রাজধানীর পাড়া-মহল্লায় রীতিমতো আতঙ্কের নাম- কিশোর গ্যাং। বাহারি সব নামে এসব গ্যাংয়ের উৎপাতে অতিষ্ঠ নগরবাসী। সম্প্রতি কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযানে নেমেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। প্রায় প্রতিদিনই চলছে অভিযান। গ্রেপ্তার করা হচ্ছে কিশোর গ্যাং সদস্যদের এরিই ধারাবাহিকতায় মহাখালী, বনানী, বিমানবন্দর ও গাজীপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের আরও ৩৭ জন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব।
এদের সবাই বিভিন্ন সব গ্রুপের নামে এলাকায় ছিনতাই, ইভ টিজিং, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত বলে জানিয়েছে বাহিনীটির অদ্ভুত সব নাম ব্যবহার করে নিজেদের অপকর্মের ভিডিও বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করতো এই সব গ্রুপ। সেই সঙ্গে তাদের অতি ‘হিরো’ সুলভ আচরণের অশালীন ভিডিও ও ছবি আপলোড করতো। অনেক সময় সময় তারিখ উল্লেখ করে শো-ডাউনের ঘোষণাও দিতো।
শুধু রাজধানীরই নয়, সারাদেশে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য বেড়েছে বহুগুণ। অদ্ভুতসব গ্রুপের নামে চাঁদাবাজি ছিনতাই, মাদক ব্যবসাসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে উঠতি বয়সী কিশোররা। কিশোর অপরাধ ও কথিত কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে রাজধানীসহ সারাদেশে অভিযানে নেমেছে র্যাব।
অল আউট অ্যাকশন নামের এই অভিযানে শুক্রবার রাজধানীর বনানী, বিমানবন্দর,গাজীপুর ও টঙ্গি এলাকা থেকে কিশোর গ্যাংয়ের আরও ৩৭ সদস্যকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করেছে র্যাব-১। শুক্রবার বেলা ১১টায় উত্তরার র্যাব-১ কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানান, অধিনায়ক মুহাম্মদ মোসতাক আহমদ।
তিনি বলেন, রাজধানীর মহাখালী, বনানী, বিমানবন্দর, গাজীপুর ও টঙ্গি এলাকায় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে জিরো জিরো সেভেন গ্রুপ, বাবা গ্রুপ, জাউরা গ্রুপ, ভোল্টেজ গ্রুপ, ডি কোম্পানি ও জাহাঙ্গীর গ্রুপসহ বিভিন্ন কিশোর গ্যাং গ্রুপের ৩৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

