আপন তিন ভাই-বোনসহ চারজনের মৃত্যুর রেশ কাটতে না কাটতে নীলফামারীতে আবারো অরক্ষিত রেলগেটের কারণে ট্রেনে কাটা পড়ে ঝরলো তাজা আরো চারটি প্রাণ।
বুধবার (২৬ জানুয়ারি) সকাল সাতটার দিকে নীলফামারী সদরের দারোয়ানী রেলওয়ে স্টেশনের অদূরের রেলক্রসিং অতিক্রম করার সময় আন্তঃনগর সীমান্ত এক্সপ্রেস ট্রেনের ধাক্কায় যাত্রীবাহী একটি অটোরিকশা যাত্রীসহ কয়েক ফিট দূরে ছিটকে পড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই এক নারী শ্রমিক ট্রেনে কাটা পড়ে নিহত হন। এসময় আহত হন ওই অটোরিকশা চালকসহ আরো সাত নারী শ্রমিক। তাদের হাসপাতালে নেওয়া হলেও আরো তিন নারী শ্রমিকের মৃত্যু হয়।
হতাহতদের বাড়ি একই উপজেলার সোনারায় ইউনিয়নের ধনিপাড়া ও কোরানীপাড়া গ্রামে। তারা সকলেই উত্তরা ইপিজিডের বিভিন্ন কারখানায় কর্মরত শ্রমিক ছিলেন।
গত ৮ ডিসেম্বর একই সময় ওই ঘটনাস্থলের চার কিলোমিটার দূরে জেলা সদরের কুন্দপুকুর ইউনিয়নের মনষাপাড়া গ্রামের বৌবাজার নামক স্থানে ট্রেনে কাটা পড়ে একই পরিবারের তিন শিশুসহ চার জনের মৃত্যু হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বুধবার সকালে তীব্র ঘনকুয়াশার মধ্য দিয়ে ধনীপাড়া ও কোরানীপাড়া গ্রামের বাড়ি থেকে ৯ নারী শ্রমিক অটোরিকশা যোগে নিজেদের কর্মস্থল উত্তরা ইপিজেডে যাচ্ছিলেন। পথে দারোয়ানী রেলওয়ে স্টেশনের অদূরে তাদের অটোরিকশাটি একটি অরক্ষিত রেলক্রসিং পার হওয়ার সময় খুলনা থেকে ছেড়ে আসা চিলাহাটিগামী আন্তঃনগর সীমান্ত এক্সপ্রেস ট্রেনটি অটোরিকশাটিকে ধাক্কা দিলে যাত্রীসহ অটোরিকশাটি কয়েক ফিট দূরে ছিটকে পড়ে। এতে ঘটনাস্থলে ট্রেনে কাটা পড়ে নিহত হন নারী শ্রমিক শেফালী বেগম (৩৫)। তিনি ধনীপাড়া গ্রামের ইটভাটা শ্রমিক আশরাফ হোসেনের স্ত্রী। এসময় গুরুত্বর আহত অটোরিকশা চালকসহ আরো সাত নারী শ্রমিককে এলাকাবাসীর সহায়তায় নীলফামারী দমকল বাহিনীর কর্মীরা উদ্ধার করে নীলফামারী জেনারেল হাসপাতালে নিলে সেখানেই একই গ্রামের ইজিবাইক চালক মোশারফ হেসেনের স্ত্রী রুমানা বেগম (৩৫) ও কোরানীপাড়া গ্রামের ইটভাটা শ্রমিক বেলাল হোসেনের স্ত্রী সাহেরা বানু (৩৫) নামের দুই নারী শ্রমিকের মৃত্যু হয়।
অপরদিকে নীলফামারী জেনারেল হাসপাতাল থেকে রংপুর মেডিকেল কলেজে হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান অপর নারী শ্রমিক ধনীপাড়া গ্রামের হোটেল শ্রমিক আরমান আলীর স্ত্রী মিনারা বেগম (৩০)।
