নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত উইমেন্স কার্নিভাল অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া হয়নি ট্রান্সজেন্ডার হোচিমিন ইসলামের। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে ওই অনুষ্ঠানে হোচিমিনের সেশনটি বাতিল হয়ে যায়। বিষয়টি নিয়ে নিজের ফেসবুকে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন হোচিমিন নিজেই। তার সমর্থকে সোচ্চার হয়েছে আরও অনেকে। এমন ঘটনায় বিষ্ময় প্রকাশ করে প্রতিবাদও জানাচ্ছেন তারা। আয়োজকরা বলছেন, তারা এক দু’দিনের মধ্যে এই বিষয়ে একটি বিবৃতি দিবে সংশ্লিষ্ট পক্ষ।
গত শুক্রবার শুরু হওয়া দুই দিনব্যাপী উইমেন্স ক্যারিয়ার কার্নিভালের এ অনুষ্ঠান শনিবার শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে হিরোস ফর অল (এইচএফএ) ও আই-সোশ্যাল। নেটওয়ার্কিং, লার্নিং এবং পেশাগত উন্নয়নের মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়নে লক্ষ্যে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে চারজন নারী অধিকার কর্মীকে আলোচক হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়। এদের মধ্যে ট্রান্সজেন্ডার হোচিমিন ইসলাম ছাড়াও ছিলেন ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্সের জেন্ডার ইনক্লুশন অ্যান্ড উইমেন অন্ট্রপ্রোনারশিপ ইউনিটের সিনিয়র ম্যানেজার কাশফি বিনতে আহমেদ, আজিমুর রোকিয়া রহমান ট্রাস্টের ফাইজা রহমান ও উদ্যোক্তা জেরিন মাহমুদ হোসেন।
যখন হোচিমিন যেতে পারবেন না সিদ্ধান্ত হয়, তার পরে এক পর্যায়ে হোচিমিন ইসলাম তার ফেসবুকে পুরো বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন কীভাবে আয়োজক ও নর্থসাউথ কর্তৃপক্ষ একাধিকবার যোগাযোগের মধ্য দিয়ে সিদ্ধান্ত নেন, হোচিমিনের অনুষ্ঠানস্থলে যাওয়া নিরাপদ নয় এবং কর্তৃপক্ষও কোন নিরাপত্তা দিতে পারবে না।
পরে তিনি নিজে থেকেই আয়োজকদের কোন অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে ফেলতে চান না বলে জানান। হোচিমিনের লেখাতেই উঠে আসে কীভাবে ইসলামিক প্র্যাকটিশনার ফর এনএসইউ নামের একটা ফেসবুক পেজে ভিসিকে ইমেইল করে বলা হয় হোচিমিন বাংলাদেশের আইন অমান্য করে ক্রিমিন্যাল অ্যাক্টিভিটিজ করছে। সেখানে সমকামিতাকে প্রচার করা হচ্ছে বলেও উল্লেখ করা হয়। এক পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ করছে। তারা পরীক্ষা বয়কট করবে এমনকি দাঙ্গাও হতে পারে বলে হুমকি দেয়।
আয়োজক হিরো’স ফর অল- এর প্রতিষ্ঠাতা রেহনুমা করীমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন হোচিমিনের সেশন বাদ দিয়েই তাদের অনুষ্ঠান করতে হয়েছে। হোচিমিনের সেশন ও ছবিসহ পোস্টার করার পর থেকেই নর্থসাউথের ভেতরের ও বাইরের কিছু গ্রুপ হুমকি দিতে শুরু করে। আমাকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছে, দিচ্ছে। তারা এও বলে আমি পশ্চিমা সংস্কৃতি থেকে ট্রান্সজেণ্ডার ইস্যুটা বাংলাদেশে আনার চেষ্টা করছি এবং এটা বাংলাদেশের আইনের পরিপন্থী। তারপরেও আমরা এটা করতে চেয়েছি এবং কর্তৃপক্ষ শুরুতে নিরাপত্তা দেওয়ার কথা জানালেও পরে শিক্ষার্থী এবং হোচিমিন এর নিরাপত্তার কথা ভেবে তারা সেটা করতে পারলেন না। আমরা এমন পরিস্থিতি আশা করিনি।

কার্নিভালে না যেতে পারার প্রসঙ্গে হোচিমিন ইসলাম একাত্তরকে বলেন, আমাকে তো ধর্মের দোহাই দিয়ে ঢুকতেই দিলো না। কথাটাই শুনলো না। আগে শুনতো, তারপর বিরোধিতা করতো। তারা ধর্মের দোহাই দিলো। অথচ ওখানে আজমেরী হক বাঁধন, চিরকুটের সুমী গেলেন। আমি কি ভিন্নকিছু? আমারতো আর দশজনের মতোই অধিকার থাকার কথা। আমি এই দেশের নাগরিক। আমিতো অধিকার নিয়ে কথা বলি। আমি সমকামিতাকে প্রমোট করছি এটা ওদের কে বললো? ট্রান্সজেন্ডারদের অধিকার নিয়ে কথা বলি।
ডিজিটাল ক্রিয়েটর আসলাম লিটন লিখেছেন, শুধুমাত্র তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তি হওয়ায় হোচিমিন ইসলামকে ‘ওমেন্স কেরিয়ার কার্নিভাল’ এর একটি সেশন থেকে বাদ দিতে বিক্ষোভ করল নর্থ-সাউথ ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্টরা। বিক্ষোভের মুখে সেশনটি বাদ দেয়া হলো। বিষয়টা লজ্জাজনক। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্টরা যদি তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিদের মর্যাদা দিতে না শেখে, তো আর কে শিখবে! ধিক্কার!

অনলাইন সংবাদ মাধ্যম সকাল সন্ধ্যা ডটকমের প্রধান সম্পাদক গাজী নাসিরুদ্দিন আহমেদ একাত্তরকে বলেন, এটা ধরে নেয়া হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে মুক্ত বিদ্যায়তনিক পরিবেশ থাকবে। কিন্তু হোচিমিনের ক্ষেত্রে যেটা হলো নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারেনি। তারা দেশের প্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। র্যাকিংয়েও অনেকে এগিয়ে। তাহলে, সারা পৃথিবীতে যে অধিকারগুলো স্বীকৃত, সেটা নিয়ে কথা বলার জন্য একজনকে ঢুকতেই দেয়া হলো না। এটা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ব্যর্থতা।
বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (এনএসইউ) উপাচার্য অধ্যাপক আতিকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোন সাড়া পাওয়া যায়নি। কী বিষয় নিয়ে বক্তব্য চাওয়া হবে, সেটি উল্লেখ করে ক্ষুদেবার্তা দেয়া হলেও, এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তিনি কোনো সাড়া বা জবাব দেননি।
