ব্যাংক ঋণের ৭৭ শতাংশই নিয়েছেন কোটিপতিরা

আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০২৬, ০১:৪৫ পিএম

ব্যাংকের লাখ টাকার নিচের আমানত ও ঋণগ্রহীতাদের সাধারণত নিম্ন আয়ের মানুষ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২০২৫ সালের শেষে এই গ্রাহকদের মোট ঋণের পরিমাণ ২ শতাংশও ছুঁতে পারেনি। অথচ কোটিপতি ঋণগ্রহীতারা দেশের প্রায় ৭৬.৬৭ শতাংশ ঋণই দখল করে রেখেছেন। আর অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি গ্রাহকদের ভাগ্যে জুটেছে ঋণের মাত্র ২৩.৩৩ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, বৃহৎ ঋণের চাপে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন ক্ষুদ্র ঋণের গ্রাহকরা। কিন্তু দেশের অর্থনীতি সচল রাখতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন ছোট উদ্যোক্তারাই।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতের আমানতকারীর সংখ্যা ১৭ কোটি ৭৯ লাখ ৫০ হাজার ৪৬৫ জন। তাদের জমাকৃত টাকার পরিমাণ ২১ লাখ ৫৩৪ কোটি। একই সময়ে ১৭ লাখ ৭৭ হাজার ৩১৬ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে ব্যাংকগুলো, যেখানে ঋণগ্রহীতার সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৫৩ লাখ ৭৬৭ জন। অর্থাৎ ১১.৬৩ জনের জমাকৃত টাকা ভোগ করছেন মাত্র একজন। এটা ছিল সার্বিক হিসাব। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ব্যাংক ঋণের বেশিরভাগই ভোগ করছেন কোটিপতি গ্রাহকরা। এতে বঞ্চিত হচ্ছেন প্রান্তিক পর্যায়ের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের হাজারো উদ্যোক্তা।

প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষক, মুটে, মজুর, দোকানদারের খুব বেশি ঋণের প্রয়োজন হয় না। তারা কখনো ৫০ হাজার; ১ লাখ বা ব্যবসাভেদে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যাংক থেকে ঋণ নেন। আর নতুন ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণের প্রয়োজন হয় ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত। এর বাইরে কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ নেন মধ্যম আয়ের চাকরিজীবীরা। যারা বাড়ি এবং গাড়ির জন্য ঋণ নিয়ে থাকেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত মাত্র ৪ হাজার ৮৬৬ জন গ্রাহক ব্যাংক খাতের মোট ঋণের ৩১ দশমিক ৬২ শতাংশই দখলে নিয়েছেন। অথচ, নিম্ন আয়ের মানুষ বা লাখ টাকার নিচের ঋণগ্রহীতারা মাত্র ১ দশমিক ৬০ শতাংশ ঋণ নিয়েছেন। এসব গ্রাহকের নেওয়া মোট ঋণের পরিমাণ ২৮ হাজার ৩৯৩ কোটি টাকা। অতিক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বা ১-৫ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া গ্রাহকদের ঋণের পরিমাণ ৪ দশমিক ৩১ শতাংশ। এসব গ্রাহকের নেওয়া মোট ঋণের পরিমাণ ৭৬ হাজার ৫১৬ কোটি টাকা। আর নতুন ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণের প্রয়োজন হয় ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত।