এদিকে ওই ঘটনায় আহত হওয়া নারী শ্রমিক রওশনারা বেগম (২৭) নীলফামারী জেনারেল হাসপাতালে এবং নারী শ্রমিক কুলসুম বেগমকে (৩০) ও অটোরিকশাচালক অহিদুল ইসলামকে (২৪) রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বর্তমানে তারা সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী জাহিদ হোসেন জানান, আমার স্ত্রীও ইপিজেডের শ্রমিক। ঘটনার সময় আমি নিজের আমার বাইসাইকেল করে স্ত্রীকে ইপিজেডে নিয়ে যাচ্ছিলাম। ওই রেলগেটের কাছাকাছি উপস্থিত হলে ট্রেনের হুইশেল বাজে। এতে আমি দাড়িয়ে যাই। ট্রেন কিছুটা দূরে থাকায় আমার সামনে থাকা দু’টি আটোরিকশার মধ্যে একটি অটোরিকশা ওই রেলগেটে পার হয় এরপরই পিছনে থাকা ১০ যাত্রী বোঝাই আর একটি অটোরিকশাটি রেলগেটে উঠলে আমিসহ আরো অনেকেই মানা করি যে ট্রেন কাছাকাছি চলে এসেছে তুমি পার হয়েও না। কিন্তু ওই অটোরিকশা চালক কোন কথা না শুনে রেলগেট অতিক্রম করতে গেলে ট্রেনের ধাক্কায় ২০ ফিট দূরে ছিটকে পড়ে যাত্রীসহ। এতে টেনের নিচে কাটা পড়ে ঘটনাস্থলেই শেফালী মারা যান। এসময় আহত অটোরিকশা চালক ও ৭ নারীসহ সাত জনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়। অটোরিকশা চালকের অবহেলার কারণে আজ এই মানুষ গুলোর প্রাণ গেল।’
নীলফামারী জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. কাজী আব্দুল মোমিন জানান, হাসপাতালে আসা সাতজন রোগীদের মধ্যে সাহেরা বেগম, রোমানা বেগম মারা যায়। ভর্তি পাঁচজনের মধ্যে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তিনজনকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। তাদের মধ্যেও মিনা পারভীন মারা যায়। নীলফামারী জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন সোনারায় এলাকার ইয়াকুব আলীর ছেলে অহিদুল ইসলাম(২৮), নজরুল ইসলামের স্ত্রী রওশন আরা(২৭) এবং রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন সায়েদ আলীর স্ত্রী কুলসুমা বেগম(৩০) ও গোলাম মোস্তফার স্ত্রী নাসরীন আক্তার (৩৫)।
নীলফামারী ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের জ্যেষ্ঠ স্টেশন কর্মকর্তা মোঃ মিয়ারাজ হোসেন বলেন, দুর্ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে স্থানীয়দের সহযোগিতায় ঘটনাস্থল থেকে নিহত এক নারীর মরদেহসহ আহত সাতজনকে নীলফামারী জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে আরো দুই নারীর মৃত্যু হয়।
তিনি আরো বলেন, প্রচণ্ড কুয়াশা থাকায় অটোরিকশা চালক বুঝে উঠতে পারেনি যে ট্রেন তাদের কাছে চলে এসেছে। যার ফলে এই দূর্ঘটনা ঘটেছে।
সৈয়দপুর রেলওয়ে থানার পরিদর্শক মোঃ. আব্দুর রহমান বলেন, ঘটনাস্থলে একজন, নীলফামারী জেনারেল হাসপাতালে দুই জন এবং রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে একজনসহ চার জনের মৃত্যু হয়েছে। ব্যাপারে সৈয়দপুর রেলওয়ের পি.ডাব্লিও সুলতান আহমেদ বাদী হয়ে রেলওয়ে থানায় একটি অপমৃত্য মামলা দায়ের করেছেন। নিহতদের স্বজনদের আবেদনের ভিত্তিতে ময়না তদন্ত ছাড়াই তাদের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
