আনুষ্ঠানিকভাবে মেট্রোরেল চালুর এক বছর পূর্ণ হলো। এক বছরেই এটি এখন নিরাপদ ও স্বস্তির বাহন। গেলো এক বছরে একে একে চালু হয় ১৪টি মেট্রো স্টেশন। বাকি দুটি কারওয়ানবাজার ও শাহবাগে নতুন বছরের শুরুতেই চালুর আশা করা হচ্ছে।
এই এক বছরেই নগরবাসীর আস্থার বাহনে পরিণত হয়েছে মেট্রোরেল। যানজট ও বিশৃঙ্খল গণপরিবহনের এই শহরে দ্রুত ও নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাতে মেট্রোরেলেই যেনো স্বস্তি। বিশেষ করে নির্বাচন সামনে রেখে হরতাল অবরোধের এই অনিশ্চিত সময়ে মেট্রোকেই নিরাপদ ভাবছেন নগরবাসী।

২০২২ সালের ২৮ ডিসেম্বর ঢাকায় চলাচল শুরু করে দেশের প্রথম মেট্রোরেল। পরের দিন থেকে শুরু হয় বাণিজ্যিক যাত্রা। শুরুতে সকালে চার ঘণ্টা মেট্রো চলে আগারগাঁও পর্যন্ত। এর পর স্টেশনের সংখ্যার সঙ্গে বাড়তে থাকে চলাচলের সময়সীমাও।
যাত্রা শুরুর ছয় মাসের মধ্যেই এই অংশের সব স্টেশন থেকে দিনে ১২ ঘণ্টা সেবা দিতে শুরু করে আধুনকি নগরব্যবস্থার অন্যতম অনুষঙ্গ এই বাহনটি। আর প্রথম দিন থেকেই মেট্রো ছিলো আগ্রহের কেন্দ্রে। ধীরে ধীরে দর্শনার্থী কমে বাড়তে থাকে নিয়মিত যাত্রী।
এ বছরের ৪ নভেম্বর আগারগাঁও থেকে মতিঝিল পর্যন্ত উদ্বোধন হয় মেট্রোর। এখন উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত যেতে সময় লাগছে আটত্রিশ মিনিট।
মেট্রোরেলে নিয়মিত এক নারী যাত্রী বলেন, আমি কোনো সমস্যা দেখিনি। মেট্রোরেলে চলাচল অনেক নিরাপদ।
তবে আরেক যাত্রী বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা আরেকটু জোরদার করলে ভালো হয়।
চলতি মাস পর্যন্ত চালু হয়েছে ১৪টি মেট্রো স্টেশন। বাকি আছে কারওয়ান বাজার ও শাহবাগ স্টেশান। শাহবাগ প্রস্তুত আগেই। আর কারওয়ান বাজারে চলছে শেষ মুহুর্তের কিছু কাজ। জানুয়ারিতেই পুরোদমে চলছে মেট্রোরেল।
কিন্তু এতোগুলো স্টেশনে নিরাপত্তা দিচ্ছেন মাত্র ৫৬০ জন এমআরটি পুলিশ। তাদের সাথে থাকছে শরীরে লাগানো ক্যামেরা, ট্যাকটিক্যাল বেল্ট, ব্যাটন আর ওয়াকিটকি। আছে অস্ত্রধারী পুলিশ ও সিসিক্যামেরাও। প্রতিটি স্টেশানে তিন শিফটে ভাগ হয়ে নিরাপত্তা দেন ১১ জন এমআরটি পুলিশ।
এমআরটি পুলিশের এসপি শফিকুল ইসলাম বলেন, কেউ নাশকতা করে বেরিয়ে যাবে এমন এখানে হবে না-এটা নিশ্চিত করতে পার।
তার ভাষ্য, নির্বাচন সামনে রেখে নাশকতা ঠেকাতে ও মেট্রোরেলের নিরাপত্তায় জরুরি হয়ে পড়েছে যাত্রীদের মালামালের ওপর নজরদারি।
শফিকুল ইসলাম বলেন, মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের কাছে আমরা অটোমেটেড লাগেজ স্ক্যানার, আর্চওেয়ে গেটের জন্য আবেদন করেছি। এগুলো থাকলে যাত্রীদের সুবিধা হবে এভং আমরা দেখতে পারবো তারও কাছে কিছু আছে কিনা।
মেট্রোরেল চালুর কিছুদিন পরই কাজীপাড়ার একটি ভবন থেকে পাথর ছোড়ার পর স্টেশনগুলোর বাইরের অংশেও সিসিক্যামেরা লাগানোর প্রস্তাব দেয় এমআরটি পুলিশ।
২০১৬ সালে ২৬ জুন এ প্রকল্পের নির্মাণ কাজ উদ্বোধন করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ হাসিনা। তিনিই দেশের প্রথম এ বৈদ্যুতিক রেলের প্রথম যাত্রী হয়েছিলেন।
২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে মেট্রোরেল নির্মাণের উদ্যোগ নেয় আওয়ামী লীগ সরকার। জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগী সংস্থার (জাইকা) অর্থায়নে সমীক্ষা পরিচালনার উদ্যোগ নেয় ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন বোর্ড (ডিটিসিবি), যার বর্তমান নাম ঢাকা পরিবহন কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)।
২০০৯ সালের মার্চ থেকে ২০১০ সালের মার্চ পর্যন্ত একবছরের ওই সমীক্ষায় সবার আগে ‘এমআরটি লাইন-৬’ নির্মাণের সুপারিশ আসে। পরের বছরই ওই প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করে জাইকা।
২০১৩ সালের ৩১ অক্টোবর গাজীপুরে এক অনুষ্ঠানে মেট্রোরেল প্রকল্পের ভিত্তিফলক উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
ওই সমীক্ষায় প্রথমে উত্তরা থেকে সায়েদাবাদ পর্যন্ত মেট্রোরেল নির্মাণের প্রস্তাব আসে। পরে তা পরিবর্তন করে মতিঝিলের বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যন্ত (২০.১০ কিমি) বিস্তৃত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

