২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে দেশে ছাত্রদের নেতৃত্বে গড়ে উঠা গণআন্দোলন ও বিক্ষোভ দমনে মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মারাত্মক মরণাস্ত্র ব্যবহার করে বিক্ষোভ দমন-পীড়নে সেই সময়ের আইনশৃঙ্খলাবাহিনীকে হাসিনা নিজেই নির্দেশ দিয়েছেন, গত মার্চে ফাঁস হওয়া এমন একটি ভিডিওর সূত্র ধরে বিবিসির অনুসন্ধান দল এক প্রতিবেদনে এই তথ্য তুলে ধরেছে।
বিক্ষোভ দমনে শুধু শেখ হাসিনার অডিওই নয়, বিবিসি আই তাদের নিজস্ব অনুসন্ধানে উঠিয়ে এনেছে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের শেষ মুহূর্তে ঢাকার যাত্রাবাড়ী পাঁচ আগস্ট কি ঘটেছিলো। সেখানে বিক্ষোভকারীদের উপর পুলিশের ব্যাপক গুলি ও হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত এসেছে বুধবার প্রকাশিত বিবিসির প্রতিবেদনে।
বিবিসি আই টিমের তদন্তে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের পাঁচ আগস্ট ঢাকার ব্যস্ততম যাত্রাবাড়ীতে একটি ঘটনায় পুলিশের গুলিতে কমপক্ষে ৫২ জন নিহত হন, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে পুলিশি সহিংসতার সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাগুলোর মধ্যে অন্যতম। প্রাথমিক প্রতিবেদনে ওই দিন যাত্রাবাড়ীতে ৩০ জন নিহত হবার কথা বলা হয়। বিবিসির তদন্তে গণহত্যা কীভাবে শুরু হয়েছিল এবং শেষ হয়েছিল সে সম্পর্কে নতুন তথ্য উঠে এসেছে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ফুটেজ, সিসিটিভি ও ড্রোন ছবি সংগ্রহ করে বিবিসি আই নিশ্চিত করেছে, যাত্রাবাড়ী থানার সামনে থেকে সেনাবাহিনীর একটি দল সরে যাওয়ার পরপরই পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ শুরু করে। ৩০ মিনিটেরও বেশি সময় ধরে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালায়।
এমনকি প্রাণ বাঁচাতে বিক্ষোভকারীরা যখন আশপাশের বিভিন্ন অলিগলিতে আশ্রয় নেন, সেখানে গিয়েও পুলিশ গুলি চালিয়েছে। অনেক বিক্ষোভকারী মহাসড়কে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। পরে পুলিশ কর্মকর্তারা কাছাকাছি একটি সেনা ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়। কয়েক ঘণ্টা পরে বিক্ষোভকারীরা প্রতিশোধ নেয়ার সময় কমপক্ষে ছয় পুলিশ কর্মকর্তাও নিহত হন এবং যাত্রাবাড়ী থানায় আগুন ধরিয়ে দেয়।
বিবিসি আই’র অনুসন্ধানকালে ঘটনার এমন এক গুরুত্বপূর্ণ ভিডিও বিবিসির হাতে আসে, যেখানে পাঁচ আগস্ট বিকেলে যাত্রাবাড়ীতে পুলিশের গুলিবর্ষণ শুরুর কিছু মুহূর্ত দেখা যায়। ভিডিওটি এমন একজন আন্দোলনকারীর মোবাইল ফোন থেকে বিবিসি সংগ্রহ করেছে, যিনি নিজেও সেদিন পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান।

