পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার বাশবাড়িয়া ইউনিয়নের ‘বাঁশবাড়িয়া লঞ্চঘাট থেকে রকমান ব্যাপারী বাড়ি পর্যন্ত’ এক কিলোমিটার সড়কটি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) নথিপত্রে পিচঢালা পাকা) সড়ক। কাগজে-কলমে এটি পাকাকরণে দুইবার অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং গত এপ্রিলেও চূড়ান্ত বিল তোলা হয়েছে। তবে বাস্তবে এটি আজও হাঁটুসমান কাদা আর খানাখন্দে ভরা এক কাঁচা সড়ক। স্থানীদের ভাষ্য, এতো খরচের পরও কাগজের এক কিলোমিটার পাকা সড়কটি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অনুমোদিত এ সড়কের বরাদ্দ আত্মসাৎ ও অনিয়ম করে একজনকে খুশি করতে তার আত্মীয়ের বাড়ির সামনে একটি অনুমোদনহীন সড়ক তৈরি ও সংস্কার করেছে এলজিইডির অসাধু কর্মকর্তারা। সরেজমিনে অনুসন্ধানেও এমন অনিয়ম ও অর্থ তছরুপের সত্যতা মিলেছে।
দশমিনা উপজেলা এলজিইডি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, নথিতে ৫৭৮৫২৫১৩৩ নম্বর আইডিধারী এ সড়কটি ২০১০-১১ অর্থবছরে প্রায় ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রথমবার পাকাকরণ দেখানো হয়। পরবর্তীতে গ্রামীণ সড়ক সংস্কার (জিওবি-এম) প্রকল্পের আওতায় গত অর্থবছরে এটি সংস্কারে ৩৩ লাখ আট হাজার ৮৮৫ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে মেসার্স একতা এন্টারপ্রাইজ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দরপত্রের মাধ্যমে কাজটি পায়। এলজিইডির নথিপত্র অনুযায়ী, চলতি বছরের ২৩ মার্চ সংস্কারকাজ শেষ হয় এবং ২৭ এপ্রিল ঠিকাদারকে চূড়ান্ত বিল পরিশোধ করা হয়। কাজটি তদারক করেছিলেন দশমিনা এলজিইডির উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. লুৎফর রহমান। কিন্তু বাস্তবে সেই এক কিলোমিটার সড়কে কোনো কাজই হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, টানা ৪০ বছর ধরে সড়কটি কাঁচা অবস্থায় রয়েছে। বিকল্প পথ না থাকায় এই সড়ক দিয়েই প্রতিদিন চারটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীসহ তিন গ্রামের হাজার হাজার মানুষকে যাতায়াত করতে হয়। বর্ষা মৌসুমে হাঁটুসমান কাদার সৃষ্টি হওয়ায় কোনো যানবাহন চলতে পারে না। চরম দুর্ভোগ থেকে বাঁচতে স্থানীয়রা বিভিন্ন দপ্তরে ধরণা দিয়ে প্রকল্পটি পাস করিয়েছিলেন। কিন্তু দুইবার টাকা বরাদ্দ এলেও বাস্তবে কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, বাশঁবাড়িয়া লঞ্চঘাট থেকে রকমান ব্যাপারী বাড়ির সড়কের বরাদ্দ দিয়ে একই ইউনিয়নে ‘চাঁনমিয়া সিকদার সড়ক’ নামে ভিন্ন এক কিলোমিটার পিচঢালা পথ নির্মাণ করা হয়। অথচ এলজিইডির তালিকায় ওই চাঁনমিয়া সিকদার সড়কের কোনো অনুমোদন বা আইডি নম্বরই নেই। চাঁনমিয়া সিকদার কোনো এক বিশেষ কারণে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে প্রকৌশলীরা অবৈধ সুবিধা নিয়ে অননুমোদিত জায়গায় সড়কটি বানান। শুধু তা-ই নয়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মূল সড়কের সংস্কারের জন্য আসা প্রায় ৩৪ লাখ টাকাও পুনরায় ওই বিশেষ ব্যক্তির বাড়ির সেই সড়কেই ব্যয় করা হয়।
এ বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দা মো. আনিস খান ও জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, আমরা বহু কষ্ট করে আবেদন করে প্রকল্প পাস করালাম, আর এলজিইডির প্রকৌশলীরা অনৈতিক সুবিধা নিয়ে একজনের আত্মীয়ের বাড়ির সড়ক বানিয়ে দিলো। এবার সংস্কারের টাকাও সেখানেই খরচ করা হয়েছে। অনিয়মের সঙ্গে তদারকি কর্মকর্তা লুৎফর রহমান, তৎকালীন উপজেলা প্রকৌশলী মহকুল হোসেন এবং হিসাবরক্ষক মো. চানমিয়ার জড়িত থাকার অভিযোগ তোলেন তারা।
কাজের ঠিকাদার মো. মাসুদ রানা বলেন, আমি টেন্ডার পেয়েছিলাম। এলজিইডির এসও ও উপজেলা প্রকৌশলী আমাকে যে সড়কে কাজ করতে বলেছেন, আমি শিডিউল অনুযায়ী শতভাগ কাজ করেই বিল তুলেছি।
তদারকি কর্মকর্তা উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. লুৎফর রহমান অবৈধ সুবিধা নেওয়ার কথা অস্বীকার করে বলেন, ২০১০-১১ অর্থবছরে যে সড়কে কাজ হয়েছিলো, আমি সেখানেই কাজ করেছি। অনুমোদিত আইডি ছেড়ে অন্য সড়কে টাকা খরচের সুযোগ আছে কি না—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ভুল তো আগেই হয়েছে, আমার তো কিছু করার নাই।
তৎকালীন উপজেলা প্রকৌশলী মকবুল হোসেন ও হিসাবরক্ষক মো. চাঁন মিয়া বদলি হয়ে যাওয়ায় তাদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
তবে বর্তমান বাউফল উপজেলা প্রকৌশলী এটিএম সাদিকুর রহমান বলেন, এক প্রকল্পের বরাদ্দ দিয়ে আইডিবিহীন অন্য সড়কের কাজ করার কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টি তদন্ত করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।
অভিযোগের বিষয়ে পটুয়াখালী এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ওয়ালিয়ার রহমানের মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি এবং খুদে বার্তারও কোনো উত্তর দেননি।
