নিত্যপণ্য দামবৃদ্ধির বাজারে কাঁচা মরিচের যেন ‘পাখা গজিয়ে ছিল’। নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্তসহ উচ্চবিত্তের নাগালের বাইরে চলে গিয়েছিল অতিপ্রয়োজনীয় এই পণ্যটি। বাজারে যখন এমন হাহাকার, তখন আকাশে ওড়া এই পণ্যটি নিয়ে একদিকে যেমন বেড়েছিল ভোগান্তি, তেমনি সোস্যাল মিডিয়ায় রসিকতায়ও মজে ছিলেন নেটিজেনরা। তবে সেই ভোগান্তিতে আপাতত ইতি, আর কাঁচা মরিচের রণে ভঙ্গ।
ভারত থেকে আমদানি করার একদিন পরই রাজধানীসহ দেশের বাজারে কাঁচা মরিচের দাম কমেছে। কয়েকদিন আগে মূল্য আকাশ ছোঁয়া এই পণ্যটি এখন দেশের বাজারে বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ২৫০ টাকায়। আবার কোথাও কোথাও তা ১৫০ টাকা থেকে ১০০ টাকার নিচেও বিক্রি হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
সোমবার সকালে রাজাধানীসহ দেশের বিভিন্ন বাজার ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
এর আগে ঈদের পরই কাঁচা মরিচের পালে দাম বৃদ্ধি হাওয়া লাগে। অতি প্রয়োজনীয় এ পণ্যটি দেশের কোথাও ৫০০, ৬০০ আবার কোথাও হাজার টাকায়ও বিক্রির খবরও আসে।
এমন পরিস্থিতিতে কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে কাঁচা মরিচ আমদানি সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করা হয়। কৃষি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ঈদের ছুটির পর রোববার বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত ৫৫ টন কাঁচা মরিচ দেশে এসেছে।
কাঁচা মরিচের দাম নিয়ে একাত্তরের প্রতিবেদক, প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো প্রতিবেদন-
রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ
ভারত থেকে আমদানি করা কাঁচা মরিচ দেশে আসার পর রাজধানী ঢাকায় পণ্যটির দাম কমতে শুরু করেছে। এরই মধ্যে পাইকারিতে কাঁচা মরিচের দাম নেমে এসেছে ২০০ টাকার নিচে। আর খুচরা পর্যায়ে কাঁচা মরিচের কেজি আড়াইশ টাকার মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে, যা দুইদিন আগে উঠেছিল ৬০০ টাকায়।
রূপগঞ্জে কাঁচা মরিচের কেজি ৬০০ টাকা থেকে এক লাফে নেমে ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ উপজেলায় এক দিনের ব্যবধানে কাঁচা মরিচের দাম কমেছে কেজিতে ৩৫০ টাকা। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, কাঁচা মরিচ আমদানি শুরু হওয়ায় আজ (সোমবার) থেকে দাম কমেছে।
এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফয়সাল হক বলেন, মুক্ত বাজার অর্থনীতিতে আমরা দাম নির্ধারণ করতে পারিনা। তবে বাজার গুলোতে বিক্রির জন্য বিভিন্ন পণ্যের নির্দিষ্ট দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে ভোক্তা অধিকার। যদি নির্দিষ্ট দামের চেয়ে বেশি দামে পণ্য বিক্রি হয় তবে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাকে শাস্তি দেয়া হবে।
নেত্রকোনা
নেত্রকোণায় বাজারগুলোতে কাঁচা মরিচের ঝাঁজ কিছুটা কমতে শুরু করেছে। সোমবার সকালে জেলা পাইকারি আড়তে রোববারের চেয়ে প্রতিকেজি মরিচ ১০০ থেকে ২৫০ টাকা কমে বিক্রি হয়েছে।
পাইকাররা জানান, ভারতীয় মরিচ না আসলেও স্থানীয় ও কুষ্টিয়া জেলা থেকে আসা মরিচ প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ৩০০ টাকায়। আর জেলার খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৩২০ টাকা থেকে ৫০০ টাকায়।
মানিকগঞ্জ
মানিকগঞ্জের বাজারে ভারতীয় মরিচ আসার সঙ্গে সঙ্গে এক লাফেই দাম কেজিতে ৩০০ টাকা কমে গেছে। রোববার খুচরা বাজারে যে মরিচ বিক্রি হয়েছিল ৫৬০টাকা কেজি সেটি, আজ বিক্রি হচ্ছে ২৬০ টাকায়।
বিক্রেতারা বলছেন, পুরোপুরিভাবে এলসির মরিচ বাজারে এলে দাম আরও অনেক কমে যাবে।
এদিকে, মুনাফালোভীরা বেশি করে মরিচ কিনে অতি বেশি দামে বিক্রি আশায় গুড়ে বালি বলেও মন্তব্য করেছেন অনেকে।