নীলফামারী সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেসমিন নাহার বলেন,‘খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরির্দশন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যানের কাছে নিহত ও আহতদের তালিকা চাওয়া হয়েছে। তালিকা হাতে এলেই তাদের পরিবারকে সরকারি ভাবে অর্থিকসহায়তা প্রদান করা হবে।’
দারোয়ানী রেলস্টেশন এলাকার খুচরা ওষুধ বিক্রেতা শাহিনুর রহমান শাহিন জানান, সকালে প্রচণ্ড কুয়াশার কারণে ট্রেনের উপস্থিতি বুঝতে না পারায় ওই দূর্ঘটনাটি ঘটেছে। রেলক্রসিংটি অরক্ষিত থাকায় দেড় বছর আগেও রেলক্রসিংটি পারাপারে সময় ট্রেনে কাটাপড়ে এক জনের মৃত্যু হয়। গত ১০ বছরে ক্রসিংটিতে অন্তত পাঁচটি দূর্ঘটনা ঘটার কথা জানান তিনি।
একই এলাকার মমিনুর রহমান দাবি করে বলেন,'দারোয়ানী বাজারের অদূরে ওই রেলক্রসিং দিয়ে প্রতিদিন শত শত যানবাহন ও মানুষ পারাপার হয়। বিশেষ করে সকাল ও সন্ধ্যায় ইপিজেড’এ নারী শ্রমিক নিয়ে যাতায়াতকারী শত শত অটোবাইক চলাচল করে। কিন্তু ওই রেলক্রোসিংটিতে কোন গেট নেই, নেই কোন গেটম্যান। সিগন্যাল বাতি থাকলেও সেটি জ্বলে না। যার ফলে ট্রেন আসা-যাওয়া করলেও কেউ বুঝতে পারে না। ট্রেনের হুইসেল বাজলে কেবল পথচারীরা বুঝতে পারেন যে ট্রেন আসছে বা যাচ্ছে।'
অনীপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন বলেন, 'আজ থেকে প্রায় ১৫ বছর আগে চালু ছিল দারোয়ানী রেলওয়ে স্টেশনটি। বর্তমানে সেটি বন্ধ। আগে এই স্টেশনে ট্রেন থামতো। তাই সেই সময় এখানে স্টেশন মাস্টার ও গেটম্যান ছিল। এখন স্টেশন বন্ধ থাকায় নেই স্টেশন মাস্টার ও গেটম্যান। যখন থেকে এখান থেকে স্টেশন মাস্টার ও গেটম্যান প্রত্যাহার করা হয়েছে তখন তেইকেই এই এলাকার মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অরক্ষিত রেলক্রসিংটি পারাপার করছে।'
ওই এলাকার মোশাররফ হোসেন দাবি করে বলেন, 'স্টেশন থাকায় এলাকাটি জনবহুল। এখান দিয়ে প্রতিদিন শতশত মানুষ ও যানবাহন পারাপার হয়। আমরা এ রেলক্রসিংয়ে গেট ও গেটম্যান দেয়ার জন্য অনেক বার দাবী জানিয়েছি। কিন্তু রেল কর্তৃপক্ষ আমাদের কথা শোনেননি। তাদের অবহেলার জন্য আজ অকালে ঝরলো চারটি তাজা প্রাণ।'
উল্লেখ্য গতবছরের ৮ ডিসেম্বর সকালে ট্রেনে কাটা পড়ে নীলফামারী সদরের কুন্দুপুকুর ইউপি বৌবাজার মনষাপাড়া গ্রামে রিকশাচালক রেজওয়ান আলীর শিশু মেয়ে লিমা আক্তার (৭), শিমু আক্তার (৪) ও ছেলে মমিনুর রহমানের (৩) মৃত্যু হয়। তাদেরকে বাঁচাতে গিয়ে প্রতিবেশী যুবক সালমান ফারসী শামীম (৩০) মারা যান।
একাত্তর/এআর
