এমন আচরণ করেন, যদিও এটি প্রথমবার নয়। এটি অত্যন্ত হতাশাজনক যে তিনি পশ্চিমা বিশ্ব এবং আমেরিকার শত্রুদের বিরুদ্ধে এমন দৃঢ়তা দেখাতে পারেন না, উল্টো সেসব দেশের একনায়ক ও নেতাদের সাথে অনেক বেশি তোষামোদিপূর্ণ আচরণ করেন। ট্রাম্পকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে মেলোনি আরও যোগ করেন, তাঁর একটি জিনিস মনে রাখা উচিত, আমি কিংবা ইতালি, কেউই কখনো কারও কাছে ভিক্ষা চায় না।

মেলোনির এই প্রতিক্রিয়ার পর এনবিসি নিউজকে দেওয়া আরেকটি সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প তাঁর সমালোচনা অব্যাহত রাখেন। ট্রাম্প বলেন, ও (মেলোনি) আমার মস্ত বড় ফ্যান ছিল। কিন্তু আমি এখন আর ওকে আমার ফ্যান হিসেবে চাই না। কারণ হরমুজ প্রণালীর সংকট এবং ন্যাটোর সামরিক জোটে ইতালি আমাদের পাশে থাকেনি। মূলত ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বা হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মার্কিন সামরিক অভিযানে অংশ নিতে ইতালি সহ ন্যাটোর ইউরোপীয় মিত্ররা অস্বীকৃতি জানানোতেই ক্ষিপ্ত হন ট্রাম্প।
মেলোনির সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তা এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আন্ডারসেক্রেটারি জিওভানবাত্তিস্তা ফাজ্জোলারি ট্রাম্পের এমন আচরণের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, ট্রাম্প ইচ্ছাকৃতভাবে নাকি নিজের অযোগ্যতার কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের ঐতিহাসিক সম্পর্ক ধ্বংস করছেন, তা স্পষ্ট নয়। তিনি তাঁর এই অনভিপ্রেত মন্তব্যের মাধ্যমে পুরো ইউরোপ মহাদেশে আমেরিকাকে একঘরে ও অপ্রিয় করে তুলেছেন, যা ইউরোপের চেয়ে বেশি যুক্তরাষ্ট্রেরই ক্ষতি করবে।

অথচ মেলোনি এক সময় ট্রাম্পের কট্টর সমর্থক ছিলেন এবং ২০২৫ সালে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রেসিডেন্ট অভিষেকের দিন একমাত্র ইউরোপীয় নেতা হিসেবে ওয়াশিংটনে সশরীরে হাজির ছিলেন। কিন্তু চলতি বছর ইরান যুদ্ধ নিয়ে পোপ লিওর শান্তিকামী বক্তব্যের ওপর ট্রাম্প যখন ক্ষোভ উগড়ে দেন, তখন মেলোনি পোপের পক্ষে দাঁড়িয়ে ট্রাম্পের সমালোচনা করেন। সেই থেকে শুরু হওয়া দুই ডানপন্থী নেতার ঠান্ডা লড়াই এবার ট্রাম্পের ‘ছবি-কাণ্ড’ এবং মেলোনির ‘এক চুলও ছাড় না দেয়ার’ জেদে রূপ নিল এক প্রকাশ্য কূটনৈতিক যুদ্ধে। এই ঘটনার জেরে আগামী সপ্তাহে ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানির পূর্বনির্ধারিত মার্কিন সফর বাতিল করা হয়েছে এবং মায়ামিতে অনুষ্ঠিতব্য ইউএস-ইতালি বিজনেস কনফারেন্সটিও স্থগিত ঘোষণা করেছে ইতালীয় দূতাবাস।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স
