সবুজ চা পাতা আর কালচে তামাটে হাত, এই দু’টোর সম্পর্ক আজকের নয়, বহু কালের। এ দ্বৈত পরশটুকুই চা শিল্পকে আজ সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে সগৌরবে। সেই তামাটে হাতের নারীদের হাত দিয়ে উত্তোলন করা চা পাতাগুলো কারখানার বৈদ্যুতিক যন্ত্রে ক্রমঘূর্ণামান হতে থাকে শিল্পে রূপান্তিত হবার জন্যে। দু’টি পাতা একটি কুঁড়ি উঠে আসে যে নারীদের হাত স্পর্শ করে সেই নারীদের অনেকেই আজও রয়েছে গেছেন ছোট ছোট অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে।
কর্মক্ষেত্রে সুযোগ-সুবিধার অভাব, আবাসন সংকট, সঠিক মুজুরি- প্রভৃতি সমস্যাগুলো অদ্যাবধি দূর হয়নি। তবুও তারা ঘাম ঝরাচ্ছেন চা শিল্পকে বাচিয়ে রাখতে।
সকাল ফুটে উঠতেই কাজের তাগিদ পড়ে যায় তাদের। প্রথমে সংসারের টুকিটাকি কাজ। তারপর পাতা উত্তোলনের কাজে চলে যাওয়া। সেটা শীতের তীব্রতায় হোক, আর হোক রোদে পুড়ে কিংবা বৃষ্টিতে ভিজে।
বাংলাদেশে মোট চা বাগানের সংখ্যা ২৪০টি (ফাঁড়ি বাগানসহ)। আর ফাঁড়ি বাগান ব্যতীত মূল বাগান রয়েছে ১৫৮টি। সারাদেশে কর্মরত চা শ্রমিকদের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার। এর মধ্যে প্রায় পঞ্চাশ ভাগের উপরে নারী চা শ্রমিক রয়েছেন। মৌলভীবাজার জেলায় মোট ৯৭টি চা বাগান রয়েছে। আর এই চা জনগোষ্টির সংখ্যা কয়েক লাখ। তবে তাদের মধ্যে প্রায় ৭০ হাজার নিয়মিত চা শ্রমিক কাজ করেন, আর মৌলভীবাজার জেলায় তাদের সিংহ ভাগই নারী।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন সূত্রে জানা যায়, নারী-পুরুষের মজুরি এখন দৈনিক ১২০ টাকা হলেও তিন ক্যাটাগড়ির বাগান রয়েছে। ফলে অনেক বাগানে নারী শ্রমিকদের মজুরী নুন্যতম ৮৫ টাকাও দেয়া হচ্ছে। এদিকে নারী দিবসকে সামনে রেখে ‘কেমন আছেন চায়ের নারীরা’ এই প্রশ্নের উত্তরে উঠে এসেছে তাদের অভাব অনটন থেকে শুরু করে তাদের নানান সমস্যার কথা।
ঠিকা দফা এবং স্থায়ী দফার শ্রমিকদের মজুরি এক হওয়ার কথা থাকলেও তা দেওয়া হয়না। এদিকে কর্মক্ষেত্রে নারীদের বড় সমস্যা হলো নারীদের প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে গিয়ে বিভিন্ন বাঁধার মুখে পড়তে হয়। একেকটি সেকশনে (পৃথক পৃথক আবাদ) বৃষ্টির সময় ছাউনি থাকে না। ফলে বৃষ্টি গায়ে মেখেই কাজ করাতে গিয়ে ঠাণ্ডাজনিত নানা রোগশোকে ভুগতে হয়। পাশাপাশি বর্তমানে বাগানে কর্মরত চা শ্রমিক নারীরা শিক্ষায় পিছিয়ে রয়েছেন। বিট্রিশের নিয়মে অনেক বাগানে তাদেরকে যে শোকজ লেটার দেওয়া হয় সেটিও ইংরেজিতে। এতে করে তারা সেটা পড়তে না পেরে নানা জায়গায় ছুটে যান।

এসব বিষয় ছাড়াও তারা যেটা চান সেটা হচ্ছে তাদের সমস্যা সপ্তাহের মজুরী নিয়ে। এখন তারা যে টাকা পান সেটি দিয়ে না ছেলে মেয়েদের লেখাপড়া করাতে পারেন, না নিজেরা ভালো কিছু খেতে পারেন।
এদিকে, নারী শ্রমিকসহ সকল চা শ্রমিকদের পরিবার ও তাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের বিষয় ও চা শ্রমিকদের অধিকার এবং স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে মালিক পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করলেও তেমন কোন সুফল হয়না বলে জানান চা শ্রমিক নেতারা। বিশেষ করে নারীদের যে বিষয়টি রয়েছে সেটি হলো, চা বাগানের সেকশনগুলোতে নারী চা শ্রমিকদের জন্য শৌচাগার এবং প্রক্ষালন কক্ষ নেই।
অপরদিকে বাগান কতৃপক্ষ জানিয়েছেন, মাত্র ২টা কেজিতে চাল, সাথে ডাল, তেল ও আটা যে দামে দেয়া হয় এবং একই সাথে সাপ্তাহিক যে মজুরী দেওয়া হয়, সেটা দেশের অন্য কোন ইন্ড্রাস্ট্রিতে দেওয়া হয়না। তাছাড়া বাগানের শেকশনে শৌচাগার বানানোর নিয়ম নেই ফলে মোবাইল শোচাগার বানানোর পরিকল্পনা তাঁদের। ইতোমধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি বাগানে চালুও করা হয়েছে।
একাত্তর/এসএ