গ্রেপ্তারের সময় তাদের কাছ থেকে ৫০০ গ্রাম গাঁজা, ২৪টি মোবাইল, একটি ব্লেড, একটি কুড়াল, একটি পাওয়ার ব্যাংক, পাঁচটি রড, ১৬টি চাকু, তিনটি লোহার চেইন, একটি হাতুড়ি, একটি মোটরসাইকেল এবং নগদ ২৪ হাজার ২৫০ টাকা জব্দ করা হয়।
র্যাব-১ এর সিও আরও জানান, নিজ নিজ এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করতে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাতো তারা। বেপরোয়া গতি ও বিকট শব্দে মোটর সাইকেল চালিয়ে পথচারী ও স্কুল শিক্ষার্থীদের উত্ত্যক্ত করতো এই গ্রুপগুলোর সদস্যরা। গ্রেপ্তার হওয়া ১৩ জনের বিরুদ্ধে ধর্ষণ চাঁদাবাজিসহ একাধিক মামলা আছে। কিশোর অপরাধ দমনে নিয়মিত এই অভিযান চলবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
মোসতাক আহমদ বলেন, জিরো জিরো সেভেন গ্রুপের দলনেতা আল-আমিন। জাউরা গ্রুপের দলনেতা মাহাবুব। বাবা গ্রুপের দলনেতা সাদ। ভোল্টেজ গ্রুপের দলনেতা মনা। জাহাঙ্গীর গ্রুপের দলনেতা জাহাঙ্গীর ওরফে বয়রা জাহাঙ্গীর। ডি কোম্পানি গ্রুপের দলনেতা লন্ডন পাপ্পু। পাপ্পুর অন্যতম সহযোগী আকাশ ও আমির হোসেন।
তিনি বলেন, ‘গ্রেপ্তারেরা মাদক সেবন, সাইলেন্সারবিহীন মোটরসাইকেল চালিয়ে বিকট শব্দ করে জনমনে ভীতির সঞ্চার, স্কুল-কলেজে বুলিং, র্যাগিং, ইভটিজিং, ধর্ষণ, ছিনতাই, ডাকাতি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অশ্লীল ভিডিও শেয়ারসহ নানাবিধ অনৈতিক কাজে লিপ্ত। তাঁদের এসব কর্মকাণ্ড আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিশ্চিত ক্ষতির মুখে ধাবিত করছে।
র্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের প্রত্যেক গ্রুপের আনুমানিক সদস্য ১০-১৫ জন। তারা টাকার বিনিময়ে যে কোনো পক্ষের হয়ে মারামারি, দখলবাজি, পিকেটিং, ছিনতাই, ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত। গ্রেপ্তারদের মধ্যে ১৭ জনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক, অস্ত্র, ধর্ষণ ও হত্যা চেষ্টাসহ একাধিক মামলা রয়েছে।

মোসতাক আহমদ বলেন, গ্যাং সদস্যরা এলাকায় নিজেদের অস্তিত্ব জাহির করার জন্য উচ্চ শব্দে গান বাজিয়ে দল বেঁধে ঘুরে বেড়ায়, বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল চালায়, পথচারীদের উত্ত্যক্ত করে এবং ছোট খাটো বিষয় নিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর চড়াও হয়ে হাতাহাতি-মারামারি করে।
এছাড়াও তারা নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখার জন্য একই এলাকায় অন্যান্য গ্রুপের সঙ্গে প্রায়শই কোন্দলে লিপ্ত থাকে। তাদের এই ধরনের চলাফেরার কারণে সাধারণ লোকজন তাদের অনেকটাই এড়িয়ে চলে। এই এড়ানোর বিষয়টিকে তারা তাদের ক্ষমতা হিসেবে ভাবে এবং কোনো ঘটনায় কেউ কোনো প্রতিবাদ করলেও ক্ষমতা জাহির করতে মারামারি করাসহ অনেক সময় খুন করতেও দ্বিধাবোধ করে না।
থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কিশোর গ্যাংয়ের সখ্যতার ও মিটিং মিছিলে অংশগ্রহণ ও মদদ দিতে দেখা যায়। তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না জানতে চাইলে র্যাব কর্মকর্তা মোসতাক বলেন, বিশেষ করে কিছু ব্যক্তি এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করতে কিশোরদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে।
কিশোর গ্যাং গ্রুপের সদস্যরা মদতদাতাদের হয়ে মারামারি করে। অনেকেই এই গ্রুপের সদস্যদের মূলত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে এমন তথ্য আমরা পেয়েছি। মদদদাতার হয়ে কাজ করার কারণে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা শেল্টার পায়। যারা তাদের নানাভাবে মদদদাতা হিসেবে কাজ করে, তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।

তিনি বলেন, আমি সুস্পষ্টভাবে বলতে চাই অপরাধীদের কোনো দল বা ঠিকানা থাকতে পারে না। তাদের কোনো পরিচয় বিষয় না। তারা কার হয়ে কাজ করে সেটিও বিবেচ্য বিষয় নয়। কোনো অপরাধ করলে, তাদের আইনের আওতায় আনা হয়।
রাজধানীতে হোতাসহ ৩৭ কিশোর গ্যাং সদস্য গ্রেপ্তার