লাগামহীন জীবনযাত্রার খরচে ব্যাংক খাতে কমেছে অতিরিক্ত নগদ তারল্য। সাথে সাথে কমছে আমানতের প্রবৃদ্ধি। বিশেষ করে সঞ্চয়ী ও স্থায়ী আমানতে প্রবৃদ্ধি কমছে। দেশের মুদ্রানীতি ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সংক্রান্ত প্রতিবেদনে এমনটা উঠে এসেছে।
গেল ১৬ আগস্ট ব্যাংকার্স সভায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, ব্যাংকিং খাতে অতিরিক্ত তারল্য কমে এ বছরের জুনে চার হাজারের কোটিতে ঠেকেছে, যা গত বছরের জুনে ছিলো দুই লাখ কোটির ওপরে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র মেজবাউল হক জানালেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। আর বিশ্লেষকদের অভিমত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে উল্টো পদক্ষেপের ফল ভোগ করছে এখন পুরো দেশ।
সোনালী ব্যাংক আঁটিবাজার শাখার গ্রাহক বঙ্কিম সরকার জানান, সংসারে পাঁচজন সদস্য অথচ উপার্জন করেন একজনই। আয় রোজগারও আহামরি কিছু নয়। অথচ নিত্যপণ্যের বাজার তো চড়া। সংসার চালাতে বেশ কছর ধরে প্রতি মাসে যে ব্যাংকে টাকা রাখতেন, তাও ভাঙ্গলেন কিন্তু লাভের অংশ খুব একটা পাননি। উল্টো জমি বিক্রি করে সে অর্থে এখন সংসার চালাচ্ছেন বলে জানান তিনি।
কেবল বঙ্কিম নয়, গেল বছরের তুলনায় এ সময়ে প্রতিটি নিত্যপণ্যে একশো টাকায় বাড়তি ৯ টাকার বেশি খরচ হওয়ার কারণে পকেট শূন্য হচ্ছে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের। ফলে সঞ্চয় খোয়াচ্ছেন তারা।
মূল্যস্ফীতির যাঁতাকলে সাধারণ মানুষ যে ব্যাংকমুখী হচ্ছেন তুলনামূলক কম তা জানা বাংলাদেশ ব্যাংকেরও।
২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসে সঞ্চয়ী আমানতে অর্থ জমা পড়েছে তিন লাখ ৫২ হাজার ৯৯২ কোটি টাকা, যা মোট আমানতের ২১ দশমিক ৮৮ শতাংশ। গত বছরের একই সময়ে জমা পড়েছিল তিন লাখ ৪২ হাজার ২০৮ কোটি টাকা, যা মোট আমানতের ২২ দশমিক ৫৯ শতাংশ।

এদিকে, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসে স্থায়ী আমানতে জমা পড়েছে সাত লাখ চার হাজার ৯৩৬ কোটি টাকা যা মোট আমানতের ৪৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ। গত বছরের একই সময়ে জমা হয়েছিল ছয় লাখ ৮২ হাজার ৯২০ কোটি যা সে বছরের মোট আমানতের ৪৫ দশমিক শূন্য আট শতাংশ।
হিসাব বলছে, বছর ব্যবধানে, সঞ্চয়ী ও স্থায়ী আমানতের প্রবৃদ্ধি কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে।
পরিস্থিতি এমনই যে, গেল বছরও যেখানে ব্যাংক খাতে অতিরিক্ত নগদ তারল্য ছিলো দুই লাখ কোটির বেশি, সেখানে তা নেমে এসেছে চার হাজার কোটির ঘরে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মেজবাউল হক জানান, আমানত প্রবৃদ্ধির হার আগের বছরের তুলনায় কমেছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেই ব্যাংকের বাইরে টাকার পরিমাণ কমে আসবে। সুদহার বাড়লেও মানুষ আবার ব্যাংকে বিনিয়োগে ফিরে আসবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নতি না করে ডলারের দাম বেঁধে দেয়া, মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উল্টো পথে হাঁটা মানুষের পকেটকে শূন্য করছে।
বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বাজেটের ঘাটতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থায়ন করেছে, যেটা টাকা ছাপানোর মতোই। ডলার সঙ্কট ও খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাজার ব্যবস্থাপনার সমস্যা বড় কারণ। রাজস্ব আদায় বাড়ানোর জন্য অনেক পরোক্ষ কর বাড়ানো হয়েছে, এগুলো মূল্যস্ফীতি উসকে দেয়।
আমানতে প্রবৃদ্ধি বাড়াতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বড় লক্ষ্য হওয়া উচিত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