সকালে মানিকগঞ্জের জাগীর বন্দর ধলেশ্বরী পাইকারি আড়তে দেখা গেছে, আড়তদাররা এলসি করা ভারতীয় মরিচ বিক্রি করছেন কেজিতে ১৮০ টাকা থেকে ২০০ টাকা দরে।
খুলনা
ভারত থেকে কাঁচা মরিচ আমদানির খবরে এক দিনেই খুলনায় দাম কমেছে কেজি ৬০০ টাকা। রোববার যে মরিচ বিক্রি হয়েছে ৮০০ টাকা, সেই মরিচ সোমবার বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকায়।
দাম কমায় খুশি ক্রেতারা। আর বিক্রেতারা বলছেন, তার পাইকারী বাজারে ১৫০ থেকে ১৮০ টাকা কেজি দরে মরিচ কিনেছেন। এখন ২০০ টাকা দরে বিক্রি করছেন।
বগুড়া
গত কয়েকদিন ধরেই মরিচের বাজার ছিলো লাগামহীন। প্রতিকেজি মরিচ বিক্রি হয়েছে ৫৪০টাকায় । হঠাৎ করেই ভারত থেকে মরিচ আমদানির খবরে এক লাফে দাম কমে আজ (সোমবার) বগুড়ার পাইকারি বাজারে মরিচের দাম হয়েছে প্রতিকেজি ৭০ থেকে ১৩০ টাকা।
ব্যবসায়ীরা বলছেন বাজারে মরিচ সরবরাহ কম থাকায় এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। তবে পঞ্চগড়, কুড়িগ্রাম ও নিলফামারীর পাশাপাশি ভারতের মরিচ আমদানি হওয়ায় বগুড়ার বাজারে কিছুটা স্বস্তি এসেছে ক্রেতাদের মধ্যে। তবে শহরের অন্য বাজার বা সপিং মলে অনেকেই মরিচ বিক্রি করছেন ৩৪০ টাকায়।
ক্রেতারা বলছেন এমন অবস্থায় তাদের বাজার করা নিয়ে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হচ্ছে। এমন অবস্থার জন্য বাজার মনিটরিং না করাকে দায়ি করছেন অনেকেই।
সাতক্ষীরা
ভারতীয় কাঁচা মরিচ আমদানির খবরে সাতক্ষীরায় দেশি মরিচের দাম কেজিতে কমেছে ২৫০-৩০০ টাকা।
সোমবার সাতক্ষীরার সুলতানপুর বড় বাজারে কাঁচা মরিচ পাইকারিতে বিক্রি হয়েছে ২০০ টাকা কেজি দরে। অথচ রোববার বিক্রি হয়েছিল ৪৫০-৫০০ টাকায়।
সুলতানপুর কাঁচামাল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহিম বাবু জানান, একদিনেই কাঁচা মরিচের বাজারে দরপতন ঘটেছে। আজ দেশি কাঁচা মরিচের কেজি পাইকারিতে ২০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। গতকাল বিক্রি হয়েছিল ৪৫০-৫০০ টাকায়। মূলত ভারতীয় কাঁচা মরিচ আমদানি হওয়ায় দাম কমে গেছে।
আরও পড়ুন: বিদ্যুতস্পৃষ্ট বাবাকে বাঁচাতে গিয়ে ১৩ বছরের কিশোরও নিহত
এদিকে, রোববার সাতক্ষীরার ভোমরা বন্দর দিয়ে সাতটি ট্রাকে করে ৭০ মেট্রিক টন ভারতীয় কাঁচা মরিচ আমদানি হয়েছে।
ভোমরা সিএন্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মাকসুদ খান জানান, সোমবার ১০-১৫ ট্রাক কাঁচা মরিচ আমদানির সম্ভাবনা রয়েছে। এতে দেশের বাজারে কাঁচা মরিচ নিয়ে যে অরাজকতা চলছিল সেটি থেমে যাবে বলে মনে করি।
কুমিল্লা
কুমিল্লার বাজারে কমেছে কাঁচা মরিচের দাম। বর্তমানে প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায়। ব্যবসায়ীরা বলছেন, গেলো কয়েক দিন কাঁচা মরিচের বাজার অস্থির থাকলেও দাম অর্ধেক কমেছে, আরও কমবে। এর আগে রোববার পর্যন্ত কাঁচা মরিচ বিক্রি হয়েছে ৬০০ টাকায়।
সরেজমিন, কুমিল্লার নিমসার পাইকারি বাজারে কাঁচা মরিচ ১৩০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সেই মরিচ রাজগঞ্জ বাজারে আড়তে পাইকারি ১৬০ টাকা। পরে একই বাজারে খুচরায় ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে।
এছাড়া নগরের রাণীর বাজার, নিউমার্কেটে ২০০ থেকে ২৪০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। ক্রেতাদের অভিযোগ, বাজার মনিটরিংয়ের অভাবে দামের এমন তারতম্য হচ্ছে।
তবে ভোক্ত অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, কম দামে কিনে বেশি দামে বিক্রি করলে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এদিকে কুমিল্লার পাইকারি বাজার নিমসার, নগরীর দীঘিরপাড়, রানীর বাজার ও বাদশা মিয়ার বাজারে অতিরিক্ত দামে কাঁচা মরিচ বিক্রি করাসহ ভোক্তা অধিকার বিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে তিন প্রতিষ্ঠানকে ৯ হাজার ২০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
একাত্তর/এসি