নিহত ওই আন্দোলনকারীর নাম মিরাজ হোসেন। পুলিশ যখন বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ শুরু করে, সেই সময়ের ভিডিও ধারণ করেছেন মিরাজ। মর্মান্তিকভাবে মোবাইল ক্যামেরার ওই ভিডিওতে তার জীবনের শেষ মুহূর্তও ধরা পড়েছে। মিরাজের মৃত্যুর পর পরিবারের সদস্যরা তার মোবাইলটি খুঁজে পান এবং ফোনে সংরক্ষিত ভিডিওটি বিবিসিকে দেন। ভিডিওর মেটাডেটা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সেদিন নির্বিচারে গুলিবর্ষণের ঘটনাটি শুরু হয়েছিল দুপুর ২টা ৪৩ মিনিটে।
ভিডিওটিতে যাত্রাবাড়ী থানার মূল ফটকে বিক্ষোভকারীদের সামনে সেনাবাহিনীর একটি দলকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। এরপর হঠাৎ করেই তারা সেখান থেকে সরে যান। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই যাত্রাবাড়ী থানার ভেতরের পুলিশ সদস্যরা ফটকের সামনে অবস্থানরত বিক্ষোভকারী জনতার ওপর আকস্মিকভাবে গুলিবর্ষণ শুরু করেন।
থানার উল্টো দিকে এক ভবনের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যাচ্ছে, পুলিশ গুলি চালানো শুরু করার পর প্রাণ বাঁচাতে গলির ভেতর দিয়ে ছুটে পালাচ্ছে বিক্ষোভকারীরা। ওই সময়ের আরেকটি ভিডিওতে আহতদের শরীরে লাথি মারতেও দেখা যায় পুলিশকে। অনুসন্ধানে বিবিসি দেখেছে, পাঁচ আগস্ট বিকেলে যাত্রাবাড়ী থানার সামনে ৩০ মিনিটেরও বেশি সময় ধরে গণহত্যা চালানো হয়। ঘটনার সময়ের কিছু ড্রোন ভিডিও বিবিসির হাতে এসেছে।

ভিডিওর মেটাডেটার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বিকেল তিনটা ১৭ মিনিটেও যাত্রাবাড়ী থানার সামনের মহাসড়কে বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালাচ্ছিল পুলিশ। এরপর তাদের বড় একটি দলকে থানার উল্টো পাশে অবস্থিত একটি অস্থায়ী সেনা ব্যারাকে আশ্রয় নিতে দেখা যায়।
ড্রোন ভিডিওতে মহাসড়কের ওপর হতাহতদের একাধিক মৃতদেহ পড়ে থাকতেও দেখা গেছে। ভ্যান-রিকশা এবং বাইকে করে আহতদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন আন্দোলনকারীরা।
পরবর্তী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আন্দোলনকারীদের একটি অংশ শাহবাগের দিকে চলে যান। আর যারা তখনও যাত্রাবাড়ীতে ছিলেন, তাদের মধ্যে বিক্ষুব্ধ একটি অংশ থানায় আগুন দেন। এ ঘটনায় পুলিশের কমপক্ষে ছয়জন সদস্য নিহত হন।

পাঁচ আগস্ট বিকেলে পুলিশের নির্বিচার গুলির ঘটনার পর আহতদেরকে আশপাশের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকরা বহু ব্যক্তিকে মৃত ঘোষণা করেন। সেদিন যাত্রাবাড়ীতে অন্তত ৩০ জন বিক্ষোভকারী নিহত হন বলে প্রাথমিকভাবে জানা যাচ্ছিল।
কিন্তু গণমাধ্যমে প্রকাশিত তখনকার খবর, নিহতদের পরিবারের সাক্ষাৎকার, হাসপাতালের নথি এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিভিন্ন পোস্টের সত্যতা যাচাই করার পর বিবিসি দেখেছে, পাঁচ আগস্ট যাত্রাবাড়ীতে কমপক্ষে ৫২ জন সাধারণ মানুষ নিহত হন। এর বাইরে সেদিন অন্তত ছয়জন পুলিশ নিহত হন।
বিক্ষোভ দমনে নির্বিচারে গুলি চালানোর নির্দেশ দেন শেখ হাসিনা, বিবিসির অনুসন্ধান