এসব গ্রাহক ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক থেকে মোট ঋণের ১১ দশমিক ৮৯ শতাংশ ঋণ নিয়েছেন। তাদের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ১১ হাজার ৩০৪ কোটি টাকা। এর বাইরে মধ্যম আয়ের চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ী বা কোটি টাকা পর্যন্ত নেওয়া গ্রাহকরা ৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ ঋণ নিয়েছেন। তাদের নেওয়া মোট ঋণের পরিমাণ ৯৮ হাজার ৩৯৩ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ব্যাংকের ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে অবশ্যই সব খাতকে গুরুত্ব দিতে হবে। কোনো খাত যাতে অন্য খাতের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে না পারে। যদি প্রভাব বিস্তার করে তবে অর্থনীতির মধ্যে মিসম্যাচ তৈরি হবে। এ জন্য ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে খাতকে গুরুত্ব দিয়ে তাদের ঋণ পোর্টফোলিও সাজানো উচিত। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকেও বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আশা করছি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা ঠিকমতো ঋণ পাবেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, মাত্র ৪ হাজার ৮৬৬ জন গ্রাহক ব্যাংক খাতের মোট ঋণের ৩১ দশমিক ৬২ শতাংশই দখলে নিয়েছেন। ৫০ কোটি টাকার বেশি এসব ঋণগ্রহীতার মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৬১ হাজার ৯২১ কোটি টাকা। ২০ কোটি টাকার ওপরে ঋণ নিয়েছেন এমন গ্রাহকের সংখ্যা ১৩ হাজার ২৫৭ জন, যাদের কাছে আছে ৮ লাখ ২২ হাজার ৯১৮ কোটি টাকা, যা ব্যাংক খাতের মাধ্যমে বিতরণকৃত মোট ঋণের ৪৬ দশমিক ৩০ শতাংশ। ৫ কোটি টাকার বেশি ঋণ বিতরণ করা হয়েছে এমন গ্রাহকের সংখ্যা ৪৬ হাজার ২৪৭ জন। তাদের কাছে বিতরণ করা হয়েছে ১১ লাখ ৩৪ হাজার ৮৩২ কোটি টাকা। ব্যাংকের মোট ঋণের ৬৩ দশমিক ৮৫ শতাংশ রয়েছে এসব গ্রাহকের কাছে। ১ কোটি টাকার ওপরে ঋণ নিয়েছেন এমন গ্রাহকের সংখ্যা ১ লাখ ৬০ হাজার ৩৮৯ জন। তাদের হাতে রয়েছে বিতরণকৃত মোট ঋণের ৭৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ। অঙ্কে যার পরিমাণ ১৩ লাখ ৬২ হাজার ৭০৫ কোটি টাকা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে ব্যাংকের খরচ বেশি হয়। এটার পরিচালনায় অতিরিক্ত জনবল প্রয়োজন হয়। এ জন্য ব্যাংকগুলো ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে অনীহা দেখাচ্ছে। তবে অবশ্যই অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা এসব ব্যক্তিদের জন্য ঋণ সহজ করতে হবে। এছাড়া তাদের কীভাবে ব্যাংকের লেনদেনের মধ্যে নিয়ে আসা যায় সে বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, গেল ডিসেম্বরে ব্যাংক খাতে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৪৪ জন। গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে এ সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২৮ হাজার ৭০ জন। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে কোটিপতি বেড়েছে ৫ হাজার ৯৭৪ জন। ডিসেম্বরে কোটিপতিদের আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৩৬ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা, যা মোট আমানতের ৩৯ দশমিক ৮২ শতাংশ।

এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, আমাদের এখানে ব্যাংকগুলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের টাচ করতে পারছে। কিন্তু ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোও এসব গ্রাহকদের কাছে পৌঁছাতে পারছে না। অর্থাৎ মাঝের এই উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছানোর জন্য নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার প্রয়োজন সৃষ্টি হয়েছে। এ জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে এ ধরনের একটি প্রজ্ঞাপন ও জারি করা হয়েছিল। সেই প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা প্রয়োজন।

একাত্তর/এফআর
ন্যাশনাল ব্যাংক পিএলসি-তে জমা থাকা নিজেদের কষ্টার্জিত সঞ্চয়ের টাকা তুলতে না পেরে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন চারজন আমানতকারী। ব্যাংক হিসাবে পর্যাপ্ত টাকা থাকা সত্ত্বেও চেক জমা দিয়ে অর্থ উত্তোলন করতে...
নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) খাতে আমানত ও ঋণ দুটিই বেড়েছে। তবে এই অগ্রগতির সুফল পাচ্ছেন না অনেক গ্রাহক। বরং আমানত ফেরত না পাওয়ায় বাড়ছে হতাশা ও আস্থার সংকট। তবে সংকটে থাকা...
দেশের একীভূত পাঁচ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকে আটকে থাকা বিপুল অর্থের বিপরীতে প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখার বাধ্যবাধকতা তুলে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো...
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমতি ছাড়াই বিনিয়োগ যাচ্ছে ভারতে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ৫ আগস্টের পর দেড় বছরে ভারতে অনুমোদনহীন বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ১৩০০ কোটি টাকা।
সৌদি আরবে সম্প্রতি দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়ায় কূটনৈতিক তথ্য আদান-প্রদানে মারাত্মক ঘাটতি থাকার কথা জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ঘটনাটিকে অত্যন্ত দুঃখজনক ও হতাশাজনক...
বিতর্ক ও সমালোচনার জেরে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়ে ইশরাক হোসেন বলেছেন, দল তাঁকে পদত্যাগ করতে বলেনি, বরং তিনি নিজে থেকেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। একটি...
ধর্ম, বর্ণ ও জাতিগত পরিচয় নির্বিশেষে দেশের প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার, পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সার্বিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের মূল লক্ষ্য বলে...
নানা নাটকীয়তা ও গুঞ্জনের অবসান ঘটিয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগের চূড়ান্ত ঘোষণা দিতে রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে পৌঁছেছেন ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য...
লোডিং...
সর্বশেষপঠিত

এলাকার খবর