জাইকার কাছ থেকে কারিগরি ও অর্থায়নের প্রাথমিক প্রতিশ্রুতি নিয়ে ২০১১ সালে ‘ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) লাইন-৬ নির্মাণ’ প্রকল্প গ্রহণ করে সরকার। পরের বছরের ১৮ ডিসেম্বর একনেক সভায় প্রকল্পটির চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়।
তখন প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয় প্রায় ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রকল্প সহায়তা হিসেবে ১৬ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা জাপান সরকারের আর বাকি ৫ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা সরকারের নিজস্ব তহবিলে থেকে যোগান দেওয়ার কথা ছিল। প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়ার সময় ২০১২ সাল থেকে ২০২৪ সালে মধ্যে মেট্রোরেলের নির্মাণকাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়।
মেট্রোরেল বাস্তবায়নে ২০১৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি জাইকার সঙ্গে ঋণ চুক্তি করে সরকার। সেবছরই সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীনে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি (ডিএমটিসিএল) নামে বাস্তবায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণকারী কোম্পানি গঠন করা হয়।
২০১৪ সালের ২৮ আগস্ট ট্রাফিক জরিপ এবং ২৮ ডিসেম্বর চূড়ান্ত নকশার কাজ শেষ হয়। পরের দু বছরে প্রত্নতাত্বিক ও পরিবেশসহ বিভিন্ন জরিপের কাজ শেষ হয়। ২০১৫ সালে জাপানের সহায়তায় এসটিপি সংশোধন (আরএসটিপি) করে মেট্রোরেলের রুট সংখ্যা বাড়ানো হয়। ২০১৬ সালের ২৬ জুন এ প্রকল্পের নির্মাণ কাজ উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এ প্রকল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিয়োগান্তক ঘটনাও। উদ্বোধনের পরপরই ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলায় দুই নারীসহ সাত জাপানি নাগরিক নিহত হন।
এরপর জাইকা ও ঢাকায় নিযুক্ত জাপানি রাষ্ট্রদুতসহ বাংলাদেশে দায়িত্ব পালন করা বেশির ভাগ জাপানি নিজ দেশে ফিরে যান। পরে বাংলাদেশের তরফে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে সেপ্টেম্বরে জাপানিদের ফিরিয়ে আনা হয়।
২০১৬ সালের শেষ ভাগে মেট্রোরেলের ডিপো নির্মাণে কাজ শুরু হয়। পরের বছর দুটি প্যাকেজের মাধ্যমে উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণে পাইলিংয়ের কাজ শুরু করে।

এরপর ২০১৮ সালে এক একনেক সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বাধীনতার ৫০ বছরে মেট্রোরেল উদ্বোধনের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। ২০১৯ সালের ২৬ জুন জাতীয় সংসদে সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ২০২১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মেট্রোরেল উদ্বোধনের ঘোষণা দেন।
তবে কয়েক মাস পরে শুরু হয় হয় কোভিড মহামারী। লকডাউনের কবলে পিছিয়ে যায় নির্মাণকাজ। ফলে শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে মেট্রোরেল চালু করা সম্ভব হয়নি।
গত বছরের গত ১৯ জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় প্রকল্পটির মেয়াদ দেড় বছর এবং প্রায় ১১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা ব্যয় বাড়িয়ে সংশোধনী প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়। ফলে মোট ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা।
সংশোধনী প্রস্তাব অনুযায়ী মতিঝিল থেকে কমলাপুর রেলস্টেশন পর্যন্ত আরও ১ দশমিক ১৬ কিলোমিটার মেট্রোরেল বাড়ানো হয়। সেই অতিরিক্ত কাজসহ প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
এর মধ্যে গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর উদ্বোধন হয় উত্তরা থেকে আগারগাঁও অংশ।
দেড় ঘণ্টার পথ ৩৮ মিনিটে পাড়ি দেবে মেট্রোরেল
দেশের প্রথম মেট্রোরেল প্রকল্পের সব তথ্য
ঢাবি পরিবার নিয়ে মেট্রোরেল ভ্রমণে ভিসি, ভাড়া কমানোর দাবি